পরিবেশবান্ধব চামড়া শিল্প গড়ে ১৬ বিলিয়ন ডলার আয় সম্ভব

পরিবেশবান্ধব চামড়া শিল্প গড়ে তুলে আগামী এক দশকের মধ্যে এখাত থেকে ১৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রপ্তানি আয় করা সম্ভব। এক্ষেত্রে দেশের গুণগতমানের চামড়া, কাঁচামালের সহজ প্রাপ্যতাসহ অন্যান্য সুবিধা ইতিবাচক অবদান রাখবে। গতকাল রবিবার রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) আয়োজিত ‘বাংলাদেশে পরিবেশবান্ধব চামড়া শিল্প : টেকসই ও প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা অর্জনের রোডম্যাপ’ শীর্ষক সেমিনারে বক্তারা এ কথা বলেন। বক্তারা রপ্তানি প্রবৃদ্ধির ধারা ধরে রাখতে সবুজ প্রযুক্তির ব্যবহার, আধুনিক প্রশিক্ষণ সুবিধার প্রসার ও বিদেশি ক্রেতাদের কমপ্লায়েন্স ইস্যুতে ট্যানারি শিল্পে গুণগত পরিবর্তন আনার ওপর জোর দেন। রাজধানীর একটি হোটেলে অনুষ্ঠিত এ সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু। বিশেষ অতিথি ছিলেন বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ এবং পরিবেশ ও বন মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু। শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু বলেন, রানা প্লাজার দুর্ঘটনার পর বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প নিয়ে বিদেশি ক্রেতারা ছিনিমিনি খেলছে। চামড়া শিল্প নিয়ে কেউ যাতে এ ধরনের খেলা খেলতে না পারে, সেজন্য সাভারে পরিবেশবান্ধব চামড়া শিল্পনগরী গড়ে তোলা হয়েছে। এ নগরীতে কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি) স্থাপনের কাজ দ্রুত এগিয়ে চলছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। তিনি দ্রুত হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি স্থানান্তরের জন্য উদ্যোক্তাদের প্রতি আহ্বান জানান। এক্ষেত্রে উদ্যোক্তাদের ঋণ সুবিধা, শ্রমিক পরিবারের আবাসন, শিক্ষা ও চিকিত্সার সুযোগসহ অন্যান্য সুবিধাদি পর্যায়ক্রমে আলোচনা করে দেয়ার উদ্যোগ নেয়া হবে বলে তিনি জানান। শিল্পমন্ত্রী আরো বলেন, আমরা এখন যে হারে এগিয়ে যাচ্ছি তাতে ২০২১ সালের আগে বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের এবং ২০৪১ সালের আগে উন্নত দেশে পরিণত হবে। বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলেন, অনেক প্রতিকূলতা সত্ত্বেও চলতি বছরে এ পর্যন্ত বাংলাদেশ শতকরা ১৩ দশমিক ০২ ভাগ রপ্তানি প্রবৃদ্ধি অর্জনে সক্ষম হয়েছে। তিনি বলেন, ব্যবসায়ীদের মধ্যে আস্থা ফিরে এসেছে। তাদের জন্য পাঁচটি অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপন করা হচ্ছে। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা থাকলে বাংলাদেশ আরো এগিয়ে যাবে বলে তিনি উল্লেখ করেন। তিনি রপ্তানি প্রবৃদ্ধির জন্য পণ্য বহুমুখীকরণের পাশাপাশি রপ্তানির নতুন বাজার খুঁজে বের করার ওপর গুরুত্ব দেন। তিনি বলেন, শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকারের ফলে ভবিষ্যতে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া বাংলাদেশি চামড়াজাত পণ্যের অন্যতম রপ্তানি বাজার হবে। যুক্তরাষ্ট্রের বাজার প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, সেখানে জিএসপি সুবিধা বাতিল করা হলেও আমাদের রপ্তানি বাড়ছে। দক্ষিণ আমেরিকার বাজার প্রসঙ্গে তোফায়েল বলেন, সেখানকার ব্যবসায়ীরা এখন বাংলাদেশে আসছে। ব্রাজিল, চিলি প্রভৃতি দেশে আমাদের রপ্তানি বাড়ছে। পরিবেশ ও বন মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বলেন, নানা বাধা-বিপত্তি সত্ত্বেও বাংলাদেশের উদ্যোক্তারা এগিয়ে যাচ্ছে। ১৬ শতাংশ সুদে অর্থ নিয়ে তারা কারখানা চালাচ্ছে। অথচ আমাদের প্রতিযোগী দেশগুলোতে সুদের হার পাঁচ শতাংশের বেশি নয়। তিনি বলেন, আমাদের প্রশাসনে ধীরগতি রয়েছে, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতায় সমস্যা রয়েছে; কিন্তু গত ৪৩ বছরে বাংলাদেশের যা অর্জন তা খাটো করে দেখা ঠিক হবে না। তিনি আরো বলেন, রাজনীতির ঘূর্ণিপাকের কারণে বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত না হলেও নিরুত্সাহিত হয়। তাই আমাদের অর্জনকে সমালোচনা করা ঠিক হবে না। পরিবেশ মন্ত্রী বলেন, আমাদের বিশাল বাজার রয়েছে। শুধু যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপ নয়, অভ্যন্তরীণ বাজারেও ভোক্তার সংখ্যা ১৬ কোটির ওপরে। যা সমগ্র ইউরোপের জনসংখ্যার চেয়ে বেশি। মন্ত্রী হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি শিল্প স্থানান্তরের কথা উল্লেখ করে বলেন, এসব কারখানার বর্জ্য দিয়ে বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা এবং তুরাগ নদ দূষিত হচ্ছে। দেশের ৮০ শতাংশ মানুষ কমবেশি শ্বাসকষ্টে ভুগছে। সুতরাং এসব কারখানা সরিয়ে নেয়ার বিকল্প নেই। সেমিনারে অন্যান্যের মধ্যে সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপস, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মাহবুব আহমেদ, এফবিসিসিআইর সিনিয়র সহ-সভাপতি মনোয়ারা হাকিম আলী, ইপিবির ভাইস চেয়ারম্যান শুভাশীষ বসু, আরএমএম ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক অনিরুদ্ধ কুমার রায় এবং বিসিএসআইআর-এর চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এ.আই মোস্তফা প্রমুখ বক্তব্য রাখেন। গঙ্গার পানি চুক্তির সময় কংগ্রেস ক্ষমতায় ছিল না:তোফায়েল এদিকে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামন্ডলীর সদস্য ও বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ গতকাল রবিবার বিকালে রাজধানীর শাজহানপুর মাহবুব আলী মিলনায়তনে শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস উপলক্ষে জাতীয় শ্রমিক লীগ আয়োজিত আলোচনা সভায় বলেছেন, ভারতে যে সরকারই আসুক বাংলাদেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক অব্যাহত থাকবে। তিনি বলেন, ১৯৯৬ সালে ভারতের সঙ্গে যখন গঙ্গার পানি চুক্তি হয়েছিল তখন তো সেদেশে কংগ্রেস ক্ষমতায় ছিল না। কিন্তু তারপরও ৩০ বছরের এ পানি চুক্তি হয়। তোফায়েল আহমেদ বলেন, বিজেপি নেতা অটল বিহারী বাজপেয়ি যখন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন তখন আমরা ২৩টি পণ্যের ডিউটি ফ্রি মার্কেট পারমিট পেয়েছিলাম। এখন যে বাসে করে কলকাতায় যাই, সেটাও বিজেপি ক্ষমতায় থাকার সময়ই হয়েছিলো। চুক্তি হয় সরকারের সঙ্গে, দলের সঙ্গে নয়। তিনি বলেন, ভারত আমাদের প্রতিবেশি। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে ভারতের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক স্থাপন হয়েছে। জিয়াউর রহমান যখন স্বৈরশাসক ছিলেন তখন তিনি ভারতে গিয়ে লাল গালিচা সংর্বধনা পেয়েছিলেন। অথচ তখন ভারতে কংগ্রেস ক্ষমতায় ছিলো। বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ষড়যন্ত্র থেমে নেই। গত নির্বাচনে বিএনপি আসেনি। নির্বাচন ঠেকানোর চেষ্টা খালেদা জিয়া কম করেননি। উনার ক্ষমতা আমরা গত ৫ জানুয়ারির নির্বাচনেই দেখেছি। তিনি বলেন, ২০১৯ সালের ২৯ জানুয়ারির আগের ৯০ দিনের মধ্যে একাদশ নির্বাচন হবে। এ সময় পর্যন্ত বিএনপিকে ধৈর্য্য ধরে অপেক্ষা করতে হবে। আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল-আলম হানিফ বলেন, আমরা পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দিতে চাই যে ষড়যন্ত্রের রাজনীতি করে সফলতা পাওয়ার কোন সুযোগ নেই। ষড়যন্ত্র করে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতাচ্যুত করা যাবে না। শুক্কুর মাহমুদের সভাপতিত্বে সভায় আরো বক্তব্য রাখেন আওয়ামী লীগের শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হাবিবুর রহমান সিরাজ, মহিলা শ্রমিক লীগের সভাপতি রওশন জাহান সাথী প্রমুখ।