রয়্যালটি দ্বন্দ্বে থমকে আছে অডিও শিল্প

গত ৬ বছর ধরে জ্যেষ্ঠ শিল্পীদের অ্যালবাম প্রকাশ হচ্ছে না। জ্যেষ্ঠ শিল্পীদের নতুন গানের রেকর্ড রিলিজের কোন আগ্রহ নেই অডিও প্রকাশকদের। শিল্পীদের মেধাস্বত্ব নিয়ে গড়ে ওঠা নতুন বিতর্কের ভয়ে এরা জ্যেষ্ঠ শিল্পীদের অ্যালবাম প্রকাশ করতে চাইছে না। কারণ সাবিনা ইয়াসমিন, রুনা লায়লা বা আইয়ুব বাচ্চু, জেমসসহ দেশসেরা শিল্পীদের যখন অডিও ক্যাসেট বা সিডি প্রকাশ হয়েছিল, তখন রিং টোন, ওয়েলকাম টিউন বা সেলফোনে গান বিক্রির প্রযুক্তি ছিল না। এখন এই নতুন প্রযুক্তি অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় শিল্পীদের পুরনো জনপ্রিয় গানের সেলফোন রয়্যালটি কে নেবে? কে তার স্বত্বাধিকারী হবে? শিল্পী না প্রকাশক-সেই দ্বন্দ্বেই যেন থমকে আছে অডিও শিল্প। এ প্রসঙ্গে দেশের গুণী কণ্ঠশিল্পী সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, ‘আমার অগণিত গান বিভিন্ন সেলফোন কোম্পানির রিং টোন, রিং ব্যাক টোনে পাওয়া যায়। অথচ এসব বিষয়ে আমি জানিও না বা তারা জানানোরও প্রয়োজন মনে করেনি। আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে এসবের মালিকানা কে দাবি করে? একজন শিল্পীই যদি গানের প্রাপ্য সম্মানী না পায় তখন সেই শিল্প মুখ থুবড়ে পড়ে যেতে বাধ্য।’ এদিকে শিল্পীদের স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য এলসিএস (আধুনিক গানের শিল্পীদের সংগঠন) এবং বামবা (ব্যান্ড তারকাদের সংগঠন) এমআইবি (অডিও প্রকাশকদের সংগঠন) গড়ে উঠলেও গত অর্ধযুগ ধরে ঐ সমস্যার কোন সমাধান মিলছে না। দেশের গুণী শিল্পী সুবীর নন্দীর দুটি একক অ্যালবাম তৈরি হয়ে স্টুডিওতে পড়ে আছে। কিন্তু তিনি বাজারে রিলিজ দেবার কোন সুযোগ পাচ্ছেন না। সুবীর নন্দী বলেন, ‘শিল্পীকে যদি তার গান বাজারজাতকরণের জন্যও ভাবতে হয়, তাহলে ঐরকম গানবাজনা না করাই ভাল। শুধু সুবীর নন্দীই নন ব্যান্ড তারকা নগর বাউল জেমস-এর একটি একক অ্যালবাম তৈরি হয়ে আছে দীর্ঘদিন, কিন্তু রিলিজের কোন খবর নেই। এ কারণে অনেকেই আবার বায়বীয় পদ্ধতিতে মোবাইল ফোনে অ্যালবাম রিলিজের পরিকল্পনা করছেন। জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী ডলি সায়ন্তনী, শাকিলা জাফরের নতুন গান রিলিজ হয়নি গত প্রায় কয়েক বছর। অথচ তারা নিয়মিত স্টেজ ও প্লে-ব্যাকে গাইছেন। এদিকে সিডি চয়েজ, লেজার ভিশন, জি সিরিজ, ফাহিম মিউজিকসহ বিভিন্ন অডিও প্রতিষ্ঠান নতুন শিল্পীদের নিয়েই অডিও প্রকাশ করছেন। কারণ তারা নিজ খরচায় অ্যালবাম করেন, তাতে প্রকাশকদের কোন লগ্নির প্রয়োজন হয় না। তাই একরকম অভিমান করেই নতুন গান রিলিজ থেকে দূরে সরে যাচ্ছেন অধিকাংশ প্রতিষ্ঠিত শিল্পী। শুধু অডিওর ক্ষেত্রেই নয়, ফিল্মের প্লে-ব্যাকেও এখন শিল্পীরা অডিও কপিরাইট দিতে চান না। কারণ সেখান থেকেও প্রাপ্য অর্থ বণ্টন নিয়ে একধরনের অবিশ্বাস তৈরি হয়েছে শিল্পী-প্রকাশকদের মধ্যে। এর আগে ঠকানোর ব্যাপারে বেশ ক’জন শিল্পী মামলাও করেছেন। জেমস সাউন্ডটেকের বিরুদ্ধে, আর্টসেল জি সিরিজের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। তবুও কোন সমাধান হচ্ছে না। এ প্রসঙ্গে জেমস বলেন, ‘আমরা তো নিয়মিত গান করছি। কনসার্ট মাঠে লাখো দর্শককে মাতাচ্ছি। রেকর্ডও করছি। কোম্পানিকেই ভাবতে হবে তারা কিভাবে আমাদের গান বাজারে ছাড়বে।’ এদিকে অডিও বাজারের রয়্যালটির এই ধোঁয়াশার ভেতরেই পুরনো জনপ্রিয় গানগুলোর রিং টোন ও অন্যান্য উপায়ে আয়ের জন্য কিছু প্রায় মৃত প্রতিষ্ঠান নতুনভাবে যাত্রা শুরু করেছে। তাই একাধিক সংগঠন থাকা সত্ত্বেও শিল্পীদের প্রাপ্য সম্মানী ঠকানোর অভিযোগ দিন দিন কমার বদলে যেন বেড়েই চলেছে। এ প্রসঙ্গে বামবার সভাপতি হামিন আহমেদ বলেন, ‘শিল্পীদেরকে অনেকভাবে গত কয়েক বছর ধরে তারা ঠকিয়েছে। অগণিত গান আমাদের না জানিয়ে বিভিন্ন মোবাইল ফোনে বিক্রি করে তৃতীয় পক্ষ কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। এ অবস্থায় আমাদের পুরনো গানের রয়্যালটি নিয়েই আমরা সোচ্চার হবো। তারা আমাদের পুরনো গানের হিসাব দেবার ভয়েই নতুন গান নিয়ে কথা বলতে চান না। এ অবস্থার পরিবর্তন হওয়া উচিত।’