ধমকের উপর
আছে থাই গণতন্ত্র
প্রকাশ : ১৮ মে ২০১৪, ২২:৩২
ব্যাংককে মুখোমুখি অবস্থানে সদ্য পদচ্যুত প্রধানমন্ত্রী ইংলাক সিনাওয়াত্রার সমর্থক এবং তার বিরোধীরা। সাংবিধানিক আদালত ইংলাককে পদচ্যুত করলেও অন্তর্বর্তী সরকার তথা অন্তর্বর্তী মন্ত্রিসভায় রয়ে গেছে তারই ঘনিষ্ঠ সহযোগীরা। অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন সাবেক ইংলাক সরকারেরই বাণিজ্যমন্ত্রী নিউওয়াত্থামরং বুনসংপাইসান। তাই ইংলাককে সরাতে আদালতের হস্তক্ষেপের পরও সমস্যার কোন সুরাহা হয়নি। বরং তা মোড় নিয়েছে নতুন আঙ্গিকে। ব্যাংককের রাজপথ দখল করেছে ইংলাকের সমর্থক রেড শার্ট বিক্ষোভকারীরা। তাদের দাবি, সংবিধান সমুন্নত রেখে নির্বাচন। অন্যদিকে, ঐ নির্বাচন বয়কট করে রাজনীতির মাঠ আগে থেকেই গরম করে রেখেছে ইংলাক বিরোধী ইয়ালো শার্ট বিক্ষোভকারীরা। তাদের দাবি, নির্বাচনের আগে পদ্ধতিগত সংস্কার। যাতে ভোট কারচুপি বন্ধ হয়। দুই পক্ষই তাদের দাবি আদায়ে অনড়। এই অচলাবস্থার মধ্যেই গত বৃহস্পতিবার ব্যাংককের ডেমোক্রেসি মনুমেন্টের কাছে ইয়ালো শার্ট বিক্ষোভকারীদের একটি তাঁবু লক্ষ্য নির্বিচারে গুলি চালায় অজ্ঞাত বন্দুকধারীরা। এতে তিনজন মারা যায়। আহত হয় অন্তত ২০ জন। পরিস্থিতি রক্তাক্ত সহিংসতার দিতে যেতে দেখে দু’পক্ষকেই কড়া হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে সেনাবাহিনী। থাইল্যান্ডেরই অনেক মানুষই এখন মনে করছেন, পরিস্থিতি যেদিকে গড়াচ্ছে তাতে সেনা অভ্যুত্থান নিশ্চিত। কারণ অচলাবস্থা নিরসনে রাজনৈতিক নেতাদের ব্যর্থতার জের ধরেই সব সময় সেনাবাহিনী ক্ষমতা নিজের হাতে তুলে নেয়।
ডেমোক্রেসি মনুমেন্টের কাছে তাঁবু ফেলে বহুদিন ধরেই সরকার বিরোধী আন্দোলন চালিয়ে আসছিলো ইংলাক বিরোধী বিক্ষোভকারীরা। বিরোধী নেতা ও সাবেক উপ-প্রধানমন্ত্রী সুথেপ থগসুবানের নেতৃত্বে তার সমর্থকরা সেখানে জড়ো হন। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত ঘরে না ফেরার প্রত্যয় তাদের। কিন্তু গত বৃহস্পতিবার একটি তাঁবু লক্ষ্য নির্বিচারে গুলি চালায় অজ্ঞাত বন্দুকধারীরা। এরপরই আরো সহিংস হয়ে ওঠে সব পরিস্থিতি। প্রধানমন্ত্রী নিউওয়াত্থামরং বুনসংপাইসান সেই সময় নিরাপত্তার আশঙ্কা থাকায় ব্যাংককের বাইরে এক বিমান ঘাঁটিতে নির্বাচন কর্মকর্তাদের সাথে বৈঠক করছিলেন। কিন্তু হঠাত্ই বিক্ষোভকারীরা সেখানে হানা দেয়। দাঙ্গা পুলিশসহ অন্যান্য নিরাপত্তা কর্মীর উপস্থিতি সত্ত্বেও প্রায় একশ’ বিক্ষোভকারী থাই পতাকা হাতে বাঁশি বাজাতে বাজাতে পেছনের দরজা দিয়ে ঢুকে পড়ে ঐ ভবনে। সাথে সাথে আতঙ্ক ছড়ায় নির্বাচন কর্মকর্তাদের বৈঠক কক্ষে। প্রধানমন্ত্রী ও তার মন্ত্রিসভার সদস্যসহ সবাই বৈঠক শেষ না হতেই ভবনের সামনের ফটক দিয়ে কেটে পড়তে বাধ্য হন। সংবাদ সংস্থা এপি জানায়, নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবার আশঙ্কা থাকায় বৈঠকের স্থান নির্ধারণ করা হয়েছিলো রাজধানীর বাইরে। অথচ সেখানেই নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলো। অনেকেই তাই মনে করছেন, সরিষার মধ্যেই হয়তো ভূত ঢুকে পড়েছে। সরকারের মধ্যেই কেউ বিরোধীদের হয়ে তথ্য পাচার করছে।
তবে পরিস্থিতি যে কতটা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে, তা বলাই বাহুল্য। সেনাপ্রধান জেনারেল প্রাউথ চান-ওচা টেলিভিশন বিবৃবিতে কড়া সতর্কতা জারি করে স্পষ্টভাবে বলেন, পরিস্থিতি সহিংস হয়ে উঠলে সেনা বাহিনী বসে থাকবে না। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনতে তারা অবশ্যই মাঠে নামবে। এজন্যে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়ে সব পক্ষকেই সহিংসতায় না জড়ানোর অনুরোধ জানান সেনাপ্রধান। তিনি বলেন, ‘আমি সতর্ক করছি প্রতিটি গ্রুপকে, বিশেষ করে যারা বেসামরিক মানুষের বিরুদ্ধে যুদ্ধাস্ত্র ব্যবহার করছে- এসব এখনই বন্ধ করুন, তা না হলে শান্তি শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে সেনা সদস্যরা রাস্তায় নামবে।
এমনিতেই থাইল্যান্ডে গত কয়েক মাসের অচলাবস্থার মধ্যে ক’দিন পরপর সহিংস পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। সরকার পক্ষ ও সরকার বিরোধীদের মুখোমুখি অবস্থানে অচলাবস্থা সুরাহার কোন উপায় কারো জানা নেই। আরেকজনের দাবির প্রতি কোন পক্ষই শ্রদ্ধাশীল নয়। রাজনীতির মাঠ নিজেদের দখলে রাখার উন্মত্ত চেষ্টাও রয়েছে তাদের। এ অবস্থায় তাঁবুতে গুলিবর্ষণের জন্য সোজাসুজি ভাষায় রেড শার্ট বিক্ষোভকারী তথা ইংলাক সমর্থকদের দায়ি করে ইয়ালো শার্ট বিক্ষোভকারীরা। এ অবস্থায় অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে তারা তাদের আন্দোলন জোরদার করেছে। এই সরকারের অধীনে কোন নির্বাচন নয় বলে এরই মধ্যে ঘোষণা দিয়েছে তারা। বিক্ষোভকারীদের দাবি, আগের সরকার পতন। তারপর নিরপেক্ষ প্রধানমন্ত্রীর অধীনে রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও পদ্ধতিগত সংস্কার এবং এরপর নির্বাচন। সরকাকে ভয় দেখিয়ে এক্ষেত্রে অনেকটাই সফল হয়েছে ইয়েলো শার্ট বিক্ষোভকারীরা। হুমকি ধমকি আর নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবার আশঙ্কায় আগামী ২০ জুলাই আদৌ নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব হবে কি-না, সে ব্যাপারে এরই মধ্যে সংশয় ব্যক্ত করেছে নির্বাচন কমিশন। নির্বাচন নিয়ে সরকারেরর সাথে কমিশনের নতুন কোন বৈঠক হবে কি-না, সন্দেহ আছে। সরকার বিরোধীদের হামলার আশঙ্কার কথা বলায় সরকার এক্ষেত্রে নতুন পদ্ধতি আবিষ্কার করে বলছে, টেলিকনফারেন্স করে হলেও বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।
ইয়েলো শার্ট বিক্ষোভকারীরা এখন নিজেদের পরিচয় দিচ্ছেন পিপলস ডেমোক্রেটিক রিফর্ম কমিটি- পিডিআরসি’র কর্মী হিসেবে। এই রিফর্ম কমিটি বলছে, সরকারকে এখনই পদত্যাগ করতে হবে। একজন নিরপেক্ষ ব্যক্তিকে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ দিতে হবে। তিনিই কাঙ্ক্ষিত ও কার্যকরী সংস্কারের ব্যবস্থা নিবেন। পিডিআরসি মনে করে, বর্তমান পদ্ধতির নির্বাচনে ভোট কারচুপির সুযোগ রয়েছে। তাই সংস্কার প্রয়োজন। বিক্ষোভকারীদের শীর্ষ ত্রিশ নেতার বিরুদ্ধে গ্রেফতার আদেশ জারি করা সত্ত্বেও এই দাবি আদায়ে তারা দিচ্ছেন বিভিন্ন আলটিমেটাম। আন্দোলনকারীরা বিশ্বাস করেন, দেশের রাজনীতিতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী থাকসিন সিনাওয়াত্রা এবং তার বোন ইংলাক সিনাওয়াত্রার কোন ভূমিকা নেই। এ অবস্থায় খোদ সরকারের অনেকেই দেশে গৃহযুদ্ধ বাধতে পারে বলে সতর্ক বার্তা উচ্চারণ করছেন। অনেকেই ভাবছেন, দেশটি হয়তো দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়বে। কারণ উত্তর ও উত্তর-পূর্ব এলাকাসহ গ্রামগঞ্জ ও নগর এলাকায় ব্যাপক জনসমর্থন রয়েছে ইংলাক ও তার ভাই থাকসিনের।
এ সব কারণেই সেনা অভুত্থান অত্যাসন্ন বলে মনে করছেন সুশীল সমাজের অনেকে। কারণ বিগত সময়ে ১৮টি অভ্যুত্থান ঘটিয়েছে বা ঘটানোর চেষ্টা করেছে তারা। কিন্তু বিশ্লেষকরা বলছেন, পোলারাইজড অচলাবস্থা বা স্পষ্ট দু’টি অংশে জনবিভক্তির কারণে সৃষ্ট অচলাবস্থার মধ্যে সেনাবাহিনী নিজেকে জড়ানোর আগে অন্তত দু’বার ভাববে। এছাড়া গত কয়েক মাসে এমন হুমকি ধমকি দিয়ে বিবৃতি বেশ কয়েকবারই দিয়েছেন সেনাপ্রধান। লিডস বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং থাই রাজনীতি বিশ্লেষক ডানকান ম্যাককার্গোর মতে, ২০০৬ সালে প্রধানমন্ত্রী থাকসিনকে ক্ষমতাচ্যুত করা ছিলো সেনাবাহিনীর জন্য চরম শিক্ষা। সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে ঐ সময় দুর্বার আন্দোলন গড়ে ওঠে। আর এরপরই এমন অমীমাংসিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। ঐ অভ্যুত্থান ছিলো দেশের জন্য বড় ধরনের একটি বিপর্যয়। শুধু রাজনীতিতে নয়, বরং থাই সেনা বাহিনীর সুখ্যাতিতে বড় ধরনের কলঙ্ক লাগে সে সময়। ম্যাককার্গো বলেন, ক্ষমতা দখল তুলনামূলক সহজ। কিন্তু পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে ক্রান্তিকাল পার করা ভয়ানক কঠিন।