জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম
প্রকাশ : ২০ মে ২০১৪, ২০:২৭
কাজী নজরুল ইসলাম আমাদের জাতীয় কবি। আমরা সবাই তাঁর নাম জানি। তাঁর লেখা পড়ি। তাঁর গান শুনি, তাই না? তাঁর লেখা ‘থাকব না কো বদ্ধ ঘরে/ দেখব এবার জগত্টাকে/ কেমন করে ঘুরছে মানুষ যুগান্তরের ঘূর্ণিপাকে’ (সংকল্প) কিংবা ‘ভোর হল দোর খোল/ খুকুমণি ওঠরে/ ওই ডাকে যুঁই-শাখে ফুল-খুকি ছোটরে’ (প্রভাতী); অথবা তাঁর সেই মজার কবিতা লিচুচোর বা খুকি ও কাঠবেরালি— এসব কবিতা আমরা কে না পড়েছি? শুধু কি মাত্র এই ক’টি? না। তিনি বড়দের জন্য যেমন লিখেছেন চমত্কার-চমত্কার সব কবিতা, গান, গল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ তেমনি ছোটদের জন্য আরো অনেক অনেক বিষয়ে লিখেছেন তিনি। তাছাড়া, কবির লেখা ‘চল্ চল্ চল্/ ঊর্ধ্ব গগনে বাজে মাদল/ নিম্নে উতলা ধরণী-তল/ অরুণ প্রাতের তরুণ দল/ চল্ রে চল্ রে চল্’; অথবা ‘কারার ঐ লৌহ-কপাট/ ভেঙে ফেল কর রে লোপাট’, ‘দুর্গম গিরি কান্তার মরু/ দুস্তর পারাবার/ লঙ্ঘিতে হবে রাত্রি নিশিথে যাত্রীরা হুঁশিয়ার’, ‘ও ভাই খাঁটি সোনার চেয়ে খাঁটি আমার দেশের মাটি’, ‘একি অপরূপ রূপে মা তোমায় হেরিনু পল্লী-জননী’ ইত্যাদি গান; এবং বিখ্যাত কবিতা ‘বিদ্রোহী’, ‘ধূমকেতু’, ‘খেয়াপারের তরণী’, ‘মোহররম’, ‘কামাল পাশা’ ‘সাম্যবাদী’, ‘মানুষ’, ‘নারী’ ইত্যাদি আজও মানুষের মুখে মুখে ফেরে। মানুষকে সাহস আর দেশপ্রেমে উজ্জীবিত করে। সমস্ত অনাচার আর বিভেদ-বৈষম্যের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে তাদেরকে সাহস জোগায়। তত্কালীন ভারতবর্ষের পরাধীনতা এবং সমস্ত অন্যায়-অত্যাচার, শোষণ, গোঁড়ামি আর ভণ্ডামির বিরুদ্ধে তিনি সাহসের সাথে কলম ধরেছেন। উদার অসাম্প্রদায়িকতা ও মানবতার পক্ষে সোচ্চার থেকেছেন। এ কারণে তিনি ‘বিদ্রোহী কবি’ নামেও পরিচিত।
কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্ম ১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দের ২৪ মে, বাংলা ১৩০৬ সালের ১১ জ্যৈষ্ঠ পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত কাজী বংশে। তাঁর ডাকনাম ছিলো দুখু মিঞা। নজরুলের বাল্য ও কৈশোরকাল অত্যন্ত বৈচিত্র্যময় ও ঘাত-প্রতিঘাতপূর্ণ। ছোটবেলায় তিনি স্থানীয় মসজিদ ও মাজার কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত মক্তব ও মাদ্রাসা থেকে ধর্মীয় শিক্ষালাভ করেন। এখানেই তিনি পবিত্র কোরআন ও অন্যান্য ধর্মীয়গ্রন্থাদি পাঠ করেন। এদিকে ১৯০৮ খ্রিস্টাব্দে মাত্র নয় বছর বয়সে তিনি তাঁর বাবা মসজিদের ইমাম ও দরগার খাদেম (তত্ত্বাবধায়ক) কাজী ফকির আহমদকে হারান। বাবার মৃত্যুতে এই দরিদ্র পরিবারটি যেন অকূল-পাথারে পড়ে। ঐ অতটুকু বয়সেই তাই তিনি সংসারের সাহায্যে এগিয়ে আসেন। মাজার ও মসজিদের খাদেম হিসেবে তিনি বাবার কাজে যোগ দেন; সেইসাথে স্কুলে ছাত্রদেরকে পড়ানোর কাজেও শিক্ষকদের সহযোগিতা করতে থাকেন। পরবর্তীতে তিনি মসজিদের মুয়াজ্জিন হন এবং দিনে পাঁচবার মসজিদে আজান দেয়ার দায়িত্ব পালন করেন।
নজরুল তাঁর চাচা কাজী ফজলে করিমের উত্সাহে অবশেষে সেই কিশোর বয়সেই ভ্রাম্যমাণ যাত্রাগানের দল লেটোর দলে যোগদান করেন। যাত্রাদলের সাথে ঘুরে ঘুরে যাত্রাপালার প্রয়োজনেই তিনি অভিনয় করাসহ, গান-কবিতা লেখা শুরু করেন। এখানে থাকতেই তিনি বাংলা ও সংস্কৃত সাহিত্য, সেইসাথে বিভিন্ন হিন্দু ধর্মগ্রন্থ, পুরান প্রভৃতি পাঠ করেন এবং এসব বিষয় সম্পর্কে জ্ঞানলাভ করতে থাকেন। কিশোর-কবি লেটোর দলের জন্য এসময় বেশকিছু যাত্রাপালা রচনা করেন; যেমন: চাষার সঙ, শকুনিবধ, রাজা যুধিষ্ঠিরের সঙ, দাতা কর্ণ, আকবর বাদশা, কবি কালিদাস, বিদ্বান হুতুম ও রাজপুত্রের সঙ। মাত্র ১০/১১ বছরের একজন কিশোরের এমন প্রতিভা অবাক করার মতো নয় কি? কিন্তু সেখানেও তিনি স্থায়ী হলেন না। কিছুদিন পরে কবি লেটোর দল ছেড়ে রানীগঞ্জের সিয়ারসোল রাজ হাইস্কুলে ভর্তি হন। তারপর সেখান থেকে যান মাথরুন উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয়ে। এই স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন প্রখ্যাত কবি কুমুদরঞ্জন মল্লিক। নজরুল তাঁর গভীর স্নেহসান্নিধ্য পান। কিন্তু লেখাপড়ার খরচ যোগাতে না পেরে তাঁর স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়ে যায় এবং এক কবিগানের দলে কবিয়াল হিসেবে যোগ দেন তিনি। কিছুদিন পর তাও ছাড়লেন। এর পর আসানসোলের এক নামকরা রুটি-বিস্কুট তৈরির কারখানা ‘ওয়াহিদ’স-এ কাজ নেন। এসময় তিনি ভাগ্যক্রমে পুলিশের সাব-ইন্সপেক্টর ময়মনসিংহের কাজী রফিজউল্লাহ্র নজরে পড়েন এবং তিনি নজরুলকে ময়মনসিংহের ত্রিশাল থানার দরিরামপুর হাইস্কুলে ভর্তি করে দেন। উল্লেখ্য, এখানেই বর্তমানে ‘জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়’ অবস্থিত। দরিরামপুর স্কুলে তিনি দশম শ্রেণি পর্যন্ত পড়শোনা করেন। পাঠ্যসূচির বাইরেও এ সময় তিনি বাংলা, সংস্কৃত ও ফার্সি সাহিত্য পাঠ করেন এবং এক শিক্ষকের কাছে তিনি ভারতীয় ক্ল্যাসিকাল সংগীত শেখেন। অসামান্য প্রতিভার কারণে নজরুল এসব বিষয়ে অল্পদিনে গভীর জ্ঞান অর্জন করেন।
নজরুল দশম শ্রেণিতে পড়াকালেই শুরু হয়ে যায় প্রথম বিশ্বযুদ্ধ (১৯১৪—১৯১৮ খ্রি.)। ম্যাট্রিক (এখনকার এসএসসি) পরীক্ষার প্রিটেস্টে অংশগ্রহণ না করেই তিনি যুদ্ধে যাওয়ার জন্য কলকাতায় গিয়ে ভারতীয় বাহিনীর ৪৯ নম্বর বাঙ্গালী পল্টনে নাম লেখান এবং যুদ্ধে যান। তাঁকে করাচি ক্যান্টনমেন্টে পোস্টিং দেয়া হয়। কিছুদিনের মধ্যে প্রমোশন পেয়ে তিনি হাবিলদার পদে উন্নীত হন। এ সময় তিনি বিভিন্ন বিষয়ে গভীর পড়াশোনায় মনোনিবেশ করেন। রবীন্দ্রনাথ ও শরত্চন্দ্রের সাহিত্য তাঁকে বিপুলভাবে প্রভাবিত করে। ক্যান্টনমেন্টের এক পাঞ্জাবি মৌলভীর কাছে তিনি ফার্সি সাহিত্য পড়েন। শিখেছিলেন হিন্দি এবং উর্দুও। এছাড়া সংগীতচর্চাও করতে থাকেন; সাথে সাথে চালিয়ে যান সাহিত্যচর্চা। কলকাতার বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় তিনি লেখা পাঠাতে থাকেন ‘হাবিলদার কাজী নজরুল ইসলাম’ নামে। তাঁর প্রথম প্রকাশিত লেখা একটি গদ্য— ‘বাউন্ডুলের আত্মকাহিনী’; কলকাতার মাসিক ‘সওগাত’ পত্রিকার ১৩২৬ বঙ্গাব্দের জ্যৈষ্ঠ সংখ্যায় (মে, ১৯১৯ খ্রি.) প্রকাশিত হয়। একই বছরে প্রথম কবিতা ‘মুক্তি’ প্রকাশিত হয়। এরপর নজরুলকে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। যুদ্ধশেষে ১৯২০ সালে কলকাতায় ফিরে এসে তিনি একের পর এক লিখতে থাকেন কবিতা, গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, গান, নাটক ইত্যাদি নানা স্বাদের লেখা। তাঁর উপন্যাস ‘বাঁধনহারা’ ১৩২৭ সালের (১৯২০ খ্রি.) বৈশাখ প্রথম বর্ষের প্রথম সংখ্যা থেকে ‘মোসলেম ভারত’ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয় । কিন্তু গ্রন্থাকারে প্রকাশিত তাঁর প্রথম বই হলো ‘অগ্নি-বীণা’ কাব্যটি, প্রকাশিত হয় ১৩২৯ (১৯২২ খ্রি.) সালে। তিনি তত্কালীন ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে অগ্নিঝরা কবিতা-গান লিখে কারাবরণ করেন। কোনো অন্যায়-অবিচার আর জুলুমের সামনে তিনি মাথা নত করেন নি। মানুষের মধ্যকার গোঁড়ামি-কুসংস্কার, ভণ্ডামি আর সাম্প্রদায়িক ভেদ-বিভেদকে তিনি মনেপ্রাণে ঘৃণা করতেন।
১৯৪২ সালে গুরুতর অসুস্থ হয়ে বাকশক্তিহীন ও স্মৃতিভ্রষ্ট হওয়ার আগ পর্যন্ত মাত্র ২২/২৩ বছরের সাহিত্য-জীবনে নজরুল ইসলাম অনেক বই রচনা করেন। তারমধ্যে রয়েছে কবিতা ও গানের বই: অগ্নিবীণা, দোলন-চাঁপা, বিষের বাঁশী, ভাঙার গান, প্রলয়-শিখা, ছায়ানট, চন্দ্রন্দুি, সুর-সাকী, জুলফিকার, বনগীতি, গুল-বাগিচা, কাব্যে আমপারা, মরু-ভাস্কর, পূবের হাওয়া, সাম্যবাদী, সর্বহারা, ফণিমনসা, সিন্ধু-হিন্দোল, বুলবুল, জিঞ্জীর, চক্রবাক সন্ধ্যা, চোখের চাতক, নতুন চাঁদ, ঝিঙে ফুল, রূবাইয়াত্-ই-ওমর খৈয়াম, রূবাইয়াত্-ই-হাফিজ, মহুয়ার গান, গানের মালা, গীতি-শতদল, শেষ সওগাত, ঝড় ইত্যাদি; গল্প-উপন্যাস: বাঁধনহারা, ব্যথার দান, রিক্তের বেদন, মৃত্যুক্ষুধা, কুহেলিকা, শিউলিমালা; নাটক: ঝিলিমিলি, আলেয়া, পুতুলের বিয়ে; প্রবন্ধ-অভিভাষণ: যুগবাণী, রাজবন্দীর জবানবন্দী, দুর্দিনের যাত্রী, রুদ্র-মঙ্গল।
বাংলা গানের ক্ষেত্রে নজরুলের অবদান অসামান্য। তিনি প্রায় চার হাজার গান রচনা করেন। আর শুধু রচনা নয়, তাঁর লেখা অধিকাংশ গানের সুরও করেছেন তিনি নিজেই। তিনি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন, গান লিখেছেন, সংগীত পরিচালনাও করেছেন। তিনি শিশু-কিশোরদের জন্য চমত্কার সব কবিতা, গান, গল্প আর নাটিকা লিখেছেন— যা আজও জনপ্রিয়। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় নজরুলের গান-কবিতা মুক্তিযোদ্ধাদের বিপুলভাবে অনুপ্রাণিত করে।
কাজী নজরুল ইসলাম ১৯৪২ খ্রিস্টাব্দে মাত্র ৪৩ বছর বয়সে ‘মরবুস পিক’ নামক এক দূরারোগ্য স্নায়ুবিক ব্যধিতে আক্রান্ত হয়ে বাকশক্তিহীন হয়ে পড়েন ও তাঁর স্মৃতিশক্তি নষ্ট হয়ে যায়। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর সরকার কবিকে সপরিবারে কলকাতা থেকে বাংলাদেশে নিয়ে আসে এবং সরকারিভাবে এখানে স্থায়ীভাবে বসবাস ও ভরণপোষণের ব্যবস্থা করে। ১৯৭৫ সালে কবিকে একুশে পদকে ভূষিত করা হয়। পরে তাঁকে বাংলাদেশের নাগরিকত্বও দেয়া হয়। ১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট কবি ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদের পাশে তাঁকে দাফন করা হয়।
২৪ মে প্রিয় কবির জন্মদিনে তাঁর প্রতি আমাদের অশেষ শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।