ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পে স্বাবলম্বী যশোরের অনেক নারী
প্রকাশ : ২৩ মে ২০১৪, ১৯:৪৮
ক্ষুদ্র ঋণ নিয়ে যশোরের অনেক নারী হস্ত ও কুটির শিল্পকে বাণিজ্যিক রুপ দিয়েছেন। অনেক উদ্যোক্তা তাদের ক্ষুদ্র প্রয়াসকে বড় পরিসরে নিয়ে গেছেন। এসব ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পগুলোতে কর্মসংস্থান হয়েছে অনেক নারী ও পুরুষের। সারা দেশেই সরবরাহ করা হচ্ছে তাদের তৈরি পণ্যগুলো। দেশের চাহিদা মিটিয়ে এসব পণ্য বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে।
ক্ষুদ্র এসব কারুশিল্প ঘিরে যশোরে সৃষ্টি হয়েছে শতাধিক নারী উদ্যোক্তা। উদ্যোক্তাদের মধ্যে রয়েছেন দরিদ্র, মধ্যবিত্ত এবং শিক্ষিত নারীরাও। এসব উদ্যোক্তাদের মাধ্যমে ঘরে বসে টাকা উপার্জনের সুযোগ পেয়েছেন শত শত নারী ও পুরুষ। তাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, ঘরের কাজের পাশাপাশি এসব কাজ করে নারীরা ক্ষেত্রভেদে ৬ থেকে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত উপার্জন করছেন। যা দিয়ে তাদের সংসার চলছে। ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পগুলোতে নকশীকাঁথা, চাদর, শাড়ি, কামিজ, সোফার কুশন, পা-পোশ, ওয়ালম্যাট, ফতুয়া, পাঞ্জাবি, মহিলাদের হ্যান্ডব্যাগসহ নানা পোশাক উত্পাদন করা হচ্ছে। বিদেশেও রফতানি করা হচ্ছে। সম্প্রতি ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পে ক্ষুদ্র ঋণের প্রভাব দেখতে যশোরে গিয়ে এসব তথ্য জানা গেছে।
ক্ষুদ্র ঋণ বিতরণ প্রসঙ্গে ট্রাস্ট ব্যাংক যশোর ক্যান্টনমেন্ট শাখার ম্যানেজার মো. জাকির হোসাইন জানান, যশোর এলাকার কারুশিল্পের উন্নয়নে ২০১৩ সালের এপ্রিলে এসএমই ফাউন্ডেশন ৪ শতাংশ সুদে দুই কোটি টাকার তহবিল দেয়। ব্যাংক উদ্যোক্তাদেরকে যে ঋণ দিয়েছে তার সুদের হার সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ। তিন বছরের জন্য ১ লাখ টাকা থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ দেয়া হয়েছে। ৫ লাখের উপরে ঋণের ক্ষেত্রে জামানত রাখা হয়েছে। আর ৫ লাখ টাকার কম ঋণে কোনো জামানত রাখা হয়নি। তিনি আরও বলেন, এ পর্যন্ত ১৫৪ জন উদ্যোক্তাকে মোট ১ কোটি ৯৪ লাখ টাকা ঋণ দেয়া হয়েছে। ১৫/২০ জন ছাড়া সব উদ্যোক্তাই ঠিকভাবে ঋণের অর্থ পরিশোধ করছেন। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে সমস্যা হওয়ায় তারা ঠিকভাবে পরিশোধ করতে পারেননি। এখন তারাও টাকা জমা দিচ্ছেন।
যশোরের হস্তশিল্প উদ্যোক্তা বিনু আরা বেগম আলাপকালে জানান, ১৯৯৯ সালে এক হাজার টাকারও কম অর্থ দিয়ে সেলাইয়ের কাজ শুরু করেন তিনি। এখন তার পুঁজি ৩০ লাখ টাকা। প্রায় দুই হাজার মাঠকর্মী রয়েছেন। আর চুক্তিভিত্তিক শ্রমিক রয়েছেন ১৮ জন। বর্তমানে তিনি প্রতি মাসে চার থেকে পাঁচ লাখ টাকার হ্যান্ডব্যাগ বিক্রি করেন। ক্ষেত্রভেদে ১৫ থেকে ২০ ভাগ মুনাফা হয়। গত বছর ট্রাস্ট ব্যাংকের কাছ থেকে নেয়া ঋণের পর ব্যবসার পরিধি আরও বেড়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। বিনু আরা বলেন, ঋণ নিয়ে কারখানার পরিধি বড় করা হয়েছে। ফলে এখন বিক্রি বেশি হচ্ছে। আগে উত্পাদন ছিল অনেক কম।
কথা হয় আরেক যশোরের আরেক উদ্যোক্তা শাহানা সুলতানার সঙ্গে। ছোট বেলা থেকে কারুকাজের প্রতি তার আগ্রহ। ১৯৯৭ সালের শখের বসে নকশী কাঁথা সেলানো শুরু করেন তিনি। এরপর ধীরে ধীরে শখের কাজকে পরিণত করেন পেশায়। ২০০২ সালে বাণিজ্যিকভাবে নকশী কাঁথা সেলাই করে বাজারে বিক্রি করতে শুরু করেন। ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে ব্যবসার পরিধি। তবে টাকার অভাবে সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও ব্যবসার পরিধি এক সময় আর বাড়ানো সম্ভব হচ্ছিল না। অবশেষে ২০১৩ সালে ক্ষুদ্র ঋণের মাধ্যমে ট্রাস্ট ব্যাংক থেকে তিনি তিন লাখ টাকা ঋণ নেন। সেই টাকা দিয়ে ব্যবসার পরিধি বাড়ান তিনি। বর্তমানে শাহানার কারখানায় ২২ জন শ্রমিক কাজ করছেন। প্রতি মাসে ৫০টি নকশী কাঁথা এবং ৪০০টি বিছানার চাদর তৈরি হচ্ছে। প্রতিটি নকশী কাঁথা সাড়ে তিন হাজার থেকে আট হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি করেন। আর নকশী করা বিছানার চাদর আড়াই হাজার টাকা থেকে পাঁচ হাজার টাকায় বিক্রি করেন। প্রতি মাসে প্রায় চার লাখ টাকার পণ্য বিক্রি করেন তিনি। ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত লাভ হয় প্রতি মাসে। তার উত্পাদিত পণ্য ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট এমনকি দেশের বাইরে মালয়েশিয়া ও সৌদি আরবেও বিক্রি হচ্ছে বলে তিনি জানান।