পাখির জন্য ভালোবাসা

মেহেদী হাসান গালিব

 

বার্ডম্যান অব চেন্নাই! সার্চ দিয়েছিলাম ‘চেন্নাইয়ের দর্শনীয় স্থান’ লিখে। কিন্তু ফলাফল দেখে খানিকটা দ্বিধায় পড়ে গেলাম। এটা কী কোনো জায়গার নাম? নাকি কোনো ব্যক্তির? কী আছে এখানে? চেন্নাইয়ের প্রচণ্ড গরমে প্রতিবার বাইরে যাওয়ার আগে খানিকটা ভেবে নিতে হতো যেখানে যাচ্ছি তা আসলেই দেখার মতো তো? নাকি শুধু শুধু এই গরমে নিজেকে সিদ্ধ করতে যাওয়া?

এরমধ্যেই চেন্নাইয়ের মোটামুটি সব ক’টি দর্শনীয় স্থান দেখা শেষ। হাতে পুরো একটি দিন ফাঁকা। গরমের দোহাই দিয়ে তো আর পুরো একটি দিন হোটেলে বসে থাকা যায় না। তাই শেষমেশ সিদ্ধান্ত নিলাম ঘুরে আসা যাক। কিন্তু গুগল ম্যাপ জানালো বার্ডম্যান অফ চেন্নাই দেখার সুযোগ মিলবে বিকেল ৪টার পর। তখন বাজে সবে ১টা। তাই খাওয়া-দাওয়ার পালা শেষ করে ঘুরতে গেলাম চেন্নাইয়ের অন্যতম জনপ্রিয় একটি পার্ক সিমোজি পুঙ্গায়। নিরিবিলি ও সবুজে আচ্ছ্বাদিত এই পার্কটি বিকেলে বসে থাকা কিংবা হেঁটে বেড়ানোর জন্য অত্যন্ত চমত্কার একটি জায়গা। যদিও বা এই পার্কটিও আমাদের দেশের চিড়িয়াখানা ও পার্কের মতো চলে গেছে কপোত-কপোতীদের দখলে।

পার্কটি আয়তনে খুব বেশি বড় না। তাই তো মাত্র ১৫ মিনিট পরই আবিষ্কার করলাম পুরো পার্ক ঘোরা শেষ। সময় কাটানোর জন্য বসে পড়লাম পার্কের একটি বেঞ্চে। সামনে বাচ্চাদের খেলাধুলার বিভিন্ন সরঞ্জাম। বাচ্চারা সেখানে খেলছে। বাচ্চাদের খেলা দেখতে দেখতে অপেক্ষা করতে লাগলাম কখন ঘড়ির কাঁটা গিয়ে পৌঁছাবে সাড়ে ৩টার ঘরে।

অতঃপর সাড়ে ৩টা বাজতেই এক লাফে উঠে পড়লাম। পার্ক থেকে বেরিয়ে সোজা রওনা দিলাম বার্ডম্যান অফ চেন্নাইয়ের উদ্দেশ্যে। মিনিট ১৫ পর উবার ড্রাইভার রাস্তার পাশে গাড়ি থামিয়ে ইশারায় জানালো এটাই বার্ডম্যান অফ চেন্নাই। আমি জানালা দিয়ে বাইরে তাকালাম। একটা লন্ড্রির দোকান ছাড়া আর কিছুই চোখে পড়লো না। খানিকটা হতাশ হয়েই গাড়ি থেকে নামলাম। লন্ড্রির দোকানের কর্মরত যুবককে জিজ্ঞেস করলাম, ‘বার্ডম্যান অফ চেন্নাই কোথায়?’ সে হাত দিয়ে পাশের একটি তিনতলা বাড়ি দেখিয়ে দিলো।

বাড়িটির মূল দরজায় দাঁড়িয়ে ওপরে তাকাতেই লক্ষ্য করলাম, একজন ভদ্রলোক খাঁচা থেকে একটি টিয়াপাখি বের করে এক কিশোরীর হাতে বসিয়ে দিলেন। বুঝতে বাকি রইলো না ইনিই বার্ডম্যান অফ চেন্নাই। আমাদের সঙ্গে চোখাচোখি হতেই তিনি হাত নেড়ে ওপরে উঠতে বললেন। তিনতলায় উঠতেই আমাদের স্বাগত জানিয়ে আবার আপন কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন বার্ডম্যান অফ চেন্নাই। ছাদের দু-প্রান্তে কাঠের পাটাতন বসিয়ে সেখানে ভেজা চাল রাখতে লাগলেন তিনি। কাজের ফাঁকেই আধো হিন্দি, আধো ইংরেজিতে কথা হলো বার্ডম্যান অফ চেন্নাইয়ের সঙ্গে।

তাঁর আসল নাম জোসেফ শেখর। পেশায় তিনি একজন ক্যামেরা টেকনিশিয়ান। শেখরের ‘বার্ডম্যান অফ চেন্নাই’ হয়ে ওঠার গল্পটা জানতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে ২০০৬ সালে। সেসময় চেন্নাইকে সম্মুখীন হতে হয়েছিল ভয়াবহ একটি সুনামির। সুনামির পর হঠাত্ একদিন শেখর লক্ষ্য করলেন তাঁর বাসার ছাদে দুটি টিয়াপাখি এসে বসেছে। শেখর তাঁদের খাবার দিলেন। পরের দিন তিনি লক্ষ্য করলেন তাঁর ছাদে এসে উপস্থিত হয়েছে ৪টি টিয়াপাখি। এরপর ৮টি। এভাবেই ধীরে ধীরে শেখরের বাসার ছাদে বাড়তে থাকে টিয়াপাখির ভিড়। বর্তমানে যে সংখ্যা গিয়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজারে! তবে এই সংখ্যাটা নির্ভর করে আবহাওয়ার ওপর। আবহাওয়া ভালো থাকলে অনেক সময় তা ৪ হাজারেও গিয়ে পৌঁছায়।

দিনে দু-বেলা টিয়াপাখিদের খাবার দেন শেখর, সকাল ও বিকেলে। ৩০ কেজি করে মোট ৬০ কেজি চাল খাবার হিসেবে দেন তিনি। নিজের আয়ের ৪০ শতাংশই তিনি ব্যয় করেন পাখিদের খাওয়ানোর জন্য। শুধু তাই নয়, অসুস্থ পাখিদের নিজের কাছে রেখে সেবাও দিয়ে থাকেন শেখর। এরপর সুস্থ হলে আবার তাদের উড়িয়ে দেন মুক্ত আকাশে।

এরমাঝেই আরো দু-তিনজন দর্শনার্থী এসে হাজির শেখরের বাসায়। শেখর একে একে সবাইকে কাঠের পাটাতনে চাল রাখার সুযোগ দিলেন। অতঃপর নিজের মোবাইলে ধারণ করে রাখলেন সে দৃশ্য। চাল রাখা শেষ হলে শেখর সবাইকে নিয়ে গেলেন রাস্তার ওপারের একটি বিল্ডিংয়ে। সেই বিল্ডিংয়ের চারতলায় দাঁড়িয়ে আমরা অপেক্ষা করতে লাগলাম টিয়াপাখির জন্য। কিন্তু টিয়াপাখির কোনো দেখা নেই। প্রায় মিনিট দশেক পর হঠাত্ করে কোথা থেকে একঝাঁক টিয়া এসে শেখরের বাসার ওপর দিয়ে উড়ে চলে গেল। তার ঠিক পরপরই চারপাশ থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে টিয়া এসে বসতে লাগলো শেখরের বাসার ছাদে। শেখরের বাসার ওপরের নীল আকাশটা যেন মুহূর্তেই ঢেকে গেল টিয়াপাখির ডানায়। রাস্তার পাশের কারেন্টের তারগুলোতেও রইলো না তিল পরিমাণ ফাঁকা জায়গা। কী মনোমুগ্ধকর এক দৃশ্য!

একবার মনে হলো শেখরকে জিজ্ঞেস করি, ‘কেনই বা তিনি এ রকম নিঃস্বার্থভাবে বছরের পর বছর পাখিদের খাইয়ে চলেছেন?’ কিন্তু পরক্ষণে নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করে বসলাম, সব কেন’র কী কোনো উত্তর থাকে? দেশ-বিদেশ থেকে প্রতিদিন অসংখ্য পর্যটক পাখি দেখতে আসেন শেখরের বাসায়। পাখির মতো পর্যটকদেরও নিজের অতিথি মনে করেন তিনি। আন্তরিক ব্যবহার দিয়ে মুহূর্তেই সবাইকে আপন করে নেন সদা হাসিখুশি থাকা এই মানুষটি। ‘নিয়মিত এত এত পর্যটক আসার পরও কেন টিকেট সিস্টেম চালু করেননি?’—প্রশ্নের জবাবে একগাল হেসে শেখর বলেন, ‘পাখিদের দু-মুঠো খাওয়াতেই আমার তৃপ্তি। তারা যখন নীল আকাশে উড়ে বেড়ায়, সেই দৃশ্যটা দেখলেই মনটা আনন্দে ভরে ওঠে। টাকা দিয়ে কী এই ভালোলাগাটুকু পাওয়া যাবে?’

বেলা ডুবে যেতে খুব বেশি দেরি নেই। ধীরে ধীরে পাখিরাও ফিরে যেতে শুরু করেছে। আমরা শেখরের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে হোটেলের পথে রওনা দিলাম। খানিকটা পথ এগোনোর পর পেছনে ফিরে দেখি শেখর, বার্ডম্যান অফ চেন্নাই মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন আকাশের দিকে। ঠিক যেমন মুগ্ধতা নিয়ে একজন বাবা তাকিয়ে থাকেন তাঁর সন্তানদের দিকে।

ছবি:লেখক