বর্ষা এলেই তোড়জোড় অন্যসময় চুপ প্রশাসন
মুহাম্মদ নিজাম উদ্দিন, চট্টগ্রাম অফিস
প্রকাশ : ২৩ মে ২০১৪, ২৩:২৭
তত্ত্বাবধানকারী সরকারি সংস্থাগুলোর স্থায়ী ও সমন্বিত উদ্যোগ এবং পূর্বেকার কমিটিগুলোর সুপারিশ বাস্তবায়ন না হওয়ায় চট্টগ্রামে পাহাড়ে অবৈধ বসতি বেড়েই চলেছে। এ ব্যাপারে সারাবছরই প্রশাসন নীরব থাকে। তবে বর্ষা আসলেই পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ বসতি ও অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ নিয়ে তোড়জোর শুরু করে প্রশাসন। অথচ বছরজুড়েই কাঁচা বসতি ভেঙে কয়েকতলা পাকা ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। বিদ্যুত্, গ্যাস, পানির অবৈধ সংযোগ দেয়া হচ্ছে। দখল স্থায়ী করতে গরীব মানুষকে বলির পাঁঠা হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। কিন্তু পাহাড় দখলের হোতাদের বিরুদ্ধে প্রশাসন বরাবরই ব্যবস্থা গ্রহণ থেকে বিরত রয়েছে।
বন্দরনগরীর বেশির ভাগ পাহাড়ের মালিক হচ্ছে রেলওয়ে, জেলা প্রশাসন, গণপূর্ত বিভাগ, সিটি কর্পোরেশন, বন্দর কর্তৃপক্ষ ও ওয়াসা। তবে অবৈধ বসতি রয়েছে এমন সব পাহাড়ের ৮০ শতাংশের মালিকানা রেলওয়ে ও জেলা প্রশাসনের। দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় ছিন্নমূল ও ভূমিহীন সংগঠনের ব্যানারে ভূমিদস্যুরা এসব পাহাড় গ্রাস করে চলেছে। অনেকেই কয়েক যুগ ধরে বসতি স্থায়ী করেছে। কাঁচা ঘর ভেঙ্গে পাকা, আধাপাকা ও এমনকি ৪/৫ তলা বিশিষ্ট ভবন নির্মাণ করেছে। কিন্তু এসব পাহাড় তত্ত্বাবধানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো সরকারি সম্পদ রক্ষায় কোন উদ্যোগ নিচ্ছে না বরং তাদের সহায়তায় বসতি স্থায়ী করার অভিযোগ রয়েছে।
প্রতি বছর দেখা যায়, বর্ষা শুরুর আগে প্রশাসন ভূমি ধসে অপ্রীতিকর ঘটনার দায় এড়াতে লোক দেখানো কিছু তত্পরতা শুরু করে। মাইকিং, প্রচারপত্র বিলির মধ্যে প্রশাসনের দায়িত্ব সীমাবদ্ধ থাকে। বর্ষা মৌসুম শুরু হতে এক মাসেরও কম সময় থাকলেও মাত্র কয়েকদিন আগে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ তাদের মালিকানাধীন পাহাড় থেকে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় বসবাসকারীদের নিজ উদ্যোগে সরে যেতে বিভিন্ন পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে দায়িত্ব শেষ করেছে। অথচ রেলওয়ের পাহাড়গুলোতে প্রতিবছর পাহাড় ধসে অসংখ্য লোক মারা যাচ্ছে। এ ব্যাপারে রেলওয়ে ভূ-সম্পদ কর্মকর্তা জসিম উদ্দিন ইত্তেফাককে বলেন, ‘রেলওয়ে পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণ বসবাসকারীদের তালিকা তৈরির কার্যক্রম শুরু হয়েছে। তালিকা হলে উচ্ছেদ প্রক্রিয়ার উদ্যোগ নেয়া হবে।’
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনও প্রতিবছরের ন্যায় বর্ষা আসার আগ মুহূর্তে তাদের তত্পরতা শুরু করেছে। সমপ্রতি ১৫ সদস্য বিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। তারা পাহাড়গুলোতে বসবাসরত ঝুঁকিপূর্ণ বসতির তালিকা তৈরি করবে। সচেতন মহল মনে করেন প্রশাসনের এসব কার্যক্রম কয়েক মাস আগে হলে সুফল পাওয়া যেতো। কিন্তু দেখা যায় প্রতিবছর প্রশাসনের তালিকা তৈরির কাজও চলে এবং পাহাড় ধসে মানুষও হতাহত হয়। এইভাবে বর্ষাও চলে যায়।
জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে গঠিত কমিটির প্রধান হচ্ছে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) এসএম আবদুল কাদের। কমিটির কার্যক্রম প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘কমিটির কাজ হচ্ছে পাহাড়ের পাদদেশে ও উপরে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় বসবাসকারীদের তালিকা তৈরি ও বিপদকালীন সময়ে বসবাসকারীদের রাখার জন্য স্থান ঠিক করা। আগামী জুনের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে তালিকা তৈরি করতে সময় বেঁধে দেয়া হয়েছে।’
এদিকে সিটি কর্পোরেশন বাটালি হিল এলাকায় পাহাড়ে অবৈধ বসবাসকারীদের পুনর্বাসনের জন্য টাইগারপাস এলাকায় একটি বহুতল ভবন নির্মাণের কাজ শুরু করেছে। এই ভবনে প্রায় ১৬১টি পরিবারকে পুনর্বাসন করা সম্ভব হবে। ভবন নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৭ কোটি টাকা। কর্পোরেশনের নিজস্ব অর্থায়নে এটি নির্মাণ করা হচ্ছে। তবে অর্থ সংকটে প্রকল্পের কার্যক্রম চলছে অত্যন্ত ধীরগতিতে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, গত ২০০৭ সাল থেকে চট্টগ্রামে পাহাড় ধসে হতাহতের ঘটনা বেড়ে চলেছে। গত ৭ বছরে পাহাড় ধসে প্রায় ১৮০ জন বিভিন্ন বয়সী নারী-পুরুষ ও শিশু নিহত হয়েছে। পরবর্তীতে পাহাড় ধসের কারণ চিহ্নিত করতে অসংখ্য কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিগুলো তাদের রিপোর্টও জমা দিয়েছে। কিন্তু কমিটির কোন সুপারিশ বাস্তবায়ন হয়নি।
কমিটিগুলোর সুপারিশের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- পাহাড় কাটায় জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ, মামলা দায়ের, নিরাপত্তা বেষ্টনি নির্মাণ, নীতিমালা প্রণয়ন, পাহাড়ের ১০ কিলোমিটারের মধ্যে ইটভাটা তৈরির অনুমোদন না দেয়া, বালি বিক্রি নিষিদ্ধ, ৫ কিলোমিটারের মধ্যে আবাসন প্রকল্প না করা, পাহাড়ে সামাজিক বনায়ন ও অবৈধ বসতি উচ্ছেদ। কিন্তু এসব সুপারিশ আলোর মুখ দেখেনি।
তদন্ত কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়ন নিয়ে চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) এসএম আবদুল কাদের বলেন, ‘সুপারিশ বাস্তবায়নে বাধা হচ্ছে অর্থনৈতিক সংকট ও জায়গার অভাব। আর এসব বসতি নিয়ন্ত্রণ করছে স্থানীয় প্রভাবশালী মহল। তারা দখল স্থায়ী করতে নিম্নআয়ের লোকদের ব্যবহার করছে। কম মূল্যে বাসা ভাড়া দিয়ে আর্থিক লাভবান হচ্ছে দখলকারীরা।’প্রসঙ্গত, চট্টগ্রামে ছোট-বড় ১৬টি পাহাড়ে প্রায় ২ লক্ষাধিক লোক বসবাস করছে। এদের মধ্যে কয়েক হাজার লোক ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় পাহাড়ের পাদদেশে ও উপরে বসবাস করছে বলে চিহ্নিত করা হয়েছে।