আগামী ২৬ মে শব-ই-মেরাজ
হযরত মুহাম্মদ (স.)-এর
মেরাজের বিস্ময়কর ঘটনা
প্রকাশ : ২২ মে ২০১৪, ২০:৪৮
(পূর্ব প্রকাশের পর) অতঃপর আমি মসজিদটির কিবলার দিকে এলাম। তারপর তিনি ওখানে বুরাকটি বাঁধলেন। তারপর আমি বাইতুল মুকাদ্দাসের মুসজিদে-আকসায় ঢুকলাম। অতঃপর আমার সামনে নবীদের জমায়েত করা হল। তারপর জিবরীল আমাকে এগিয়ে দিলেন। পরিশেষে আমি তাঁদের ইমামতি করলাম (তফসীর ইবনে কাসীর, ৩য় খণ্ড, ৭ম পৃষ্ঠা)। বাইহাকির দালায়িলুন নবুওঅতে ও ইবনে আসা-কিরে আবূসায়ীদ খুদ্রীর বর্ণনায় রাসূলুল্লাহ (স.) বলেন, আমি যখন বুরাকে চড়ে বাইতুল মুকাদ্দাসের দিকে যাচ্ছিলাম তখন একজন আহ্বানকারী ডান দিক থেকে ডাক দেয়, হে মুহাম্মদ, আমাকে দেখুন। আমি আপনাকে কিছু জিজ্ঞেস করবো। কিন্তু আমি জওয়াব দেয়নি। তারপর একজন আহ্বানকারী বাম দিক থেকে আমাকে ডাক দেয়, হে মুহাম্মদ! আমাকে দেখুন। আমি আপনাকে কিছু জিজ্ঞেস করবো, কিন্তু আমি জওয়াব দেয়নি। তারপর আমরা চলতেই থাকি। ইত্যবসরে একটি নারী তার বাহু দুটি উলঙ্গ করে এবং সবরকম সৌন্দর্য যা আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন তার মধ্যে তা রয়েছে। অতঃপর সে বলে, হে মুহাম্মদ! আমাকে দেখুন, আমি আপনাকে কিছু জিজ্ঞেস করবো। আমি তার দিকে তাকালাম না। পরিশেষে আমরা বাইতুল মুকাদ্দাসে এসে গেলাম। অতঃপর আমি আমার জন্তুটাকে সেই চক্রে বাঁধলাম, যাতে নবীগণ (তাঁদের জন্তুগুলো) বাঁধতেন। তারপর আমি পথে আমাকে আহ্বানকারীদের সম্পর্কে জিবরীলকে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বলেন, ডাকদিকের আহবানকারীটি ইহুদী। আপনি যদি ওর ডাকে সাড়া দিতেন তাহলে আপনার উম্মত ইহুদী হয়ে যেত। বামদিকের আহ্বানকারীটি খৃষ্টান। আপনি যদি ওর ডাকে সাড়া দিতেন তাহলে আপনার উম্মত খৃষ্টান হয়ে যেতো। আর উলঙ্গ বাহু রংঢং করা নারীটি এই পৃথিবী। আপনি যদি ওর ডাকে সাড়া দিতেন তাহলে আপনার উম্মত পরকালের উপর এই দুনিয়াকে প্রাধান্য দিত। তারপর আমি এবং জিবরীল বাইতুল মুকাদ্দাসে প্রবেশ করলাম। অতঃপর আমাদের প্রত্যেকেই দু-রাকাআত নামায পড়লাম। আবু সায়ীদ খুদরীর (রা.) বর্ণনায় আছে, নবী (স.) বলেন, আমি যখন বাইতুল মুকাদ্দাসের কর্মসূচি থেকে অবসর পেলাম তখন একটি সিঁড়ি আমার কাছে আনা হল। এর চেয়ে সুন্দর জিনিস আমি দেখিনি। এটাই সিঁড়ি যার দিকে মরণাপন্ন ব্যক্তি চেয়ে থাকে যখন তার কাছে মরণ হাজির হয়। অতঃপর জিবরীল আমাকে তাতে চড়িয়ে দিলেন। পরিশেষে আমি আকাশের দরজাগুলোর মধ্যে একটি দরজার কাছে পৌঁছলাম। যার নাম বা-বুল হাফাযাহ্ তথা সংরক্ষিতকারীদের দরজা। তাতে একজন ফেরেশতা আছে। যার নাম ইসমায়ীল। তার অধীনে বার হাজার ফেরেশতা আছে। ওদের মধ্যকার ফেরেশতার অধীনে বার হাজার করে ফেরেশতা আছে তাফসীরে ত্ববারী, ১৫ খণ্ড, ১১ পৃষ্ঠা)। বাইহাকীর বর্ণনায় আছে, পৃথিবীর অতি নিকটবর্তী ফেরেশতার নাম ইসমায়ীল। তার সামনে আছে সত্তর হাজার ফেরেশতা। তার প্রত্যেক ফেরেশতার সাথে একলাখ ফেরেশতার বাহিনী আছে। তিনি বলেন, অতঃপর জিবরীল আকাশটির দরজা খোলার প্রার্থনা করলেন। বলা হল, কে? তিনি বললেন, জিবরীল। আবার বলা হল, আপনার সাথে কে? তিনি বললেন, মুহাম্মদ। বলা হয়, তার কাছে লোক পাঠানো হয়েছে কি? তিনি বললেন, হ্যাঁ। অতঃপর আদম (আ.) কে সেই আকৃতিতে দেখা গেল যে-আকৃতিতে আল্লাহ তাকে প্রথম দিনে সৃষ্টি করেছিলেন (তাফসীর ইবনে কাসীর ৩য় খন্ড, ১৩ পৃষ্ঠা)। তারপর আমাদের ২য় আসমানে চড়ানো হল। অতঃপর জিবরীল দরজা খোলার প্রার্থনা করলেন। তখন বলা হল, আপনি কে? তিনি বললেন জিবরীল। বলা হল, আপনার সাথে কে? তিনি বললেন, মুহাম্মদ। বলা হল, তার কাছে (দূত) পাঠানো হয়েছে কি? তিনি বললেন, পাঠানো হয়েছে। অতঃপর আমাদের জন্য দরজা খোলা হল। হঠাত্ আমি দুই খালাতো ভাইকে পেলাম। তারা হলেন, ঈসা ইবনে মারয়্যাম এবং ইয়াহ্ইয়া ইবনে যাকারিয়্যা। তারা দু’জন আমাকে স্বাগতম জানালেন এবং আমার ভালোর জন্য দুআ দিলেন (মুসলিম, ১ম খন্ড, ৯১ পৃষ্ঠা)। তারপর আমাকে নিয়ে জিবরীল ৩য় আসমানে চড়লেন। অতঃপর দরজা খোলার আবেদন করলেন। বলা হল কে? তিনি বললেন, মুহাম্মদ। বলা হল, তার কাছে দূত পাঠানো হয়েছে কি? তিনি বললেন হ্যাঁ। এবার বলা হল তাঁকে স্বাগতম। অত:পর কি সুন্দর আগমন এটা। তারপর দরজা খোলা হল। অত:পর যখন আমি (৩য় আকাশে) পৌঁছলাম তখন ইউসুফকে পেলাম। জিবরীল বললেন, ইনি ইউসুফ। তাকে সালাম করুন। তাই আমি তাঁকে সালাম করলাম। তিনি সালামের জওয়াব দিলেন, তারপর বললেন, সত্ ভাই ও সত্ নবীকে স্বাগতম! (বুখারী, মুসলিম, মিশকাত ৫২৭ পৃষ্ঠা)। অন্য বর্ণানায় আছে, ইউসুফকে দুনিয়ার অর্ধেক সৌন্দর্য দান করা হয়েছে। (মুসলিম ১ম খণ্ড, ৯১ পৃষ্ঠা)। আর এক বর্ণনায় আছে, তিনি পূর্ণিমার চাঁদের মত (তাহযীবু সীরাতে ইবনে হিশাম, ১ম খণ্ড ৯৩ পৃষ্ঠা)।তারপর একে একে চতুর্থ আকাশে হযরত ইদ্রিস (আ.), পঞ্চম আকাশে হযরত হারুন (আ.), ষষ্ঠ আকাশে হযরত মুসা (আ.)-এর সাথে সাক্ষাত্ করলেন।তারপর সপ্তম আসমানে হযরত ইব্রাহিম (আ.)-এর সাথে সাক্ষাত্ হলে—জিবরীল (আ.) বললেন, ইনি আপনার বংশ পিতা, তাঁকে সালাম করুন। তাই আমি তাকে সালাম দিলাম। তিনিও সালামের জবাব দিলেন এবং বললেন সত্ পুত্র ও সত্ নবীকে স্বাগতম।তারপর আমাকে সিদ্রাতুল মুন্তাহা পর্যন্ত তোলা হল। অত:পর হঠাত্ দেখলাম, ওর ফলগুলো বড় বড় কলসির মত এবং ওর পাতাগুলো হাতীর কানের মত। তিনি বললেন, এটা সিদ্রাতুল মুন্তাহা। ওখানে ৪টি নদী আছে। দুটি নদী ভেতরমুখী এবং দুটি নদী বাহিরমুখী। আমি বললাম, এ দুটি কি? হে জিবরায়ীল! তিনি বললেন, ভেতরমুখী দুটো জান্নাতের মধ্যকার নদী। আর বাহিরমুখী দু’টি (মিসরের) নীল এবং (ইরাকের) ফোরাত নদী। তারপর আমার জন্য বাইতুল মা’মূরকে তোলা হল। তারপর আমার কাছে কতিপয় পাত্র আনা হল- মদের পাত্র ও দুধের পাত্র এবং মধুর পাত্র। আমি দুধটাকে গ্রহণ করলাম। জিবরীল বললেন, এটাই তো প্রকৃত স্বভাব যার উপরে আপনি আছেন এবং আপনার উম্মতও আছেন (বুখারী ও মুসলিম, মিশকাত, ৫২৭ পৃষ্ঠা)। অন্য বর্ণনায় আছে, আমি আসমানে বাইতুল মামুরে পিট ঠেকিয়ে সুন্দরতম পুরুষের বেশে আমাদের বংশ পিতা হযরত ইবরাহীমকে দেখলাম। তার সঙ্গে কিছু লোকও ছিল। আত:পর আমি তাঁকে সালাম দিলাম। তিনিও আমাকে সালাম দিলেন। অতঃপর আমি আমার উম্মতকে দু’টি দলে দেখলাম। একটি ভাগ এমন যাদের দেহে সাদা কাপড় রয়েছে। তারা যেন কাগজের মত। আর একটি ভাগ এমন যাদের দেহে ছাইরং কাপড় রয়েছে। অত:পর আমি বাইতুল মামূরে প্রবেশ করলাম। এমতাবস্থায় আমার সাথে তারাও ঢুকলো যারা সাদা কাপড় পরিহিত ছিল। তারা একপাশে থাকলো। তবে তারা ভার অবস্থায় ছিল। আমি এবং সঙ্গীরা বাইতুল মামূরে নামাজ পড়লাম। তারপর আমি এবং সঙ্গীরা বেরিয়ে এলাম। তিনি (জিবরীল) বলেন, বাইতুল মামূর এমন ঘর যাতে প্রত্যেক দিন সত্তর হাজার ফেরেশ্তা নামাজ পড়েন তারপর কেয়ামত পর্যন্ত তারা ফিরে আসার সুযোগ আর পায় না (বাইহাকীর দালা-য়িলুন নুবুওঅহ্, ২য় খন্ড ১৩৯ পৃষ্ঠা)। (সংক্ষেপিত)
লেখক : সাংবাদিক, ই-মেইল :mzhazadi@yahoo.com