কথা-বলা পাখির অবাক দেশে
প্রকাশ : ২০ মে ২০১৪, ২০:২৬
রাসেল আর তার ছোট বোন রেনি স্কুল থেকে ফিরছিল। পথে হঠাত্ আলাদীনের সাথে ওদের দেখা। আলাদীনের পায়ের তলায় ফুটে ছিল কাঁটা। রেনি-রাসেল সেই কাঁটা তুলে ফেলতে সাহায্য করলো। তখন সে জানাল যে সে একজন যাদুকর। আর সে ওদের জন্য এক আশ্চর্য সুযোগ দিতে পারে। যাদুকর আলাদীন ওদের অদৃশ্য করে উড়িয়ে নিয়ে পৌঁছে দেবে এক একটা জায়গাতে, যেখানে যাওয়া খুব কঠিন। আর সেসব জায়গাতে একটা নতুন বা বেশ অদ্ভুত ব্যাপার দেখা যাবে। দু’ঘন্টা পর আবার বাসায় ফিরিয়ে আনবে।
অদ্ভুত জায়গার বিষয়ে তেমন কিছুতো জানে না রেনি আর রাসেল। তাই আলাদীনকেই অনুরোধ করলো যে কিছু একটা জায়গা বেছে নিতে।
আলাদীন বললো,
‘চলো, তাহলে তোমাদের একেবারে মায়ানমার, বর্ডারের কাছে লাটিমটিলায় নিয়ে যাই।’
সাথে সাথেই রেনির একগণ্ডা প্রশ্ন, ‘কী আছে ওখানে? ওটার এরকম আজব নাম কেন? ওখানে কি মানুষজন থাকে? কোনও দৈত্য-দানব থাকে?’
আলাদীন তখন ওদের বুঝিয়ে বলল যে, ওটা একটা ছোট্ট টিলার মত। কিন্তু ওটার তলাটা সরু আর উপরের দিকটা ছাতার মত হয়ে মেলে আছে। শুধু একটা সরু জায়গা খাড়াভাবে নেমে মাটি ছুঁয়েছে। সেদিক দিয়ে অনেক কষ্টে দু’-চার জন টুরিস্ট মাঝে-মধ্যে ওপরে ওঠে। তবে সেটা এত কঠিন যে উঠেই সবাই ক্লান্ত হয়ে যায় আর দ্রুত নেমে আসে। অর্থাত্ সেখানে লোকজন স্থায়ীভাবে কেউ থাকে না। কাজেই সেখানে মানুষের সাথে হয়তো দেখা হবে না কিন্তু দেখা হতে পারে এক ধরনের আজব পাখির সাথে।
রেনি তো মহাখুশি। জিজ্ঞেস করলো ‘কেমন পাখি সেটা? খুব হিংস্র নয়তো?’
আলাদীন অভয় দিয়ে বললো,
‘আরে না, সে হচ্ছে এক উপকারী পাখি। দেখতে বেশ বড়সড়। আর তার আসল বৈশিষ্ট্য হচ্ছে সে কথা বলতে পারে। সেটা তো পারতেই হবে। কথা বলতে না পারলে লোকের উপকার করবে কিভাবে!’
কাজেই ওরা চলল সেই লাটিমটিলার দিকে। সেখানে নামিয়ে দিয়ে আলাদীন বলল,
‘সাবধানে থাকবে, ঘুরে-ফিরে সবদিক দ্যাখ। আর কথা বলা পাখি যা বলবে, সেটা মেনে চলবে, তাহলে কোন বিপদ হবে না।’
ওরা যতই হাঁটছে আর দেখছে, ততই অবাক হচ্ছে। কী সুন্দর গাছপালা, রঙিন পাতা, ফুল নিয়ে ঝোপঝাড়। কোনটা বড়, কোনটা ছোট। মাঝে মাঝে উঁচু গাছ ছায়া দিচ্ছে। ছোট ছোট পাখি কিন্তু ওরা তো শুধু কিচকিচ করছে। কথা বলার কোন চেষ্টা করছে না।
ওরা যেতে লাগল টিলার মাঝের দিকে। গাছপালা ক্রমশ ঘন হয়ে আসছে। হঠাত্ শুনতে পেল মিষ্টি একটা ঝিরিঝিরি শব্দ— যেন কেউ গান গাইছে। ওরা শব্দ লক্ষ্য করে এগোতে লাগল। শব্দটা যেন ওদের টানছে।
একটু সামনে গিয়েই ওরা তো অবাক। একটা সরু ঝরনা ঝিরিঝিরি করে নামছে। নীচে যে জায়গাটায় পানি পড়ছে, সে জায়গাটা পরিষ্কার বালুতে ঢাকা, ঝকঝক করছে। কী অপূর্ব দৃশ্য। দু’জনেই বলে উঠল, ‘বাহ! কী সন্দর।’
রাসেল তাড়াতাড়ি সামনের দিকে এগোতে লাগল আর বলতে লাগল,
‘আমি ঝরনাটাকে ছোঁব, ওই পানি হাতে নেব।’
হঠাত্ ওরা শুনল দুটি পাখির ডানা ঝাপটানি। তারপর পাখিটা বলল, ‘না যেও না।’
শুনেই রেনি থমকে দাঁড়াল। রাসেলকেও বলল,
‘তুই ওদিকে যাস না। পাখিটা মানা করছে।’
রাসেল চমকে পেছনে তাকাতে তাকাতে সামনে বালিতে একটা পা দিয়েই পেছনে কাত হয়ে ধপাস করে পড়ে গেল। যে পা বালিতে রেখেছিল, সেটা অনেকটা ভেতরে ঢুকে গিয়েছে।
পাখিটা আবার বলল,
‘নড়বে না, বসে থাক।’
রেনি তার নিজের জায়গাতে বসে রাসেলের হাত টেনে ধরে ভয়ে কাঁপতে লাগল। রাসেলেরও মুখ শুকনো। বললো,
‘বালিটা ভেজা তো তাই পা ঢুকে গিয়েছে। এখন বের করবো কেমন করে?’
রেনির ততক্ষণে চিন্তা হচ্ছে যে ওটা সাধারণ বালু নয়, নয়তো এত সহজে পা ভিতরে ঢুকবে কেন। আচ্ছা এটাকেই কি চোরাবালি বলে নাকি? তা যদি হয়, তাহলে উপায়! তখন শুনল আরেকটা পাখি বলছে ‘টান, টানতে থাক।’ রেনি তখন রাসেলের দুই হাত ধরে পিছন দিকে টানতে লাগল। কিন্তু ব্যাপারটা এত কঠিন হবে সেটা ভাবতে পারেনি। দু’ইঞ্চি ওঠে তো ক্লান্ত হয়ে হাত ছেড়ে দিলে আবার সেটা ঢুকে যায়। চার-পাঁচ ইঞ্চি বের হবার পর রাসেল নিজেও শুকনো মাটিতে কাত হয়ে পা টানতে থাকলো। পা যখন সবটা বের হয়েছে তখন ওরা দু’জনেই ঘামে জবজবে।
উল্টোদিকে হাঁটা ধরবে, তখনই দেখলো অবাক হওয়ার আরও অনেক কিছু বাকি। সামনে দাঁড়িয়ে আছে ওদেরই বয়সী দুটি ছেলে-মেয়ে। ওদের হাতে দুটো করে আপেল।
রেনি-রাসেলের দিকে হাত বাড়িয়ে ওদের একটা করে দিল। এবার রাসেল সাবধান হয়েছে। তাই চট করে কামড় না বসিয়ে বলল, ‘আচ্ছা এরা কোত্থেকে উদয় হলো? এসব আপেল খেলে আবার কোনও ক্ষতি হবে না তো?’
তখনই শুনতে পেল উপর থেকে পাখিটা বলছে,
‘খাও, খাও।’
ওরা খেতে শুরু করল। তখনি বুঝল যে ওরা এত ক্লান্ত হয়েছিল যে এগুলো না খেলে আর হাঁটতে পারত না। আপেল শেষ হলে ছেলে-মেয়েগুলো এনে দিল মুঠো ভর্তি বাদাম। সবাই মিলে সেগুলো শেষ করলো। এবার রাসেল রেনিকে বলল,
‘চল, এই টিলার কিনারার দিকে যাই। যেখান থেকে এসেছি, সেখানে অপেক্ষা করতে হবে, যাতে আলাদীন এসেই আমাদের নিয়ে যেতে পারে।
অন্য দুটো বাচ্চাও ওদের সাথে এগিয়ে এল, রাসেল জিজ্ঞেস করলো ওদের নাম কী। মেয়েটা বলল, টুনি। ছেলেটা বলল, টুপু। ওদের কথা শুনে মনে হচ্ছিল ঠিক পাখিদের মতই গলার স্বর।
আর কয়েক পা হেঁটেই রেনি এক অদ্ভুত কাণ্ড করল। সে হাঁটা বন্ধ করে স্থির হয় দাঁড়িয়ে পড়ল। তারপর রাসেলকে বলল,
‘শোন, আমি আর ফিরে যাব না। আমি ওদের সাথে থাকব। কী সুন্দর এই জায়গাটা। তুই চলে যা।’
রাসেল তো তাজ্জব বনে গেল। বলে কী তার বোনটা! অচেনা দুটা ছেলে-মেয়ে, আর কতগুলো পাখি। এখানে মানুষ কতক্ষণ থাকতে পারে? আর এখানে খাবে কী। এই শেষ প্রশ্নটাতেই বেশি ঘায়েল করা যাবে ভেবে সেটাই জিজ্ঞেস করলো রেনিকে।
‘এই তুই এখানে থাকবি যে, খাবি কী?’
রেনির যেন উত্তরটা মুখস্থ ছিল, সেভাবে বলল, ‘কেন, আপেল আর বাদাম।’
রাসেল রেনিকে হাত ধরে নিয়ে একটু খোলা জায়গাতে বসলো। একটু চিন্তা করার চেষ্টা করলো রাসেল। সে ভাবল যে রেনি বোধহয় ক্লান্ত হয়ে এসব উল্টাপাল্টা কথা বলছে। তারপর হঠাত্ মনে হলো, আচ্ছা টুনী আর টুপুর বাবা-মা কোথায়। জিজ্ঞেস করে ফেলল রাসেল, ‘টুপু, তোমরা কতদিন ধরে এখানে আছ?’
টুপু শুধু বলল, ‘অনেক।’
রাসেল জানতে চাইল,
‘বাদামগুলো কোথায় পাও? শুধু এগুলো খেয়ে থাক?’ ছেলেটা বলল,
‘পাখি আনে। হ্যাঁ থাকি।’
এবারে রালে খেয়াল করলো যে ওরা যেভাবে কথা বলছে সেটা ঠিক পাখিদের মত গলায়। সে চিন্তিত হয়ে রেনিকে বলল, ‘ওরা এত কম কথা বলছে। আর ওদের কথার ভঙ্গী দেখেছিস, ঠিক পাখিগুলোর মত। ওদের একটু অন্য কথা জিজ্ঞেস করতো। দেখি ওরা কী বলে।’
রেনি এবার টুনীকে জিজ্ঞেস করলো,
‘তোমাদের আগের বাড়িটা কেমন ছিল? কোন স্কুলে পড়তে? তোমার বন্ধুদের কথা বল।’
ওরা দু’জন চুপ। একটু পর বলল,
‘শুধু পাখি বন্ধু’
রেনি আবার জিজ্ঞেস করলো,
‘তোমরা বাড়ি ফিরে যাবে?’
ওরা সমস্বরে বলল, ‘না, না, না না।’
রাসেল বিষয়টা বোঝার চেষ্টা করলো। কিছুক্ষণ চিন্তা করে তারপর রেনিকে বোঝাবার জন্য বললো,
‘দ্যাখ, ওরা কথা বলছে ঠিক পাখিগুলোর মত করে। কিছুদিন থাকলে তোরও এই দশা হবে। তখন আমাদের সবার কথা ভুলে যাবি। তুই কি তাই চাস? সবাই তো তোর বুদ্ধির প্রশংসা করে। এখন তোর বুদ্ধিশুদ্ধি উবে যাচ্ছে মনে হয়।’ রাসেল থামার পর রেনি বলল,
‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, তুই চলে যা।’
বলেই রেনি নিজেও অবাক হলো, যে তার গলার স্বরও তো ওই পাখিগুলোর মত মনে হচ্ছে।
তখন ওরা দু’জনেই আবার দেখল দুটো বড় পাখি ছটপট করছে আর বলছে,
‘যাও তোমরা যাও?’ রেনি বললো, ‘কেন যেতে বলছো?’
পাখিরা চেঁচালো, ‘তোমরা এখানে তাকলে হাজার লোক আসবে খুঁজতে। ওরা গাছপালা ভাঙবে, আমাদের তাড়া করবে।’ রেনি তবু তর্ক করতে ছাড়ল না,
‘ওই টুনী আর টুপুকে খুঁজতে আসে না?’ পাখিরা বললো,
‘ওদের কেউ নেই।’
রেনি জানে, পাখিদের কথা না মানলে বিপদ হবে। কাজেই রাসেলের হাত ধরে এগোতে লাগল আর বলল, ‘চল ফিরে যাই।’
ফিরে আসার কয়েকদিন পর রাসেল ধরে বসল রেনিকে, ‘এই তুই সেই পাখিদের দ্বীপে কেন থেকে যেতে চাচ্ছিলি?’ রেনি জানে, এটা একটু অদ্ভুত। তবু তার মনের কথাটা সে বোঝানোর চেষ্টা করলো,
‘দ্যাখ, ওখানে কোন চিন্তা নাই। পাখিরা সব বিপদ থেকে উদ্ধার করবে। আর এখানে আব্বুর যখন সন্ধ্যায় অফিস থেকে ফিরতে দেরি হয়, আম্মুর চোখে থাকে ভয়। আর আমারও চিন্তায় মাথা ব্যথা করে।’