হামলা ভাংচুরে স্বাস্থ্যসেবা ঝুঁকিতে, দুর্ভোগ রোগীদের
প্রকাশ : ২০ মে ২০১৪, ২৩:২১
নানা অভিযোগ তুলে ঢাকাসহ সারাদেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভাংচুর ও ডাক্তারদের ওপর হামলার ঘটনা দেশের স্বাস্থ্যসেবাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে। কর্তৃপক্ষ নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হওয়ায় চিকিত্সা দেয়ার সময় ডাক্তারদের মধ্যে এক ধরনের ভীতি ও আতংক কাজ করছে। আবার এসব ঘটনার প্রতিবাদস্বরূপ ডাক্তার, নার্সরা ধর্মঘট ও কর্মবিরতি পালন করলে পরিণামে ভোগান্তি-দুর্ভোগ পোহান রোগীরাই। বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ) দাবি করেছে, ১ জানুয়ারি থেকে গতকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত অর্ধশতাধিক হামলা ও ভাংচুরের ঘটনা ঘটেছে। এ সব ঘটনায় হাসপাতালের যন্ত্রপাতি, আসবাবপত্রসহ কোটি কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
সর্বশেষ গতকাল ভোরে সাভার পৌর এলাকার তল্লাবাগ মহল্লার একটি বেসরকারি হাসপাতালে রোগীর মৃত্যুকে কেন্দ করে স্বজনরা ডাক্তারদের মারধর এবং হাসপাতাল ভাংচুর করে। পরিস্থিতি ক্রমেই খারাপ হওয়ায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদফতর এবং শীর্ষ প্রশাসন এসব ঘটনার কারণ অনুসন্ধান ও করণীয় খোঁজার ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব দিচ্ছে বলে জানা গেছে।
এ প্রসঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. দীন মো. নূরুল হক বলেন, রোগী মারার জন্য কোন ডাক্তার চিকিত্সা সেবা দেন না। বিদেশেও রোগী মারা যায়। কিন্তু সেখানে হামলা-ভাংচুরের নজির নেই। কিন্তু আমাদের এখানে পরিস্থিতি ভিন্ন। কিছু থেকে কিছু হলেই হামলা-ভাংচুর হয়। চিকিত্সা সেবায় কোন ধরনের অবহেলা কিংবা ডাক্তারদের ভুল হলে তদন্ত করে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার বিধান বাংলাদেশেও রয়েছে। হামলা-ভাংচুর ও মারধরের ঘটনা পরিহার করার আহবান জানিয়ে তিনি আরো বলেন, এতে সংশ্লিষ্ট হাসপাতালের শত শত রোগীকেই শেষে দুর্ভোগ পোহাতে হয়। ক্ষতি হয় রোগীদেরই। রোগী ও ডাক্তারদের সুরক্ষা আইন চূড়ান্ত পর্যায়ে। এই আইন দ্রুত বাস্তবায়ন করা হবে বলে তিনি জানান।
ইদানিং শিক্ষানবিস ও অনারারি চিকিত্সকদের সঙ্গে রোগীদের স্বজনদের বেশি বেশি ভুল বোঝাবুঝির ঘটনা ঘটছে। সাংবাদিকদের সঙ্গেও প্রায় বিবাদ লাগছে বিভিন্ন হাসপাতালে।
মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলেছেন, সরকারি হাসপাতালে যতটুকু সেবা রোগীরা পাচ্ছেন তার বেশিরভাগই পাচ্ছেন শিক্ষানবিস ও অনারারি ডাক্তারদের কাছ থেকে। এক শ্রেণির অধ্যাপক, সহযোগী এবং সহকারী অধ্যাপক কখন হাসপাতালে আসে যান তা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানেন না। তারা সভা, সেমিনারসহ নানা অনুষ্ঠানের কথা বলে বাইরে বাইরে সময় কাটান। নির্ধারিত সময় হাসপাতালে আসেন না। সকাল ৮টা থেকে দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত বিশেষজ্ঞ ডাক্তারদের হাসপাতালে থাকার কথা থাকলেও তারা থাকে না। অথচ পুরো সময়ই জুনিয়র ডাক্তাররা রোগীদের সেবা দিয়ে যায়। এ অবস্থায় দায়িত্ব পালনের সময় কোন রোগীর মৃত্যু হলে দায় পড়ে ইন্টার্ন ডাক্তারদের উপর। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানান, অথচ এসব শিক্ষানবিস ও অনারারি চিকিত্সকরা যতটুকু জানেন, তা দিয়েই চেষ্টা করেন রোগীদের সুস্থ করতে। অনাকাঙ্খিত ঘটনা এড়াতে রাতে বিশেষজ্ঞ ডাক্তারদের হাসপাতালে ডিউটি করার ব্যবস্থা চালুর ওপর গুরুত্বারোপ করেন মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, মিটফোর্ড, সোহরাওয়ার্দী, জাতীয় হূদরোগ ইনস্টিটিউট, পঙ্গু হাসপাতাল, ঢাকা শিশু ও বক্ষব্যাধি হাসপাতাল জরুরি বিভাগে গিয়ে কর্তব্যরত চিকিত্সকদের সঙ্গে আলাপকালে তারা জানান, কোন রোগী মারা গেলে তাদের স্বজনরা ডাক্তারদের উপর হামলা ও হাসপাতাল ভাংচুর শুরু করে দেয়। এ ভয়ে এখন সংকটাপন্ন রোগীকে চিকিত্সা দিতে ভয় লাগে।
শংকটাপন্ন রোগী আসলে ঝুঁকি এড়াতে অনেক ক্ষেত্রে সেই রোগীকে অন্য হাসপাতালে কিংবা বেসরকারি হাসপাতালে পাঠানো হচ্ছে বলে একটি সূত্র জানিয়েছে। এসব রোগীদের কেউ কেউ রাস্তায়ই মারা যান। ঐ সব রোগীকে সঙ্গে সঙ্গে অক্সিজেনসহ আইসিইউ কিংবা গভীর পর্যবেক্ষণে রেখে চিকিত্সা দিলে অনেকে বেঁচে যেত।
জরুরি বিভাগের ডাক্তররা জানান, হাসপাতালে চিকিত্সাসেবা দেয়ার সময় রোগীদের কেউ কেউ সুস্থ হতে পারে। কেউ কেউ মারাও যেতে পারে। এটা সবাইকে মেনে নিতে হবে। হামলা ও ভাংচুর বন্ধ না হলে সংকটাপন্ন রোগী চিকিত্সা ঝুঁকিতে থাকবে বলে জরুরি বিভাগের চিকিত্সকরা জানান।
বিএমএ সূত্রে জানা যায়, জেলা ও উপজেলায় চিকিত্সকরা হামলা ও ভাংচুরে আতংকে কর্মস্থলে থাকতে চাচ্ছেন না। সরকারি হাসপাতালগুলোর চিকিত্সার এ স্থবিরতা চিকিত্সার জন্য বড় ঝুঁকি। এতে দরিদ্র রোগীরাই বেশি দুর্ভোগের শিকার হচ্ছে।
ডাক্তার নেতারা বলেছেন, চিকিত্সা সেবা ব্যবস্থাপনায় অস্থিরতা সৃষ্টি করে একটি মহল ফায়দা লুটতে চাচ্ছে। চিকিত্সকদের সংগঠনগুলো এর জন্য পরস্পর বিরোধী বক্তব্য দিয়েছেন। একপক্ষ অন্যপক্ষকে দুষছে।
বিএমএর সভাপতি ডা. মাহমুদ হাসান ও মহাসচিব ডা. ইকবাল আর্সলান বলেন, কথায় কথায় চিকিত্সকদের উপর হামলা ও ভাংচুর চিকিত্সাসেবায় বড় ধরনের হুমকি। এজন্য বুদ্ধিজীবী, সুশীল সমাজ, সাংবাদিক ও রাজনৈতিক নেতাসহ সকলকে রোগীদের চিকিত্সার বৃহত্তর স্বার্থে এগিয়ে আসতে হবে। বিদেশে চিকিত্সকের কোন অবহেলা হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হয়। সেখানে কোন ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনা। এদেশে চিকিত্সা ক্ষেত্রে এ পরিবেশ সৃষ্টি করার জন্য সকলের সহযোগিতা চেয়েছেন দুই নেতা।
বেসরকারি নামিদামি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলেন, রোগী মারা গেলে হামলা, ভাংচুর ও চিকিত্সকদের মারধর ঘটনার পর এ সব মুমূর্ষু রোগীদের ভর্তি করাতে চান না। জরুরি বিভাগে আসলে দ্রুত সরকারি হাসপাতালে পাঠিয়ে দেয়া হয়। মারধর ও ভাংচুর করে কোটি কোটি টাকার যন্ত্রপাতি নষ্ট করেই ক্ষান্ত হয়নি। হামলাকারীরা মোটা অংকের টাকা আদায় করে নেয়। এ কারণে এখন সংকটাপন্ন রোগীদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি নিতে চায় না। প্রায় সকল বেসরকারি হাসপাতালে একই অবস্থা।
প্রাইভেট মেডিক্যাল কলেজ হসপিটাল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি অধ্যাপক ডা. মনিরুজ্জামান বলেন, একের পর এক ডাক্তারদের উপর হামলা ও হাসপাতাল ভাংচুরে রোগীরা ক্ষতিগ্রস্ত। হামলাকারীদের এ বিষয়টি বুঝা উচিত। চিকিত্সকরা আতংকে ভুগছেন। তারা জীবন রক্ষার্থে ঝুঁকি নিতে চান না। চিকিত্সাসেবার বৃহত্তর স্বার্থে হামলা ও ভাংচুর বন্ধে সকলকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।
বাংলাদেশের বিকাশমান চিকিত্সাখাতকে ধ্বংসের পাঁয়তারা করা হচ্ছে কিনা এ বিষয়টি খতিয়ে দেখছে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো।