দেরি করে বিয়ে

দরজায় কলিংবেলের শব্দ শুনে ছুটে গেলাম। বেশ রাত হয়ে গেছে কিন্তু এখনও ও আসেনি। খুব চিন্তা লাগছিল। দরজা খুলেই অবাক হয়ে গেলাম। দেখি একটা বড় ফুলের তোড়া আর শাড়ি হাতে ও দাঁড়িয়ে আছে সাথে আমার দেবর, ননদরাও। আমাকে অবাক করার জন্যই এই ব্যবস্থা। আজকে আমাদের প্রথম বিবাহবার্ষিকী। রাত বারটায় ফুল পেয়ে যে কী ভাল লাগছিল বলে বুঝাতে পারব না। বিয়ের আগের দিনগুলো ছিল আমার জন্য খুব কঠিন। পারিবারিক প্রয়োজন থেকেই পড়াশোনা শেষ করে চাকরি শুরু করি। পড়াশোনা শেষ করে চাকরি পেতে পেতেই যথেষ্ট সময় নষ্ট হয়েছে। ব্যাংকে চাকরিতে ঢুকে মনে হয়েছে আমার এগিয়ে যেতে হলে আরও পড়তে হবে, এমবিএ করা খুব জরুরি। এসময় আমি যদি বিয়ে করতাম তবে শ্বশুর বাড়ি, বাবার বাড়ি সব দিক সামলাতে গিয়ে হয়ত চাকরিই হারাতাম। সে সময় আমাকে ছোট ভাই-বোনের দেখাশোনাও করতে হচ্ছে। তাই আমি ঠিক করলাম পড়া শেষ করে, চাকরিতে নিজ অবস্থান আরও দৃঢ় করে, সম্পূর্ণভাবে নিজ পায়ে দাঁড়িয়ে তবেই বিয়ের নতুন অধ্যায় শুরু করব। কিন্তু বয়স কারও জন্য থেমে থাকে না বেড়েই চলল। পাশাপাশি সামাজিক চাপও বেড়ে যেতে থাকল। মানুষের নানা কথা বলাবলি। সে যন্ত্রণায় সবখানে যাওয়া-আসা প্রায় বন্ধই করে দিলাম। পরিণত হলাম অসামাজিক জীবে। চাকরিতেও এগিয়ে চলেছি সেসময় ওর সাথে পরিচয়। আমার স্বামীও ব্যাংকার। আমার আর ওর পার্থক্য তিন বছরের। আমাদের বিয়ে হল। বিয়ের পর, আমরা অনেক ভাল আছি। মনের দিক থেকেও আমরা প্রস্তুত ছিলাম, তাই দু’জন দু’জনকে পরিষ্কারভাবে বুঝি। কেউ কারও ওপর নিজের মতামত চাপিয়ে দেই না। একজন আরেকজনের মনকে, পরস্পরের চাকরি ক্ষেত্রকে বোঝার জন্য উপযুক্ত। সব দিক থেকেই মানসিকভাবে দু’জন প্রস্তুত। দু’জনই একে অপরের পরিবারের প্রতি আরও বেশি যত্নশীল। বুঝি পরস্পরের দায়িত্ব। এভাবেই নিজের মনের অভিব্যক্তি ফুটিয়ে তুললেন শিরিন আক্তার। একইভাবে বলেন, ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্ট-এর পাবলিক রিলেশন এন্ড কমিউনিকেশনের প্রধান নাসিমা খন্দকার। পড়াশুনা আর ক্যারিয়ারের চিন্তাই এক সময় নাসিমাকে একা করে দেয়। একাকিত্ব ঘোচাতেই পেশার বাইরে লেখালেখিকে বেছে নেয়। লেখালেখি করতে গিয়েই ইন্টারেনেটে পরিচয় হয় এডবেটাইজিং ফার্মের মেনেজিং ডিরেক্টর ভাস্কর আবেদীনের সাথে দুইমাস ফেসবুকে আলাপচারিতার পর গত নভেম্বরে তারা দেখা করেন। দু’-একবার দেখায় তারা বুঝতে পারেন তাদের প্রাপ্তির জায়গা যেমন পূর্ণ তেমন শূন্যতা একই জায়গায়। তারা দু’জনেই সিদ্ধান্ত নেন বিয়ে করার। নাসিমা ভাস্করকে আক্ষেপ করেই বলেন, বউ সাজা হল না। ভাস্কর তা পূর্ণ করলেন। মেয়ে দেখা, এনগেজমেন্ট, হলুদ, বিয়ে সব অনুষ্ঠানই তারা সামাজিকভাবে করে বিয়ের পাঠ সম্পূর্ণ করেন গত ফেব্রুয়ারিতে। নাসিমা বলেন, আমাদের অভিজ্ঞতা বেশি হওয়ায় সম্মানের জায়গা, শেয়ারিংয়ের নির্ভরশীলতা আর শ্রদ্ধা-ভালবাসার একটা সমান বোঝাপড়া থাকে। অল্প বয়সে যা নাও থাকতে পারে। আমাদের চল্লিশের কাছে এসে বিয়েতে অনেকে অনুপ্রাণিত করেছে, আমরা অনেক সুখি। ভাস্কর সন্তানের কথা ওঠলে বলে কোনো সমস্যা হবে না আমরা প্রয়োজনে দেশের বাইরে গিয়ে সন্তান নেব। আমি ইটালি ছিলাম সেখানে মনোপোজের পরে নারীকে মা হতে দেখেছি। সে যাই হোক, আমাদের বিয়ে পরিবার যেমন খুশি তেমন আমরাও সুখী। বেশি বয়সে বিয়ে করলে ভুল বোঝাবুঝির সুযোগ কম থাকে। তাছাড়া আমরা দু’জনই দায়িত্বপূর্ণ কাজ করি তাই আমরা এমন কিছু করি না যা আমাদের সাথে যায় না। একটা কথা বলি, আমি যখন পুরো সাজগোজ করে বিয়ে করছিলাম তখন আমারই কেমন লাগছিল, আমি আমার কলিগ বন্ধুদের কাছে জানতে চাই আমি কি বেশি বেশি করছি। তারা সকলেই আমাকে বলেছে না, তোমার আনন্দই আসল আর তোমার বরের ইচ্ছা থাকলেই হল। ও আমাকে আমার জায়গা দেয়। আমিও ওর এতদিনের নিজের জগেক আমার জন্য বদলে ফেলতে বলতে পারি না। আমাদের সামাজিক রীতি অনুযায়ী বয়স বাড়ার সাথে সাথে তার বিয়ের জন্য অস্বাভাবিক চাপ দেয়া হতে থাকে। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে একজনের সব অবস্থা গুছিয়ে নিজ পায়ে দাঁড়ানোর জন্য যথেষ্ট সময় প্রয়োজন। ছেলে বা মেয়ে দু’জনের জন্যই এটা সত্য। বয়স বাড়ার সাথে সাথে মানসিক পরিপক্বতা যথোপযুক্ত হয়, যা সংসার করবার জন্য জরুরি। পরস্পরকে বুঝে উঠতে পারে। সংসারের অর্থ, তার গুরুত্ব অনুধাবন করার আগেই বিয়ে অনেক সময়ই পারিবারিক অশান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অনেক সময় পড়াশোনা শেষ করার আগেই মেয়েকে বাধ্য করা হয় বিয়ের জন্য। একজন চাকরিজীবী ছেলের সাথেই তার বিয়ে হয়। কিন্তু নয়-দশ বছরের পার্থক্যের কারণে কেউই কারও মনের অবস্থা বুঝে উঠতে পারে না। স্বামীর সিদ্ধান্তগুলো মাথা পেতে মেনে নিতেই বাধ্য হয়। নিজস্বতা বলে আর কিছুই তার থাকে না। না সে তার পড়াশোনার পরিবেশকে বোঝাতে পারে, না স্বামী তার চাকরির পরিবেশকে বোঝাতে পারে। দু’জনের মধ্যে তৈরি হয় এক দূরত্ব। যা সম্পর্কের মাঝেও দূরত্ব এনে দেয়। প্রমা আক্তারের কাছে তার বিয়ের পরবর্তী সময়ের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি তুলে ধরলেন তার জীবন। আমি যখন ফার্স্ট ইয়ারে পড়ছি সেসময় আমার বিয়ে হয়। পড়তে পড়তে বিয়ে হওয়ায় আমি এক বিপদেই পড়ি। শ্বশুর বাড়ি গিয়ে সবকিছু বুঝে উঠতে অনেক সময় লেগে যায়। আমার পরিবার আমাকে পড়ার ব্যাপারে কোনো বাধা দেয়নি। আমার স্বামী সবসময় আমাকে উত্সাহ দিয়েছে। তবে তিনি আমার চেয়ে দশ বছরের বড়। তাই আমার সবসময়ই মনে হয়েছে আমি এই বিয়ের জন্য প্রস্তুত ছিলাম না। আমি আমার শ্বশুর বাড়ি দেখব, নাকি পড়ব। তুলনামূলকভাবে মানসিক পরিপক্বতার অভাবে মন পড়ে থাকত বাবা-মায়ের কাছেই। সব সময় তার সিদ্ধান্তগুলোকে মেনে নিয়েছি যেহেতু আমার তুলনায় তার অভিজ্ঞতা বেশি। তবে অনেক সময় মতামত না মিললেও তার কথা মেনে নিতে বাধ্য হয়েছি। যার মধ্যে ছিল পড়তে পড়তে প্রথম সন্তান নেয়া। মাস্টার্স সম্পূর্ণ করতে না পারা এমনি অনেক বিষয়। আমার সব সময় মনে হতো আমার স্বামীও আমার মাঝে তার বন্ধুকে খুঁজছে কিন্তু আমি কখনোই তা হয়ে উঠতে পারতাম না। চাকরি করতাম না বলে তার সমস্যাগুলোও অনুধাবন করতে পারতাম না। এখন আমিও চাকরি করি। তারপরও আমাদের মধ্যেকার দূরত্বটা রয়েই গেছে। তাই বিয়ের ক্ষেত্রে বেশি বয়স কখনই সমস্যার বিষয় নয়। বরং দু’জনের মানসিক পরিপক্বতা এক্ষেত্রে প্রভাবক। তাই সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিরও পরিবর্তন প্রয়োজন।