এভারেস্ট চূড়ায় চা-ওয়ালা
প্রকাশ : ১৮ মে ২০১৪, ২২:৩০
সেপ্টেম্বরে দলের প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী হিসেবে তার নাম ঘোষণা হওয়ার পর বিস্ময়ে অনেকের চোখ কপালে উঠেছিল। কেন মোদীর মতো একজন বিতর্কিত মানুষকে প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী হিসেবে সামনে আনলো তার হিসেব কষতে শুরু করে দিলেন অনেকে। কিন্তু মোদী ডানে-বামে না তাকিয়ে নিজের ক্ষমতার উপর আস্থা রেখে গোটা দেশ চষে ফেলেন। আকাশপথে প্রায় তিন লক্ষ
কিলোমিটারব্যাপী এই দীর্ঘ ভারত ভ্রমণের সঙ্গে তার প্রথম জীবনের সেই যাত্রার কোনও মিল নেই। ইঙ্গিতও ছিল না এমন ভবিষ্যতের
গুজরাটের ভাডনগরের পুরোনো শহরের মুসলিম মহল্লার খুপরি বাসা থেকে ৭ রেসকোর্স রোডের সাজানো বাংলোর দূরত্ব কতখানি? ভূগোলের পাতায় মেপে দেখলে অ-নে-ক-খা-নি! এই দূরত্ব পাড়ি দিতে লেগে যায় ম্যালা সময়। কিন্তু যেমন উল্কার গতিতে এই দূরত্ব মুছে দিলেন ভাডনগর রেলস্টেশন লাগোয়া ছোট্ট চায়ের দোকানের ‘কর্মচারী’ নরেন্দ্র মোদী, তার তুলনা ভারতবর্ষের ইতিহাসে বিরল। জিরো থেকে হিরো হয়ে গোটা বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন মোদী। শর্মিষ্ঠা সরোবরের তীরের ঐতিহাসিক ভাডনগর শহরে জীবনের প্রথম ১৭টি বছর কাটিয়েছেন তিনি। কিন্তু তার চোখ যে ভাডনগরের সীমানা ছাড়িয়ে খুঁজে বেড়িয়েছে বড় কিছু তার প্রমাণ মিলে গেল ভারতের সদ্যসমাপ্ত লোকসভা নির্বাচনের ফলাফলে মোদী নামটির জয়জয়কার দেখে। ২০০২ সালে গুজরাট দাঙ্গার ইন্ধনদাতা হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রসহ গোটা বিশ্বের কাছে যে মোদী ছিলেন ঘৃণার পাত্র, সেই মোদী হঠাত্ করে কোন যাদুমন্ত্রের বলে হয়ে গেলেন পরম পূজনীয়, তা মিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন হয়ে থাকবে আজীবন।
১৬তম লোকসভা নির্বাচনের ফল ইতিমধ্যে সবাই জেনে গেছেন। ভারতের ঐতিহ্যবাহী দল কংগ্রেসকে ধরাশায়ী করে মোদীর দল বিজেপি একাই পেয়েছে ২৮৩ আসন, যা সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় আসনের (২৭২) চেয়ে অনেক বেশি। আর বিজেপি জোটগতভাবে পেয়েছে ৩৩৬ আসন। কংগ্রেস ৪৪ আসন নিয়ে নির্বাচনী ইতিহাসে দলীয়ভাবে সবচেয়ে খারাপ ফলের রেকর্ড গড়েছে। এর আগে কংগ্রেসের সবচেয়ে কম আসনের রেকর্ড ছিল ১১৪।
ফেরা যাক ভারতের ‘বিখ্যাত চা-ওয়ালার’ প্রসঙ্গে। আট বছর বয়স থেকেই মোদী যাতায়াত শুরু করেছিলেন আরএসএস-এর শাখায়। স্কুলে সাধারণ মানের ছাত্র হলেও গোষ্ঠীর মধ্যে নেতৃত্বের ক্ষমতা ওই বয়সেই নজর কেড়েছিল শিক্ষকদের। আর ছিল দু’টি শখ। বিতর্কসভায় নিয়মিত যোগদান আর অভিনয়। মূলত নাটকে অভিনয় করা আর সিনেমা দেখার পয়সা জোগাড়ের জন্য বাবার চায়ের দোকানে কাজ করতেন। স্কুলে পড়ার সময়ই নাটকে অভিনয় করেছেন একাধিকবার। এমনকি নিজের লেখা একটি নাটকের নির্দেশনা ও অভিনয়ের দায়িত্ব নিয়ে তাক লাগিয়ে দেন। আজ যে মোদী তার তার্কিক ক্ষমতা দিয়ে জনসভায় জনতাকে মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখেন সেই ক্ষমতার বীজ বোনা হয়ে গিয়েছিল ভাডনগরেই।
গত সেপ্টেম্বরে দলের প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী হিসেবে তার নাম ঘোষণা হওয়ার পর বিস্ময়ে অনেকের চোখ কপালে উঠেছিল। কেন মোদীর মতো একজন বিতর্কিত মানুষকে প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী হিসেবে সামনে আনলো তার হিসেব কষতে শুরু করে দিলেন অনেকে। কিন্তু মোদী ডানে-বামে না তাকিয়ে নিজের ক্ষমতার উপর আস্থা রেখে গোটা দেশ চষে ফেলেন। আকাশপথে প্রায় তিন লক্ষ কিলোমিটারব্যাপী এই দীর্ঘ ভারত ভ্রমণের সঙ্গে তার প্রথম জীবনের সেই যাত্রার কোনও মিল নেই। ইঙ্গিতও ছিল না এমন ভবিষ্যতের।
সংঘ পরিবারের প্রচারক হিসেবে যোগদানের পর থেকেই দ্রুত ভাগ্যের চাকা ঘুরতে থাকে মোদীর। কিছুটা তার সাংগঠনিক দক্ষতা, কিছুটা ভাগ্যের সহায়তা। তবে প্রথমবার মোদী প্রচারের আলোয় আসেন ১৯৯০ সালে লালকৃষ্ণ আদবানির সোমনাথ থেকে অযোধ্যা যাত্রা এবং ১৯৯১ সালে মুরলীমনোহর যোশীর কন্যাকুমারী থেকে শ্রীনগর পর্যন্ত একতা যাত্রার আয়োজন করে। এরপর থেকে বিজেপির জাতীয় নেতৃত্বও আর তাকে উপেক্ষা করতে পারেননি।
২০০১ সালে গুজরাটের ভুজে ভয়াবহ ভূমিকম্পের পর কেশুভাই প্যাটেলকে সরিয়ে গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি মোদীকে। দল ও সরকারে নিরঙ্কুশ দাপট বজায় রেখে পরপর তিনটি বিধানসভা নির্বাচনে জিতে যান। ২০০২ সালে গোধরা পরবর্তী দাঙ্গায় সারা দেশে তার নামে ধিক্কার উঠলেও কেন জানি তার দিক থেকে একবারের জন্যও মুখ ফেরায়নি গুজরাটের মানুষ। মোদীর একচ্ছত্র আধিপত্যের জেরে ক্রমে গুজরাটে বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বও অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যায়। ২০০৯ সালে লালকৃষ্ণ আদবানিকে প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী করে ভোটে জেতার স্বপ্ন ব্যর্থ হওয়ার পর বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সামনে মোদীর কাছে আত্মসমর্পণ করা ছাড়া অন্য পথও খোলা ছিল না।
টিম মোদীর এমন বিরাট সফলতা কংগ্রেস সরকারের বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভই যে কাজ করেছে তা কেবল নয়। ভাগ্যও তাকে দারুণভাবে সহায়তা করেছে। ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে একদিকে ইউপি সরকারের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগে ভারতের মানুষ যখন ক্ষুব্ধ তখন প্রখ্যাত সমাজকর্মী আন্না হাজারে, যোগগুরু রামদেবসহ অনেকে দুর্নীতিবিরোধী শ্লোগানকে সামনে এনে বিক্ষোভ-আমরণ অনশন ইত্যাদি কর্মসূচী শুরু করেন। রাস্তা দখল করে এসব সভা সমাবেশ, অনশন করার কারণে পুলিশ বাধ্য হয়েই তাদের কখনো গ্রেফতার করে আবার কখনো লাঠিপেটা করে সরিয়ে দেয়। পত্রপত্রিকায় এসব ঘটনা ফলাও করে প্রকাশ হবার কারণে মানুষ ধরে নেয়, কংগ্রেস সরকার মনে হয় দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন পছন্দ করে না। এভাবে পরোক্ষভাবে বিজেপিকে সহায়তা করেন এসব সমাজকর্মী। তাছাড়া দুর্নীতি মুক্ত করার শ্লোগান দিয়ে জন্ম নেয় আম আদমি পার্টি। এই দলের কার্যক্রমও কংগ্রেসের বিপক্ষে জনমত সৃষ্টিতে ভূমিকা রেখেছে।
অভিযোগের পর অভিযোগে মানুষের মনে যখন ক্ষোভ বাড়ছে ঠিক সেই সময় থেকেই গুজরাটকে সামনে রেখে শিল্পমহলের কাছে বার্তা পাঠাতে শুরু করেন মোদী। মুকেশ আম্বানি, রতন টাটার মতো শিল্পপতিরা তার হয়ে সওয়াল করতে শুরু করেন। একই সঙ্গে গোটা দেশের প্রায় প্রতিটি কেন্দ্র ধরে ধরে ঘুঁটি সাজাতে শুরু করেন মোদীর বিশ্বস্ত সঙ্গীরা। বিদেশ থেকে আনা হয় বাঘা বাঘা পরিকল্পক। তারা পথঘাট, ইলেক্ট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়া বিজ্ঞাপনে বিজ্ঞাপনে সয়লাব করে দেন। বিশেষ করে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের সময় খেলার চ্যানেলে স্রেফ কার্টুন দিয়ে তৈরি করা ‘উহু, নো করাপশন’ বিজ্ঞাপনটি তরুণ প্রজন্মের মনে আলোড়ন সৃষ্টি করে। তারা ধরেই নেয় মোদী ক্ষমতায় আসলে দুর্নীতি তিরোহিত হবে। বিভিন্ন চ্যানেলে বিজেপির প্রচার করা প্রতিটি বিজ্ঞাপন ছিল আকর্ষণীয় এবং অর্থবহ। তার বিপরীতে কংগ্রেসের বিজ্ঞাপনগুলো ছিল সাদামাটা ও উন্নয়নের একঘেয়ে ফিরিস্তি। এখানে এটা করা হয়েছে, ওখানে ব্যাপক উন্নয়ন করা হয়েছে ইত্যাদি।
কংগ্রেস নেতারা বুঝতে পারেননি যে মোদীর ক্ষুরধার প্রচার কৌশলের বিপরীতে আরব সাগরের ধারে বসে বালুর সৌধ গড়ার স্বপ্ন দেখছিলেন তারা। মোদীর ফুত্কারে সব হিসেব ভেঙে সেই স্বপ্ন ভেসে গেল সাগরের পানিতেই। সাগর তীরের দখল নিয়ে নিল বিজেপি-শিবসেনা জোট। দেশের বাণিজ্য নগরী মুম্বাইয়ের দখলও চলে গেল গেরুয়া শিবিরের হাতে। আর সেই ফল এতটাই একপেশে হয়ে গেল যে, একের পর এক ইন্দ্রপতনের ধাক্কায় রীতিমতো মুহ্যমান মহারাষ্ট্রের কংগ্রেস নেতা ও প্রার্থীরা। অন্যদিকে, নরেন্দ্র মোদীর কল্যাণে গুজরাটে বিপুল জয় আসবে, জানাই ছিল। কিন্তু একেবারে ২৬-এ ২৬ হবে সেটা ভাবতে পারেননি গুজরাট বিজেপির নেতারাও। প্রায় সবগুলো আসনে হেসে-খেলে জয় পেয়েছেন বিজেপি প্রার্থীরা।
বরাবর গাড়ি চালাতে ভালোবাসেন নরেন্দ্র মোদী। গাড়িতে উঠলেই চালকের আসনের দিকে নাকি তার নজর থাকে। গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর সেই শখ আর পূরণ করার উপায় ছিল না। তবু চালকের পাশের আসনটাই বরাদ্দ ছিল তার জন্য। এবার ভারত নামক বিশাল গাড়ির চালকের আসনে সওয়ার হলেন তিনি। এই বিপুল জনমতের প্রত্যাশা তিনি কতটা পূরণ করতে পারেন তার উত্তর দেবে সময়।