১২ উপজেলা নির্বাচন অনুষ্ঠিত
প্রকাশ : ১৯ মে ২০১৪, ২৩:০৬
ষষ্ঠ ধাপের উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে কেন্দ্র দখল, এজেন্টদের মারধর, জালভোট প্রদান ও ব্যালট ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। গতকাল সোমবার সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত ১২টি উপজেলায় ভোট গ্রহণ হয়। একই সময়ে ময়মনসিংহের তারাকান্দা উপজেলায় চেয়ারম্যান পদে উপ-নির্বাচনে ভোট গ্রহণ হয়। অনিয়মের অভিযোগ এনে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগর ও বরগুনার তালতলী উপজেলার বিএনপি-সমর্থিত চেয়ারম্যান প্রার্থীরা ভোট বর্জন করেছেন।
ভোটগ্রহণ শেষে গতকাল বিকালে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমাদের কাছে মাঠ পর্যায় থেকে যে প্রতিবেদন এসেছে, তাতে নির্বাচন অন্যবারের চেয়ে সন্তোষজনক হয়েছে। মোট ৭৪৬টি কেন্দ্রের মধ্যে দুইটি কেন্দ্রের ভোটগ্রহণ স্থগিত এবং একটি কেন্দ্রের ভোটগ্রহণ বাতিল করা হয়েছে।’ গতকাল রংপুর সদর, কাউনিয়া, গঙ্গাচড়া ও পীরগাছা, সিরাজগঞ্জের কামারখন্দ, বরগুনার তালতলী, টাঙ্গাইলের বাসাইল, গাজীপুর সদর, রাজবাড়ীর কালুখালী, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগর, কুমিল্লার আদর্শ সদর এবং সদর দক্ষিণে ভোগ গ্রহণ হয়। এসব উপজেলায় মোট চেয়ারম্যান পদে ৬৪ জন, ভাইস-চেয়ারম্যান পদে ৬৯ জন এবং মহিলা ভাইস-চেয়ারম্যান পদে ৪৯ প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।
কুমিল্লায় দুই কেন্দ্রে ভোট স্থগিত, কেন্দ্র দখল ও ব্যালট ছিনতাইয়ের অভিযোগ
আমাদের কুমিল্লা প্রতিনিধি মো. লুত্ফুর রহমান জানান, জেলার আদর্শ সদর উপজেলার সুবর্ণপুর ভোট কেন্দে গতকাল সকাল ১০টার দিকে ৬০০ ব্যালট পেপার ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এছাড়া বামইল স্কুল এন্ড কলেজ কেন্দে ককটেল বিস্ফোরণসহ জালভোট দানের ঘটনা ঘটে। এ সময় আনোয়ার হোসেন নামে একজনকে (৩০) ৯টি ব্যালট পেপারসহ আটক করে ৬ মাসের সশ্রম কারাদণ্ড দেয়া হয়। তাছাড়া আবু নাসের (২৮) নামে একজন ভুয়া এজেন্টকে আটক করে ৫ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করেন সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট শফিকুল ইসলাম। ধর্মপুর কেন্দ সহ বেশ কয়েকটি কেন্দে ককটেল বিস্ফোরণ ও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এ সময় কমপক্ষে ৪ জন আহত হয়। সকাল ১০টার দিকে দৌলতপুর ছায়া বিতান প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দে প্রিজাইডিং অফিসারকে মারধর করে ৬০০ ব্যালট পেপার ছিনতাই করে নিয়ে যায় দুর্বত্তরা।
পাঁচথুবী ইউনিয়নের রাছিয়া আলিম মাদ্রাসা ভোট কেন্দ্র ও বন্দীশাহী উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দে মোট ৬২১টি জাল ভোট বাতিল করা হয়েছে। আড়াইওড়া পশ্চিম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দে বেশ কয়েকটি গুলিবর্ষণ ও প্রায় ১৫টি ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। দুর্গাপুর উত্তর ইউনিয়নের আলেকজান মেমোরিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের মহিলা ভোট কেন্দে সংঘর্ষে সালাউদ্দিন নামে একজন গুলিবিদ্ধ হয়েছে। তাকে কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিত্সার জন্য নেয়া হয়। কুমিল্লার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (দক্ষিণ) আলী আশরাফ জানান, ভোট চলাকালে পুলিশ বিভিন্ন অভিযোগে জয়নাল আবদীন, মনির, অদুদসহ ৬ জনকে আটক করেছে। এছাড়া ১টি পিস্তল ও ৪টি গুলি উদ্ধার করা হয়েছে। গতকাল বিকালে সাংবাদিক সম্মেলন করে ১৯ দল সমর্থিত বিএনপি দলীয় চেয়ারম্যান প্রার্থী ফজলুল হক ফজলু জানান, তার প্রতিপক্ষ প্রার্থীর কর্মীরা দুপুরের মধ্যেই বেশিরভাগ কেন্দ দখল করে নেয়। তিনি ৩০টি কেন্দে পুনঃভোট গ্রহণের দাবি জানান।
এদিকে জেলার সদর দক্ষিণ উপজেলার পিপুলিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এসময় পুলিশ ৮টি ফাঁকা গুলি ছুঁড়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এ সময় বিএনপির দুইজন কর্মী গুলিবিদ্ধ হয়েছে। এদিকে চেয়ারম্যান প্রার্থী খন্দকার জহিরুল ইসলাম স্বপন সাংবাদিক সম্মেলন করে প্রতিপক্ষ প্রার্থীর বিরুদ্ধে দুপুর ১টার মধ্যে উপজেলার বেশিরভাগ কেন্দ দখলের অভিযোগ এনে ভোট প্রত্যাখ্যান করেন। বিকাল সাড়ে ৩টার দিকে জেলা রিটার্নিং অফিসারের কাছে লিখিত অভিযোগ করে এ উপজেলায় পুনঃভোটের দাবি জানান।
জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা রাশেদুল ইসলাম জানান, আইন-শৃংখলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটায় দৌলতপুর ছায়াবিতান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও আফজল খান কমার্স কলেজ কেন্দে র ভোটগ্রহণ স্থগিত ঘোষণা করা হয়েছে।
তালতলিতে দুই চেয়ারম্যান প্রার্থীর ভোট বর্জন
বরগুনা (দক্ষিণ) প্রতিনিধি আবদুল আলীম হিমু জানান, কারচুপি, কেন্দ দখল, ও প্রশাসনিক সহায়তায় ভোট ডাকাতির অভিযোগ এনে বরগুনা জেলার তালতলি উপজেলা নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বী তিনজন প্রার্থীর দু’জনেই ভোট বর্জন করেছেন। গতকাল দুপুর ১২টার দিকে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে বিএনপি সমর্থিত আবদুল মজিদ তালুকদার ও বিএনপি বিদ্রোহী ফরহাদ হোসেন আক্কাস মৃধা ভোট বর্জনের ঘোষণা দেন।
বিজয়নগরে কারচুপি ও কেন্দ্র দখল, ৩ প্রার্থীর নির্বাচন বর্জন
ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি ও বিজয়নগর সংবাদদাতা জানান, বিজয়নগর উপজেলার নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সমর্থিত চেয়ারম্যান প্রার্থীর পক্ষে কেন্দ্র দখল ও পোলিং এজেন্টদের মারধর করে কেন্দ্র থেকে বের করে দেয়ার অভিযোগ এনে গতকাল দুপুরে বিএনপির প্রার্থী এডভোকেট শরিফুল ইসলাম লিটন, স্বতন্ত্র প্রার্থী সাহিদ সিরাজী ও জাতীয় পার্টি প্রার্থী এমদাদ বারী নির্বাচন বর্জন করেন।
সহকারী রিটার্নিং অফিসার ও বিজয়নগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বশিরুল হক ভুঞা জানান, লিখিত কোন অভিযোগ পাইনি। কেন্দে গোলযোগের সংবাদ পাওয়ার পরপরই ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।
কালুখালীতে এজেন্টদের বের করে ভোটারদের মারধর
রাজবাড়ী প্রতিনিধি শ্যামল কুমার মজুমদার জানান, রাজবাড়ীর নবগঠিত কালুখালী উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের ভোট গ্রহণের শুরু থেকেই আওয়ামী লীগ সমর্থিত কাজী সাইফুল ইসলামের আনারস প্রতীকের সমর্থকরা প্রতিপক্ষ সকল প্রার্থীর এজেন্ট ও কর্মীদের কেন্দ থেকে বের করে দেয় বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। পরে ভোটারদের ব্যালট পেপার ছিনিয়ে নিয়ে তাতে আনারস প্রতীকের সিল মেরে ব্যালট বাক্সে রেখে দেয়। সকাল ৮টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত কালুখালী মদাপুর ইউপির গড়িয়ানা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে এ ঘটনা চলে। এছাড়া আনারস প্রতীকের কর্মীরা মদাপুরের ধুবাড়ীয়া, গোপালপুর ও গোয়ালপাড়া এলাকার কেন্দ দখল করে ভোট কেটে নিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
কালুখালীর সাওরাইল ইউনিয়নের বিকয়া এলাকায় চলে হাসুয়া ও রামদা নিয়ে মহড়া। দুপুরে যুবদল নেতা সাজাহান আলী বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী রাজ্জাক খানকে ভোট দিতে এলে কাজী সাইফুল ইসলামের কর্মীরা তাকে মারপিট করে গুরুতর আহত করে। এছাড়া কৃষকলীগ সমর্থিত প্রার্থী নুরে আলম সিদ্দকী হকের পক্ষে মসলেম মন্ডল ভোট দিতে গেলে তাকেও কুপিয়ে আহত করে।
জামালপুর কেন্দে প্রকাশ্য ভোট নেয়ায় ভ্রাম্যমাণ আদালত সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার হাবিবুর রহমানকে ২ হাজার টাকা ও ২ পোলিং অফিসারকে ২ হাজার টাকা জরিমানা করে।
কামারখন্দে ৮শ’ ব্যালট পেপার উদ্ধার
সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি ফজল-এ-খোদা লিটন জানান, সিরাজগঞ্জের কামারখন্দ উপজেলা নির্বাচনে জাল ভোট দেয়ার সময় ফয়সাল আহম্মেদ নাঈম (১৮) নামে একজনকে আটক করেছে পুলিশ। এ সময় প্রায় ৮টি ব্যালট বইয়ের সরকার দল সমর্থক প্রার্থীদের প্রতীকে সিল দেয়া ৮০০ ব্যালট পেপার জব্দ করা হয়।
রংপুরের বিএনপির বিদ্রোহী চেয়ারম্যান প্রার্থী আটক
রংপুর প্রতিনিধি ওয়াদুদ আলী জানান, রংপুর সদর উপজেলায় গত রবিবার রাতে বিএনপির বিদ্রোহী চেয়ারম্যান প্রার্থী খলেয়া ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি মাসুদ রানা ও তার সমর্থক মমিনপুর ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য শামসুল আলমকে ইউনিয়নের শালমারা লালচাঁদপুর এলাকায় অর্থ বিতরণ কালে পুলিশের হাতে ধরা পড়েন। গতকাল ভোট চলাকালে কাউনিয়া উপজেলার হারাগাছ ইউনিয়নে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী আনোয়ারুল ইসলাম মায়া ও বিএনপির সমর্থিত প্রার্থী মাহফুজার রহমান মিঠু সমর্থকদের মধ্যে কথা কাটাকাটি ও ধস্তাধস্তির ঘটনা ঘটে। এতে ৬/৭ জন কর্মী সমর্থক আহত হয়।
এদিকে কাউনিয়া ও গঙ্গাচড়া উপজেলা পরিষদের নির্বাচন সুষ্ঠু এবং শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়েছে।
গাজীপুর সদরে শান্তিপূর্ণ ভোট
গাজীপুর প্রতিনিধি জানান, গাজীপুর সদর উপজেলা নির্বাচনে ৪৪টি কেন্দে র ২৯০টি বুথে সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত শান্তিপূর্ণ ভাবে ভোট গ্রহণ সম্পন্ন হয়। নির্বাচনী এলাকার কোথাও কোন অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি। এছাড়া টাঙ্গাইলের বাসাইল ও ময়মনসিংহের তারাকান্দা উপজেলায় (শুধু চেয়ারম্যান পদে) নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়েছে।
সবমিলিয়ে এখন পর্যন্ত দেশের ৪৮৭টি উপজেলার মধ্যে ৪৭১টিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হল।