দোষ অন্যের ঘাড়ে চাপানো যায় বলে অপহরণ করি

দেশে অপহরণের ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় এ সুযোগটা কাজে লাগাচ্ছে অনেক পেশাদার অপরাধী। কারণ অপহরণ করে অন্যের ঘাড়ে দোষ চাপানোটাও এখন সহজ হচ্ছে। আর এই মোক্ষম সময়টাকে কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে বেশ কয়েকজন ব্যবসায়ী ও পয়সাওয়ালা ব্যক্তিকে অপহরণ করে মোটা অংকের টাকা আদায় করেছি। তবে কোন অপহরণ ঘটনায় পড়তে হয়নি কোন রকম ঝামেলায়। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) জিজ্ঞাসাবাদে এ তথ্য জানিয়েছে অপহরণকারী মোঃ রেজাউল (৩৫)। রাজধানীর তুরাগ এলাকা থেকে জসিম নামে এক হোটেল ব্যবসায়ীকে অপহরণ করে ১২ লাখ টাকা মুক্তিপণ আদায়ের অভিযোগে ডিবির ‘অ্যান্টি কিডন্যাপিং স্কোয়াড’ রেজাউলসহ ৫ জনকে গত ১৮ মে সিরাজগঞ্জ থেকে গ্রেফতার করে। ডিবি পুলিশ তাদের তিন দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে। গতকাল মঙ্গলবার ছিল রিমান্ডের প্রথম দিন। গ্রেফতারকৃত অপর চারজন হচ্ছে রেজাউলের দ্বিতীয় স্ত্রী শিউলি আক্তার ওরফে শিল্পী, শ্বশুর আব্দুল সামাদ (শিল্পীর বাবা), আনোয়ার হোসেন ও মরতুজা। ডিবির ‘অ্যান্টি কিডন্যাপিং স্কোয়াড’-এর প্রধান এডিসি ছানোয়ার হোসেন বলেন, গত ৩০ এপ্রিল রাজধানীর উত্তরা এলাকা থেকে অপহূত হন হোটেল ব্যবসায়ী মোহাম্মদ জসিম। এ ঘটনায় তুরাগ থানায় মামলা দায়ের করা হয়। কিন্তু অপহরণকারীরা জসিমকে হত্যা করতে পারে এ কারণে ঐ সময় তাকে উদ্ধার অভিযান শুরু করতে কিছুটা কৌশলের আশ্রয় নিতে হয়। পরবর্তীতে ঘটনার ৮ দিন পর গত ৭ মে জসিমের স্বজনরা ১২ লাখ টাকা মুক্তিপণ দিয়ে তাকে ছাড়িয়ে আনে। আর মুক্তি পাওয়ার পরপরই অপহরণকারীদের গ্রেফতারে অভিযান শুরু হয়। তারই ধারাবাহিকতায় অপহরণকারী দলের মূল হোতা রেজাউলসহ ৫ জনকে গ্রেফতার করা হয়। অভিযান পরিচালনাকারী ডিবির সহকারী কমিশনার এসএম নাজমুল হক বলেন, গ্রেফতারকৃত রেজাউল পাবনা জেলার তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী। জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছে ইতিপূর্বে তারা বিভিন্ন পেশার লোকজনকে অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায় করেছে। আর অপহরণের কৌশল সম্পর্কে জানিয়েছে, তাদের একটি গ্রুপ ঢাকায় অবস্থান করে বিভিন্ন ব্যবসায়ী ও পয়সাওয়ালা ব্যক্তিদের (যাদের বয়স ২৫ থেকে ৩৫ এর মধ্যে) মোবাইল ফোন নম্বর সংগ্রহ করে। এরপর তাদের দলের মহিলা সদস্য দিয়ে ফোনে যোগাযোগ করে প্রেমের সর্ম্পক গড়ে তোলে। আর মোবাইল ফোনে পরিচয় হবার পর কয়েকদিনের মধ্যে রাজধানীর আশপাশ এলাকায় কোন স্থানে দেখা করার প্রস্তাব দেয়। আর টার্গেট ব্যক্তি তাদের ঐ নির্ধারিত স্থানে পৌঁছা মাত্রই অস্ত্রেরমুখে তাকে অপহরণ করে সরাসরি সিরাজগঞ্জ শহরে তাদের আস্তানায় (ভাড়া বাসায়) নিয়ে যায়। কখনো চরেও নিয়ে রাখা হয়। সেখানে নেয়ার পর প্রথম ধাপে চলে ব্যাপক নির্যাতন। আর নির্যাতনের সময় কান্নাকাটি মোবাইল ফোনে শোনানো হয় স্বজনদের। স্বজনরা কাঙ্ক্ষিত টাকা দিতে রাজী হলে বন্ধ করা হয় নির্যাতন। এরপর টাকা কীভাবে প্রদান করা হবে তা নিয়ে চলে দেন-দরবার। বলা হয় চরের কোন স্থানে রেখে দিতে হবে অথবা ট্রেন থেকে নির্ধারিত স্থানে ছুঁড়ে দিতে হবে। টাকা পাওয়ার পর অপহূতকে চোখ বেঁধে কোন নির্জন স্থানে ছেড়ে দেয়া হয়। ডিবির এসি আরো জানান, রেজাউল এক সময় চরমপন্থী দলের সঙ্গে যুক্ত ছিল। তার বিরুদ্ধে সিরাজগঞ্জের বিভিন্ন থানায় হত্যা, অপহরণ, ডাকাতিসহ বেশ কয়েকটি মামলা রয়েছে। তার গ্রামের বাড়ি সিরাগঞ্জ জেলার উল্লাপাড়া উপজেলার রহিমপুরে। পিতা আব্দুর সাত্তার। এডিসি ছানোয়ার হোসেন বলেন, গ্রেফতারকৃত শিউলি আক্তার ওরফে শিল্পী রেজাউলের দ্বিতীয় স্ত্রী। শিউলির মাধ্যমেই ব্যবসায়ী জসিমকে অপহরণ করা হয়। অপরহরণের জন্য রেজাউল সিরাজগঞ্জ শহরে ৫ রুমের একটি টিনশেড বাসা ভাড়া নিয়েছে বেশ কয়েক মাস আগে। এখান থেকেই রেজাউলের ‘অপহরণ অপারেশন’ চলে। এডিসি আরো বলেন, রেজাউল স্বীকার করেছে, তার মত আরো বেশ কয়েকটি গ্রুপ রয়েছে; যারা প্রেমের অভিনয় করে অপহরণ করে থাকে। যারা এক সময় সিরাজগঞ্জ এলাকায় বিভিন্ন চরমপন্থী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিল। এরাই এখন অপহরণকে তাদের প্রধান আয়ের উত্স হিসেবে ব্যবহার করছে। তিনি আরো বলেন, গ্রেফতারকৃতদের কাছ থেকে অপহরণে আরো কয়েকটি গ্রুপের তথ্য পাওয়া গেছে। তাদের গ্রেফতারে অভিযান চলছে।