মেরাজ আল্লাহর সান্নিধ্যে একান্ত আলাপ

মেরাজ বিশ্বনবী হযরত রসূল (স.)-এর জীবনে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও তাত্পর্যবহ ঘটনা। এর মাধ্যমে মহান আল্লাহ্ তায়ালা তাঁর প্রিয় হাবীবকে নিজের একান্ত সান্নিধ্যে তুলে নিয়ে সৃষ্টিজগতের আদি-অন্ত, ভেতর-বাহির সবকিছু বাস্তবে প্রত্যক্ষ করিয়ে গৌরবান্বিত করেছেন। যাঁকে সৃষ্টির মাধ্যমে সমগ্র বিশ্বজাহানের সৃষ্টির লীলা শুরু হয়েছিল, তাঁকে মে’রাজের মাধ্যমে সমস্ত সৃষ্টির ভেদ ও রহস্য অবগত করে স্রষ্টা নিজেও পরিতৃপ্ত হলেন। মহান আল্লাহ্ তায়ালার প্রতি হযরত রসূল (স.)-এর প্রেমের চূড়ান্ত অবস্থার ফলশ্রুতিতেই সংঘটিত হয়েছিল মেরাজ। নবুয়তের দশম বর্ষের ২৭শে রজব তারিখে মেরাজ সংঘটিত হওয়ার সময় হযরত রসূল (স.) কত গভীর প্রেমে আল্লাহ্ তায়ালার প্রতি আত্মসমর্পিত অবস্থায় ছিলেন ইতিহাসের বর্ণনা থেকে তা অনুমান করা যায়। মক্কার কাফের কোরায়েশদের সামাজিক বয়কটের কারণে হযরত রসূল (স.) পরিবার পরিজন ও সবংশীয় লোকদের নিয়ে তিন বছর ‘শুয়াবে আবুতালিব’ নামক গিরিপ্রান্তরে অবস্থান করেন। তিনি সেখান থেকে ফিরে আসার পর তাঁর পিতৃব্য ও সবচেয়ে শক্তিশালী আশ্রয়দাতা কোরায়েশ সর্দার আবু তালিবকে হারিয়ে জাহেরীভাবে অভিভাবকহীন হয়ে পড়েন। এর কিছুদিন পর তাঁর সহধর্মিণী ও শেষ নিরাপদ আশ্রয়দাত্রী হযরত খাদিজাতুল কোবরা (রাঃ)ও ওফাত্ লাভ করেন। ফলে কাফেরদের চরম প্রতিরোধের মুখে তাঁকে জাগতিকভাবে আশ্রয় দেয়ার আর কেউ রইলো না। একদিকে কাফেরদের অত্যাচার ও অন্যদিকে স্বজন হারানোর ব্যথায় তিনি তখন মুহ্যমান। চরম দুঃখ ও বেদনায় ভারাক্রান্ত হয়ে হযরত রসূল (স.) হূদয়ে একমাত্র আল্লাহ্র অবারিত প্রেম ধারণ করে তাওহীদের বাণী প্রচারের জন্য তায়েফে গমন করেন। কিন্তু আল্লাহ্র কি অভিপ্রায় তায়েফে কাফেরদের নির্মম অত্যাচার ও নির্যাতনের শিকার হয়ে তাঁকে ব্যর্থ মনোরথ হয়ে মক্কায় ফিরে আসতে হলো। তখন তিনি জগতে আর কোন আশার আলো দেখতে পাচ্ছিলেন না। শোক, দুঃখ ও হতাশায় বিভোর হয়ে হযরত রসূল (স.) নিজেকে পরিপূর্ণভাবে পরম স্রষ্টা ও প্রতিপালক আল্লাহ্ তায়ালার কাছে সপে দিলেন। সেই কঠিন সময়ে মহান আল্লাহ্ তায়ালা তাঁর প্রিয় হাবীবকে মেরাজের মাধ্যমে নিজের একান্ত সান্নিধ্যে তুলে নিয়ে তাঁকে পরিপূর্ণতার অতুলনীয় গৌরব ও মর্যাদা দান করেন। ‘মেরাজ’-এর বর্ণনা দিতে গিয়ে পবিত্র কুরআনে এরশাদ হয়েছে, “পবিত্র ও মহিমাময় তিনি, যিনি তাঁর বান্দাকে রজনীযোগে ভ্রমণ করিয়ে ছিলেন আল-মসজিদুল হারাম হতে আল-মসজিদুল আকসা পর্যন্ত; যার পরিবেশ আমি করেছিলাম বরকতময়, তাকে আমার নিদর্শন দেখানোর জন্য; তিনিই সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা” (সূরা-বনী ইসরাঈল, আয়াত-১)। আরো এরশাদ হয়েছে, “তখন তিনি [(হযরত রসূল (স.)] ঊর্ধ্বদিগন্তে, অতঃপর তিনি তাঁর নিকটবর্তী হলেন; অতি নিকটবর্তী, ফলে তাঁদের মধ্যে দুই ধনুকের অথবা এরও কম ব্যবধান রইলো। তখন আল্লাহ্ তাঁর বান্দার প্রতি যা ওহী করার তা ওহী করলেন। যা তিনি দেখেছেন, তার অন্তঃকরণ তা অস্বীকার করেনি। তিনি যা দেখেছেন, তোমরা কি সে বিষয়ে তার সাথে বিতর্ক করবে? নিশ্চয়ই তিনি তাঁকে আরেকবার দেখেছিলেন প্রতিবর্তী কুল বৃক্ষের নিকট, যার নিকট অবস্থিত বাসোদ্যান। যখন বৃক্ষটি, যদ্বারা আচ্ছাদিত হওয়ার তদ্বারা ছিল আচ্ছাদিত; তার দৃষ্টি বিভ্রম হয়নি, দৃষ্টি লক্ষ্যচ্যুতও হয়নি। তিনি তো তাঁর প্রতিপালকের মহান নিদর্শনাবলী দেখেছিলেন” (সূরা-নাজম, আয়াত-৭-১৮)। পবিত্র কুরআনের পাশাপাশি হাদীস শরীফেও মেরাজের বিবরণ রয়েছে। মেশকাত শরীফের হাদীসে বর্ণিত হয়েছে— “রজনী দ্বি-প্রহর। ঘন অন্ধকারে সমস্ত আকাশ আচ্ছন্ন। নিঃস্তব্ধ নির্জন চারিধার। সেদিন পাখী ডাকে নাই, একটা অস্বাভাবিক গাম্ভীর্যে প্রকৃতি স্তব্ধ হয়ে আছে। হযরত উম্মে হানির ঘরে ঘুমিয়ে আছেন। এমন সময় তিনি শুনতে পেলেন— কে যেন তাঁকে ডাকছেঃ “মুহাম্মদ...”। হযরতের ঘুম ভেঙ্গে গেল, জেগে দেখেন, ফেরেশতা জিব্রাইল (আ.) শিয়রে দণ্ডায়মান। অদূরে ‘বোরাক’ নামক একটি অদ্ভূত জ্যোতির্ময় বাহন অপেক্ষা করছে। ডানাবিশিষ্ট অশ্বের মত তার রূপ, ক্ষিপ্র তার গতিবেগ। জিব্রাঈল (আ.) প্রথমেই হযরত মুহাম্মদ (স.)-এর হূদয় পরীক্ষা করলেন। পূর্বের ন্যায় এবারেও তিনি তাঁর হূদয়কে শক্তিশালী করে দিলেন। তারপর হযরতকে সেই বোরাকে আরোহনের জন্য ইঙ্গিত করলেন। হযরত বোরাকে আরোহন করলেন। মুহূর্তের মধ্যে বোরাক হযরতকে নিয়ে জেরুজালেমের শীর্ষদেশে এসে উপনীত হলো। জিব্রাইলের ইঙ্গিতে হযরত রসূল (স.) সেখানে অবতরণ করলেন। বোরাককে বাহিরে রেখে তিনি জেরুজালেমের মসজিদে প্রবেশ করলেন এবং পরম ভক্তিভরে দুই রাকাত নামায পড়লেন। হযরত সুলায়মান (আ.)-এর প্রতিষ্ঠিত এই পবিত্র জেরুজালেম মসজিদ হযরত মুসা (আ.) ও হযরত ঈসা (আ.)-এর স্মৃতি তার সহিত চির বিজড়িত। তাকে কেবলা করে হযরত মুহাম্মদ (স.) এতদিন নামাজ পড়তেন। আজ সেই পবিত্র স্থান স্বচক্ষে দর্শন করে তিনি নিজেকে ধন্য মনে করলেন। এখান হতে জিব্রাইল ফেরেশতা হযরত মুহাম্মদ (স.)-কে সঙ্গে নিয়ে ঊর্ধ্বাকাশপানে চললেন। (চলবে) লেখক :ইসলামী চিন্তাবিদ ও তাসাউফ গবেষক