মার্চেই ট্যানারি স্থানান্তর

আগামী বছরের মার্চ মাসের মধ্যে রাজধানীর হাজারীবাগ থেকে সাভারের চামড়া শিল্পনগরীতে ট্যানারি স্থানান্তর শেষ করতে মালিকরা সম্মত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু। তিনি বলেন, এপ্রিল মাস থেকে চামড়া শিল্পনগরীতে পরিবেশবান্ধব চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য উত্পাদন শুরু হবে। সাভারে বাস্তবায়নাধীন চামড়া শিল্পনগরীর অগ্রগতি পর্যালোচনা ও ট্যানারি স্থানান্তর কার্যক্রম পরিদর্শন উপলক্ষে আয়োজিত বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে শিল্পমন্ত্রী এসব কথা বলেন। গতকাল বৃহস্পতিবার সাভারে চামড়া শিল্পনগরী কার্যালয়ে এই ব্রিফিংয়ের আয়োজন করা হয়। এর আগে সেখানে শিল্প মালিকদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত পর্যালোচনা বৈঠকে পরিবেশ ও বন মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বলেন, বর্তমান শিল্পমন্ত্রী দায়িত্ব নেবার পর চামড়া শিল্পনগরীর কাজে গতি এসেছে। তবে উদ্যোক্তাদের মনে রাখা উচিত একটি শিল্প থেকে সবসময় মুনাফা করা যায় না। এজন্য তাদেরকে ব্যবসা ডাইভারসিফাই (বহুমুখীকরণ) করতে হবে। তিনি বলেন, শিল্প কারখানা চালাতে গেলে গ্যাস, বিদ্যুত্সহ নানা সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। কিন্তু একজন উদ্যোক্তা এসব সমস্যা সাহসিকতার সাথে মোকাবেলা করবে। বাংলাদেশ হলো অবারিত সুযোগের জায়গা। উদ্যোক্তাদের এ সুযোগকে কাজে লাগাতে হবে। শিল্পমন্ত্রী বলেন, ২০১৫ সালের মার্চ মাসের মধ্যেই নির্মাণাধীন সিইটিপি (বর্জ্য শোধনাগার) চালু হবে। এ লক্ষ্যে নির্মাণ কাজ দ্রুত এগিয়ে চলেছে। তিনি সিইটিপি’র নির্মাণ কাজে সন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, সিইটিপি চালু হলে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে উন্নতমানের চামড়াজাত পণ্য উত্পাদন সম্ভব হবে। চামড়া শিল্পখাতে মূল্য সংযোজনের সুযোগ বেশি থাকায় ভবিষ্যতে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের ক্ষেত্রে এ শিল্পখাত তৈরি পোশাক শিল্পের বিকল্প হতে পারে বলে তিনি মন্তব্য করেন। আমির হোসেন আমু বলেন, ট্যানারি স্থানান্তরের ক্ষেত্রে মালিকদের যে কোনো বাস্তবসম্মত সমস্যা সরকার সহানুভূতির সাথে বিবেচনা করবে। এর জন্য উদ্যোক্তাদেরকে কোনো ধরনের কালক্ষেপণ না করে স্থানান্তর প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে। নির্ধারিত সময়ে ট্যানারি স্থানান্তর না হলে এ শিল্পের সাথে জড়িত উদ্যোক্তাদের পাশাপাশি দেশও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তিনি বিসিক অনুমোদিত লে-আউট অনুযায়ী বরাদ্দকৃত প্লটে নির্মাণ কাজ শুরু করার তাগিদ দেন। পরিবেশ ও বন মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বলেন, দেশের বিদ্যমান পরিস্থিতি মাথায় রেখে উদ্যোক্তারা বিনিয়োগ করেন। এখানে পর্যাপ্ত বিদ্যুত্ নেই, গ্যাস নেই। বিদ্যুতের ভোল্টেজ উঠানামার কারণে কারখানার মেশিনপত্র নষ্ট হয়। ঠিকমতো বিদ্যুত্ না থাকায় তিন শিফট-এর উত্পাদন এক শিফটে নেমে আসে। কিন্তু ব্যাংক সুদের চাকা ঠিকই ঘুরে। এসব বাস্তবতা নিয়েই শিল্প কারখানা চলছে। ট্যানারি শিল্পের পুনর্বাসন সম্পর্কে তিনি বলেন, এটি করতে হলে সরকারের যে বিনিয়োগ লাগবে তা হিসাব করা হবে। এরপর যদি দেখা যায় এতে সরকারের পোষাবে তাহলে তাতে সরকার বিনিয়োগ করবে। সরকারের কাছে অর্থ চাইলেই দিতে হবে এমনটা ঠিক নয়। তিনি বলেন, বাংলাদেশে অনেকে তিন প্রজন্ম ধরে ট্যানারি শিল্প চালাচ্ছেন। কিন্তু শিল্পোন্নত দেশে তিন প্রজন্ম ধরে কেউ এক ব্যবসায় থাকে না। বাংলাদেশের অর্থনীতির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, উঠতি উন্নতি দিয়ে আমরা এগিয়ে যাবার চেষ্টা করছি। আমাদের রিজার্ভ ২০ বিলিয়ন ডলারের ওপরে। অবশ্য আমদানি এবং বিনিয়োগ কাঙ্ক্ষিত না হওয়ায় রিজার্ভ বাড়ছে। চামড়া শিল্প স্থানান্তর নিয়ে তিনি বলেন, হাজারীবাগের ট্যানারি শিল্প পরিবেশ দূষণ করছে। পরিবেশ রক্ষা করতে হলে এ শিল্পগুলো সরিয়ে নেয়ার বিকল্প নেই। এ অনুষ্ঠানে খাদ্যমন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম বলেন, পরিবেশ দূষণ কমাতে হলে হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি সরিয়ে নিতে হবে-এটা বাস্তবতা। তিনি এ কাজে সর্বাত্মক সহযোগিতা করার আশ্বাস দেন। সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপস বলেন, নানা গাফিলতির কারণে চামড়া শিল্পনগরীর প্রকল্প ব্যয় শতগুণ বেড়েছে। সরকার এবং উদ্যোক্তারা যদি নিবিষ্ট মনে কাজ না করেন তাহলে ২০১৬ সালের মধ্যেও চামড়া শিল্পনগরীর সিইটিপি নির্মাণের কাজ শেষ হবে না। এক্ষেত্রে তিনি পারস্পরিক দোষারোপের খেলা থেকে বের হয়ে আসার পরামর্শ দেন। অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে সংসদ সদস্য ডা. মো. এনামুর রহমান, বিসিক চেয়ারম্যান শ্যাম সুন্দর সিকদার, পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক রইসুল আলম মণ্ডল, শিল্প মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব সুষেন চন্দ্র দাসসহ চামড়া শিল্প সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর প্রতিনিধিরা বক্তব্য রাখেন। উল্লেখ্য, সাভার চামড়া শিল্পনগরীতে বরাদ্দপ্রাপ্ত ১৫৫টি শিল্প ইউনিটের বিপরীতে ইতোমধ্যে ১৪৮টি প্লটের লে-আউট প্লান জমা পড়েছে। এর মধ্যে বিসিক ১১২টি লে-আউট প্লান অনুমোদন করেছে। বাকি লে-আউট প্লান আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে অনুমোদন পাবে। ইতোমধ্যে ১৫টি শিল্প ইউনিট নির্মাণের জন্য সংশ্লিষ্ট মালিকরা প্রকল্প এলাকায় কার্যক্রম শুরু করেছেন। পরে অতিথিরা সিইটিপি নির্মাণ কাজ সরেজমিনে পরিদর্শন করেন। তিনি এ সময় গুণগতমান বজায় রেখে দ্রুত নির্মাণ কাজ সমাপ্ত করতে চীনা নির্মাতা প্রতিষ্ঠানকে নির্দেশনা দেন।