সীমাবদ্ধতাকে জয়ের লড়াই
প্রকাশ : ২৩ মে ২০১৪, ২৩:৫১
অবজ্ঞা আর অবহেলা শ্রবণ ও বাক প্রতিবন্ধীদের কুঁকড়ে দিচ্ছে
পারিবারিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় কোন ভূমিকা থাকে না
ভাতা পান অপ্রতিবন্ধীরা!
সমাজসেবা অধিদপ্তরে নেই ইশারা ভাষাভাষী
স্বপ্নের অভাব নেই। নেই পরিশ্রমের কমতি। আর এ দু’য়ের সম্মিলনে সকল সীমাবদ্ধতাকে জয় করার লড়াইয়ে মেতেছে ওরা। তানভীর, তানমিম, জাহিদুল ও রিফাত। চারজনই শ্রবণ ও বাক প্রতিবন্ধী। উদ্যম আর মেধার অভাব না থাকলেও নানাভাবে বঞ্চিত হচ্ছে এই প্রতিবন্ধীরা। শিক্ষা থেকে শুরু করে খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিত্সার মতো মৌলিক অধিকারগুলো পাওয়া থেকে শুধু বঞ্চিতই হচ্ছে না, পদে পদে অবজ্ঞা আর অবহেলা তাদের কুঁকড়ে দিচ্ছে।
শ্রবণ ও বাক প্রতিবন্ধী কতজন?
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসেবে, বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার মধ্যে ১ কোটি ৭০ লাখ মানুষ প্রতিবন্ধী। এর মধ্যে পুরুষ ও নারীর অনুপাত ৫২ : ৪৮। তার মধ্যে বাক, শ্রবণ প্রতিবন্ধী রয়েছে ২৫ লাখ। অন্য প্রতিবন্ধীদের মধ্যে শারীরিক প্রতিবন্ধী ৪০ লাখ, মানসিক প্রতিবন্ধী ৩৮ লাখ, দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ৩৩ লাখ। তবে বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী কল্যাণ সমিতির (বিপিকেএস) মতে ৭ দশমিক ৮ ভাগ, অ্যাকশন এইড বাংলাদেশের মতে ৮ দশমিক ৮ ভাগ এবং জাতীয় প্রতিবন্ধী ফোরামের মতে ৫ দশমিক ৬ ভাগ বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধী ব্যক্তি বাংলাদেশে রয়েছে।
প্রথম ধাক্কাটা আসে পরিবার থেকেই
প্রতিবন্ধীদের জন্য প্রথম ধাক্কাটা আসে পরিবারের কাছ থেকেই। প্রতিবন্ধী শিশুরাও যে মূলধারার শিক্ষায় অংশগ্রহণে সক্ষম সে বিষয়ে অনেক পিতামাতা ও পরিবারের সদস্যদের কোন ধারণাই নেই? নিজ পরিবার, সমাজ, সমবয়সী ছেলেমেয়ে এমনকি স্কুল শিক্ষকরাও প্রতিবন্ধী মহিলা ও কিশোরীদের শিক্ষাকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করেন না। বিশেষ করে নারীরা আরো বেশি ভোগান্তির শিকার হন। পরিবারের অভ্যন্তরে প্রতিবন্ধী শিশু, মহিলা বা কিশোরীদের অন্য অপ্রতিবন্ধী সদস্যদের ন্যায় সমদৃষ্টিতে দেখা হয় না। পরিবারের অন্যদের তুলনায় শিক্ষা, খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিত্সা ইত্যাদির ক্ষেত্রে তারা বঞ্চনার শিকার হন। অভিভাবকরাও তাদের প্রতিবন্ধী সন্তানের জন্য তেমনভাবে অর্থ ব্যয়ে আগ্রহী হন না। পরিবারের অনেক সদস্য মনে করেন, তাদের পরিবারের দুর্ভাগ্যের মূলে রয়েছে এই প্রতিবন্ধী সদস্যটি। অধিকাংশ ক্ষেত্রে কিশোরী ও মহিলা প্রতিবন্ধীদের পারিবারিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় কোন ভূমিকা থাকে না।
শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার
শুধু অবহেলা নয়, প্রতিবন্ধীরা প্রতিনিয়ত শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হন। ৯২ শতাংশ মহিলা ও কিশোরী প্রতিবন্ধী কোন না কোন নির্যাতনের শিকার। এরমধ্যে ৩২ শতাংশ মহিলা প্রতিবন্ধী ও ৩৭ শতাংশ কিশোরী প্রতিবন্ধী যৌন নির্যাতনের শিকার।
সমাজসেবা অধিদপ্তরেই নেই কোন ইশারা ভাষাভাষী
প্রতিবন্ধীদের ভালো-মন্দ দেখে সরকারের যে প্রতিষ্ঠান সেই সমাজসেবা অধিদপ্তরেই নেই কোন ইশারা ভাষাভাষী কিংবা বিকল্প কোন যোগাযোগ ব্যবস্থা। ফলে শ্রবণ ও বাক প্রতিবন্ধীরা তাদের কোন অভাব-অভিযোগের কথা জানাতে পারেন না সরকারের কাছে। এছাড়া দেশের কোন সরকারি হাসপাতাল, অফিস-আদালত কোথাও নেই ইশারা ভাষাভাষীদের নির্দিষ্ট কোন পদ। ফলে হাসপাতাল, অফিস কোথাও প্রতিবন্ধীরা গেলে যোগাযোগের অভাবে তারা তাদের প্রাপ্য সেবা পাচ্ছে না।
অপ্রতুল ও ব্যয়বহুল শিক্ষা
শ্রবণ ও বাক প্রতিবন্ধীদের জন্য নেই আলাদা কোন শিক্ষা কার্যক্রম। ফলে তাদের অপ্রতিবন্ধীদের সাথে প্রতিযোগিতা করতে হচ্ছে। এছাড়া পর্যাপ্ত স্কুল-কলেজ না থাকায় তারা শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। সারাদেশে সমাজসেবা অধিদপ্তরের ৬/৭টি প্রাথমিক বিদ্যালয়, জাতীয় বধির সংস্থার একটি হাইস্কুল ও ৯টি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এছাড়া বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় শ্রবণ প্রতিবন্ধীদের জন্য হাতেগোনা কয়েকটি স্কুল রয়েছে, যা চাহিদার তুলনায় খুবই অপ্রতুল। বেসরকারি এসব স্কুলে শিক্ষা ব্যয়বহুল হওয়ায় তা নিম্নবিত্ত পরিবারের নাগালের বাইরে। সেইসাথে কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অনুকূলে গুলশান কলেজে এইচএসসি পড়ার সুযোগ থাকলেও পরে আর উচ্চশিক্ষার সুযোগ নেই বললেই চলে। এ প্রসঙ্গে শ্রবণ ও বাক প্রতিবন্ধী জাহিদুল ইশারা ভাষায় প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত একজনের মাধ্যমে শ্রবণ ও বাক প্রতিবন্ধীদের শিক্ষার জন্য আলাদা কারিকুলামের দাবি জানান। এছাড়া তিনি উচ্চশিক্ষার ব্যবস্থা ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে সরকারের প্রতি আহবান জানান।
প্রতিবন্ধীদের ভাতা পান অপ্রতিবন্ধীরা!
প্রতিবন্ধীদের জন্য বরাদ্দ ভাতার ৯৫ শতাংশই পান অপ্রতিবন্ধীরা- এমন অভিযোগ করেছেন জাতীয় বধির সংস্থার কোষাধ্যক্ষ একেএম মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, প্রতিবন্ধীরা নানাভাবে বঞ্চিত হচ্ছে। সচ্ছল-অসচ্ছলদের মধ্যে পার্থক্য দেখিয়ে প্রতিবন্ধীদের শিক্ষাবৃত্তি থেকে বঞ্চিত করা হয়। অথচ সব প্রতিবন্ধীরই শিক্ষাবৃত্তি পাওয়া উচিত। এছাড়া অন্য প্রতিবন্ধীরা চিকিত্সা ভাতা পেলেও মূক ও বধিররা তা পান না। তিনি বলেন, বাক প্রতিবন্ধীরা তাদের অভাব অভিযোগের কথা তুলে ধরতে পারেন না তাই অন্য প্রতিবন্ধীদের তুলনায় তারা বেশি বঞ্চিত হন।
কর্মসংস্থানেও অবহেলিত
প্রতিবন্ধী হওয়ায় কর্মক্ষেত্রেও অবহেলিত মূক ও বধিররা। কর্মক্ষেত্রে অনুকূল পরিবেশের অভাবই শুধু নয়, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তারা কাজের জন্য যথাযথ সুবিধা ও মজুরি পান না। অনেক ক্ষেত্রে একই কাজে প্রতিবন্ধীরা অপ্রতিবন্ধীদের তুলনায় বেতন ও অন্যান্য সুবিধাদি কম পান? আবার অনেক ক্ষেত্রে কোন কারণ ছাড়াই প্রতিবন্ধীদের চাকরি হতে ছাঁটাই করা হয়। প্রতিবন্ধীদের মেধার কোন ঘাটতি নেই জানিয়ে শ্রবণ ও বাক প্রতিবন্ধী তানভীর বিকল্প যোগাযোগের মাধ্যমে জানান, প্রতিবন্ধীরা কর্মক্ষেত্রে সুযোগ পেলে ভালো কিছু করবে। এছাড়া তিনি সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে শ্রবণ ও বধিরদের জন্য নির্দিষ্ট পদ সৃষ্টির আহবান জানান।
প্রতিবন্ধীর সাথে প্রতিবন্ধীর বিয়ে!
বিয়ের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধীদের নানা ভোগান্তি পোহাতে হয়। অনেক পরিবারই প্রতিবন্ধী মেয়ের সাথে বিয়ের জন্য প্রতিবন্ধী পাত্র খোঁজ করে ? তবে বিয়ের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধী নারীদের হতাশা আরো বেশি। মানুষ প্রতিবন্ধী নারীকে বিয়ে করতে ইতস্তত বোধ করে ? অনেক সময় যৌতুকের বিনিময়ে বিয়ে দিলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে পরে সেই বিয়ে ভেঙ্গে যায়।
খালি নেই সংরক্ষিত আসন!
বাসে নারী, শিশু ও প্রতিবন্ধীদের জন্য ৯টি আসন সংরক্ষিত রাখার নিয়ম করা হলেও অনেক ক্ষেত্রেই প্রতিবন্ধীরা তাদের সংরক্ষিত আসন পান না- এমন অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া নৌ-পরিবহন ও রেল ভ্রমণের ক্ষেত্রে ভাড়ার পরিমাণ হ্রাস করা হলেও অনেক সময় প্রতিবন্ধীরা এ সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হন।
প্রতিবন্ধী নির্যাতন ও সহিংসতা প্রতিরোধে ব্যবস্থা নেই
বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী কল্যাণ আইন-২০০১ কার্যকর হলেও তাতে প্রতিবন্ধীদের উপর নির্যাতন ও সহিংসতা প্রতিরোধে কোনো ব্যবস্থা রাখা হয়নি। প্রতিবন্ধী মানুষের বিশেষ চাহিদার কথা বিবেচনায় রেখে আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ-সুবিধাও দেশে গড়ে ওঠেনি।