শরীরচর্চা করুন, সুস্থ থাকুন
প্রকাশ : ২৩ মে ২০১৪, ২০:৪৩
আজকাল পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই ক্রনিক রোগের প্রকোপ বাড়ছে। কোলেস্টেরলের হূদক্ষতিকর মান, উচ্চ রক্তচাপ এবং কোমরে মেদের বাহুল্য-ভবিষ্যতে হূদরোগের সম্ভাবনা যে অনেক বাড়িয়ে দেবে, এ বিষয়টি নি:সন্দেহ। তবে উত্সাহব্যঞ্জক একটি সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা যায় ব্যায়াম করলে সেই ঝুঁকি অনেকটা কমে যায়, অন্যান্য ঝুঁকি উচুতে থাকলেও তা হয়। কয়েক যুগ আগে থেকেই বিজ্ঞানীরা প্রথম কিছু স্বাস্থ্য সমস্যাকে হূদরোগের সঙ্গে সম্পর্কিত দেখে আসছেন। জগত্ বিখ্যাত ফ্রামিংহাম হার্ট স্ট্যাডিতে যেমন গবেষকরা ম্যাসাচুসেটস্ ফ্রামিংহামে বসবাসরত ৫২০০ জন-এর অধিক পূর্ণবয়স্ক লোকদের স্বাস্থ্য ও জীবন-যাপন মনিটর করে দেখেছেন। ১৯৪৮ সালে শুরু হওয়া এই গবেষণার ফলাফল বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা নির্বাচন করেন যে, উচ্চ রক্তচাপ, কোলেস্টেরল মান, স্থূলতা, বয়স, জেন্ডার, ধূমপান প্রতিটিরই কোন ব্যক্তির ভবিষ্যতে হূদরোগের সম্ভাবনা কতটুকু আছে এর উপর পরিমাপযোগ্য প্রভাব রয়েছে। তাদের প্রাপ্ত ফলাফল থেকে গবেষকরা উদ্ভাবন করেন ফ্রামিংহাম রিস্ক স্কোর যা থেকে কোনও ব্যক্তির স্বাস্থ্য সংখ্যা বিশেষ করে রক্তচাপ ও কোলেস্টেরল মানের উপর ভিত্তি করে আগামী দশ বছরে হার্ট এ্যাটাকের সম্ভাবনা গণনা করার কৌশল। ফ্রামিংহাম রিস্ক স্কোর ক্যালকুলেটর শরীর চর্চাকে তেমন আমল দেয়নি।
রিস্ক এসেসমেন্ট টুল ফর এস্টিমেটিং ইউর টেন ইয়ার রিস্ক অফ হেভিং এ হার্ট এ্যাটাক-
বয়স- বছর, জেন্ডার-স্ত্রী-পুরুষ, মোট কোলেস্টেরল-মিলিগ্রাম/ডেসিলিটার, এইচডিএল কোলেস্টেরল-মিলিগ্রাম/ ডেসিলিটার, ধূমপায়ী-হা/না, সিসেটালিক রক্তচাপ-মিলি মিটার পারদ, বর্তমানে কি উচ্চ রক্তচাপের জন্য কোনও ওষুধ নিচ্ছেন-না/হা। এভাবেই ১০ বছরের হূদরোগের সম্ভাবনার ঝুঁকিগুলো গণনা করুন।
মোট কোলেস্টেরল
রক্তের সব ধরণের কোলেস্টেরলের যোগফল হলো মোট কোলেস্টেরল। মোট কোলেস্টেরল মান যত উচুতে, হূদরোগের ঝুঁকি তত বেশি। ২০০ মিলিগ্রাম/ডিএল হলো বাঞ্ছিত মান। এর নিচে থাকলে হূদরোগের ঝুঁকি কম। এর বেশি থাকলে হূদরোগের উচুঝুঁকি। ২০০-২৩৯ মিলিগ্রাম/ ডিএল হলো সীমা ছুই ছুই মান। ২৪০ মিলিগ্রাম/ ডিএল বা এর বেশি। এদের হূদরোগের ঝুঁকি দ্বিগুণ বেশি।
এইচডিএল মান
এইচডিএল হলো ভালো কোলেস্টেরল। এইচডিএল শরীরের অন্যান্য অংশ থেকে কোলেস্টেরল এনে রক্তে বহন করে ফিরিয়ে নিয়ে যায় যকৃতে। এরপর তা নিষ্ক্রান্ত হয় শরীর থেকে। তাই এইচডিএল ধমনীগাত্রে কোলেস্টেরল জমাট বাধা রোধ করে। এইচডিএল ৪০ মিলিগ্রাম/ ডিএল এর কম হলে হূদরোগের ঝুঁকি ৪০-৫৯ মিলিগ্রাম/ডিএল মান হূদপিন্ডের জন্য ভালো। ৬০ মিলিগ্রাম বা এর বেশি হলো হূদসুরক্ষা মান।
ধূমপায়ী
গতমাসে কোনও ধূমপান করলে হ্যাঁ বলতে হবে।
সিসেটালিক রক্তচাপ
১২০/৮০ মানে ১২০ সিসেটালিক ভালো। তবে অনেগুলো গবেষণা এবং ফ্রামিংহাম স্ট্যাডির পরবর্তী অনুসরণী থেকে স্পষ্টত: প্রমাণিত হয় যারা ব্যায়াম করেন, যারা ব্যায়াম করেননা তাদের চেয়ে হূদরোগ হওয়ার বা এতে মৃত্যুর ঝুঁকি অনেক কম। কিছু গবেষণায় জীবন যাপনের কিছু ব্যাপারও স্বাস্থ্যের কিছু উপাদান থেকে ব্যায়ামকে আলাদা করে দেখেছেন। যারা শারীরিকভাবে সবল ও সমর্থ তাদের খাদ্য স্বাস্থ্যকর, এদের কোলেস্টেরল মানও থাকে স্বাস্থ্যকর, থাকে রক্তচাপ কম, ধূমপান করার প্রবণতা কম, কোমরও থাকে চিকন। এসব উপাদান হূদরোগ ঝুঁকি হ্রাসের দিকে ধাবিত করে। ব্যায়াম কম এমন ব্যাপার বড় ঝুঁকি তখন নাও হতে পারে। অন্য কথায় বেশিরভাগ অতীতের গবেষণায় সে ব্যক্তির উচ্চ রক্তচাপ বা অন্যান্য স্বাস্থ্য সমস্যা থাকলে ব্যায়াম করে হূদরোগ ঝুঁকি কমে কিনা তা তেমন দেখা হয়নি।
ডিসেম্বর ২০১৩ সালে প্রকাশিত এক নিবন্ধে অস্ট্রেলিয়ার পার্থে কার্টিন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা ৮৬৬২ জন অস্ট্রোলিয়ান স্ত্রী ও পুরুষের পূর্বে সংগৃহীত উপাত্ত আবার বিশ্লেষণ করেন। ১৫ বছর আগে এসব স্বেচ্ছাসেবী যাদের বয়স ছিলো ৩০-৫৫ বছর। এদের কোলেস্টেরল, রক্তচাপ মান, কোমরের পরিধি ও অন্যান্য হেলথ্ স্ক্রিনিং হয়েছিলো। গত ২ সপ্তাহ কতবার কত মিনিট করে ব্যায়াম করেছিলেন তাও নথিভূক্ত করা হয়েছিল। এসব সংখ্যা ও ফলাফল ব্যবহার করে, গবেষকরা মূল পরিমাপের সময় প্রতি অংশগ্রহণকারীর ফ্রামিংহাম রিস্ক স্কোর নির্ণয় করা হয়েছিল। ব্যায়ামের পৌন:পুনিকতা ও তীব্রতা ভেদে এদেরকে তিনটি ভাগে ভাগও করা হলো। সবচেয়ে নিচের তৃতীয়াংশে যারা ছিলেন তারা কখনও ব্যায়াম করেননি বা করলে করেছেন কদাচিত্, হয়ত কখনও মাঝে মাঝে হালকা পায়চারি করেছেন মাত্র, মধ্য তৃতীয়াংশের যারা কখনও দ্রুত হেটেছেন, কখনও কখনও কঠোর শরীরচর্চাও করেছেন, সর্বোচ্চ তৃতীয়াংশে যারা তারা ব্যায়াম করেছেন প্রতিদিন, কখনও কঠোর ব্যায়ামও করেছেন। এরপর গবেষকরা এসব স্বেচ্ছাসেবীদের নাম অস্টেলিয়ার ন্যাশনাল ডেথ্ রেজিস্ট্রি মিলালেন, এসব নথিতে কারো কারো মৃত্যুর কারণও পাওয়া গেলো। এসব স্ত্রী ও পুরুষের মধ্যে ২১১ জন পরবর্তী বছরগুলোতে মারা গিয়েছিলেন, বেশিরভাগেরই ফ্রামিংহাম স্কোর ছিলো উচুমাত্রা এবং কোমর ছিলো বিশাল। তবে ব্যায়ামের অভ্যাসটি বেঁচে থাকার সম্ভাবনা উজ্জ্বলতর করেছে। সার্বিকভাবে নিচের তৃতীয়াংশের লোকদের মধ্য তৃতীয়াংশের লোকদের চেয়ে হার্ট এ্যাটাকের দ্বিগুণ ঝুঁকিতে এবং সর্বোচ্চ তৃতীয়াংশ লোকদের চেয়ে ৬ গুণ বেশি ঝুঁকিতে ছিলো। প্রতি জনের ফ্রামিংহাম স্কোর এবং কোমরের বেড় তুচ্ছ করে দেখলেও ব্যায়াম করা গেলে হূদরোগের ঝুঁকি বেশ কমে। তবে একথা ঠিক নয় যে আমরা হূদরোগের অন্যান্য ঝুঁকি তুচ্ছ জ্ঞান করবো। তবে বিজ্ঞানীদের ভাষ্য শরীরচর্চা চিহ্নিত করা এবং একে বাড়ানো, রক্তের লিপিড মাপা ও উচ্চ রক্তচাপের মতই সমান গুরুত্বপূর্ণ। সক্রিয় জীবন যাপন না করলে,
ডাক্তারের পরামর্শ নেবেন, শরীর পরীক্ষা করে তবে ব্যায়াম শুরু করবেন। হাটবেন। এই পরীক্ষায় দেখা গেছে যারা হাটাচলা করেননি এদের তুলনায় যারা প্রায়ই জোরে হেঁটেছেন এদের আয়ুকাল বেড়েছে অন্তত: ১৫ বছর।
অধ্যাপক শুভাগত চৌধুরী
পরিচালক
ল্যাবরেটরী সার্ভিসেস
বারডেম, ঢাকা