শামীম ওসমানের গ্রেফতার দাবি করল ত্বকী মঞ্চ
ইত্তেফাক রিপোর্ট ও নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি
প্রকাশ : ২৩ মে ২০১৪, ২৩:৫১
নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের এমপি শামীম ওসমানের গ্রেফতার দাবি করেছে সন্ত্রাস নির্মূল ত্বকী মঞ্চ। গতকাল মঞ্চের আহ্বায়ক রফিউর রাব্বি ও সদস্যসচিব হালিম আজাদ এক বিবৃতিতে এই দাবি জানান। এদিকে শামীম ওসমান গতকাল বিকালে গুলশানে সাংবাদিক সম্মেলনে বলেছেন, ‘আমার বিরুদ্ধে একটি মহল আছে যারা এসব করে। তারা আমার বিরুদ্ধে সবকিছু খুঁজে খুঁজে বের করে। ফোনালাপ রেকর্ড তো আর কোনো সাংবাদিক বা কোনো রাজনীতিক করেননি। এটা করেছে কোনো গোয়েন্দা সংস্থা। আমি জানি এবং বুঝি। আমি বুঝেই কথা বলি। না বুঝে কথা বলি না। দুই বছর তারা আমার বিরুদ্ধে তদন্ত করেছে। কিন্তু কিছুই পায়নি। আর তদন্ত রিপোর্ট আদালতে যাওয়ার আগে পত্রিকার কাছে চলে যায়।’
সন্ত্রাস নির্মূল ত্বকী মঞ্চের বিবৃতিতে বলা হয়, ‘নারায়ণগঞ্জের ওয়ার্ড কাউন্সিলর নজরুল ইসলাম ও আইনজীবী চন্দন সরকারসহ নৃশংস সাত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় তদন্তকারী সংস্থার মাধ্যমে শামীম ওসমান ও নূর হোসেনের কথোপকথনের রেকর্ড প্রকাশ পেয়েছে। আমরা পত্রিকার মাধ্যমে জানতে পেরেছি, এই হত্যাকাণ্ডে শামীম ওসমানের সংশ্লিষ্টতা বেরিয়ে এসেছে।’ বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ‘প্রসঙ্গত, নূর হোসেন শামীম ওসমানেরই সৃষ্টি। তারই ছত্রচ্ছায়ায় তিনি বেপরোয়া ও গডফাদারে পরিণত হয়েছিলেন। নূর হোসেনকে এই শামীম ওসমানই দেশের বাইরে পালিয়ে যেতে সাহায্য করেছেন বলেও আমরা সংবাদপত্রের মাধ্যমে জানতে পেরেছি। সাতজন অপহরণের পর শামীম ওসমান বলেছিলেন, ‘নূর হোসেন এ কাজ করেননি। কিন্তু বিভিন্ন ঘটনাবলীর মধ্য দিয়ে সাত হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে শামীম ওসমানের সংশ্লিষ্টতার সংবাদ প্রকাশিত হচ্ছে। আমরা অতিসত্বর শামীম ওসমানকে গ্রেফতার ও এই হত্যার সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করার জোর দাবি জানাচ্ছি।’
একটি মহল সব সময়ই
সক্রিয়ঃ শামীম ওসমান
শামীম ওসমান সাংবাদিক সম্মেলনে নূর হোসেনের সঙ্গে ফোনালাপের বিষয়ে তিনি বলেন, শুধু এই বিষয় নয়। আমার বিরুদ্ধে একটি মহলই আছে যারা এসব করে। তিনি বলেন, ‘আমি নূর হোসেনকে আত্মসমর্পণ করতে বলেছি, পালাতে নয়।’ আপনার সঙ্গে নূর হোসেন ধানমন্ডি থেকে ফোনে কথা বলেছেন। এমন অভিযোগ আছে বলে সাংবাদিকরা প্রশ্ন করলে শামীম ওসমান পাল্টা প্রশ্ন ছুঁড়ে বলেন, তারা (গোয়েন্দা) যদি জানতেন নূর হোসেন ধানমন্ডিতে আছেন, তাহলে তারা নূর হোসেনকে ধরলেন না কেন? একজন তদন্ত কর্মকর্তা আছেন যিনি গত দুই বছর ধরে আমার বিরুদ্ধে তদন্ত করছেন। কিন্তু আমার দুঃখটা হলো তদন্ত প্রতিবেদন কোর্টে যাওয়ার আগে পত্রিকায় চলে যায়। তাও আবার একটি বিশেষ পত্রিকায়। তিনি বলেন, আজকেও আমার (শামীম ওসমান) আর নূর হোসেনের মধ্যে একটি ফোনালাপ তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে।
নারায়ণগঞ্জে হত্যাকাণ্ডের শিকার মেধাবী শিক্ষার্থী তানভীর মুহাম্মদ ত্বকীর বাবার নির্বাচনের দাঁড়ানোকে চক্রান্ত হিসেবে দেখছেন সংসদ সদস্য শামীম ওসমান। তিনি বলেন, রফিউর রাব্বী একজন ঋণ খেলাপি। একটি ব্যাংক তার কাছে ১৯ কোটি ৩৪ লাখ টাকা পায়। এছাড়া একটা গার্মেন্টস কোম্পানির নামে তিনি ঋণ নিয়েছেন। অথচ ওই গার্মেন্টে কোনো মেশিনই নেই। তিনি বলেন, একজন ঋণ খেলাপি হয়েও তিনি নির্বাচন করার জন্য মনোয়নয়নপত্র কিনেছেন। এটি একটি চক্রান্ত। হয়তো কোনো মহল তাকে দিয়ে এই চক্রান্ত করাচ্ছেন। ওই মহল আমার বিরুদ্ধে সব সময়ই সক্রিয়। তারা হয়তো বলেছে নির্বাচন করেন আমরা আপনার ঋণ শোধ করে দেবো।
‘নূর হোসেন একদিনে সৃষ্টি হয়নি’
পরিবেশবাদী মানবাধিকার সংগঠন নির্ভীকের প্রধান সমন্বয়ক এটিএম কামাল বলেন, নদী খেকো দানব ও মানুষ খেকো রাক্ষসদের হাত থেকে শীতলক্ষ্যাকে বাঁচাতে হবে। শীতলক্ষ্যা বাঁচলে নারায়ণগঞ্জ বাঁচবে। এ নদী খেকো দানব ও মানুষ খেকো রাক্ষসদের কারণে নারায়ণগঞ্জের আজকের পরিস্থিতি উত্তাল হয়েছে। এ নদী খেকো দানবদের ফাঁঁসি দাবি করছি। শীতলক্ষ্যা এখন কাঁদে লাশের ভারে। কারণ প্রতি মাসে এ নদীতে পাওয়া যাচ্ছে অনেক লাশ। নদী খেকো দানব ও মানুষ খেকো রাক্ষসদের হাত থেকে শীতলক্ষ্যা বাঁচাও, নারায়ণগঞ্জ বাঁচাও শ্লোগানে গতকাল সকালে ৫ নম্বর ঘাট এলাকায় ‘নির্ভীকের’ সমাবেশে তিনি এ বক্তব্য দেন।
সেভেন মার্ডার সম্পর্কে এটিএম কামাল বলেন, নারায়ণগঞ্জের সাবেক ডিসি এসপি নারায়ণগঞ্জের অপকর্মের সাথে জড়িত ছিলেন। আর এ সেভেন মার্ডারে র্যাবের কর্মকর্তা সরাসরি জড়িত। ডিসি এসপির প্রশ্রয়ে নূর হোসেন সন্ত্রাসের অভয়ারণ্য সৃষ্টি করেছে। নূর হোসেনের সন্ত্রাসের দায় দায়িত্ব কেউ এড়াতে পারবে না। সেভেন মার্ডারের পর নূর হোসেনকে রাইফেল ক্লাবে দেখা গেছে। নারায়ণগঞ্জের-৪ আসনের এমপি শামীম ওসমানের ঘনিষ্ঠজন ছিলো এই নূর হোসেন। এ নূর হোসেন একদিনে সৃষ্টি হয়নি। দলমত নির্বিশেষে একসাথে কাজ করে এ সন্ত্রাসীদের নারায়ণগঞ্জ থেকে বিতারিত করতে হবে। সবাই এক হয়ে কাজ করতে চাই।
নূর হোসেনের সঠিক তথ্য পুলিশের কাছে নেই
নজরুল ইসলাম ও চন্দন কুমার সরকারসহ সাতজনকে খুনের মামলার প্রধান আসামি নূর হোসেনের অবস্থানের সঠিক কোনো তথ্য পুলিশের কাছে নেই বলে জানিয়েছেন নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার খন্দকার মহিদ উদ্দিন। তিনি বলেছেন, নারায়ণগঞ্জের আলোচিত সাত হত্যা মামলার তদন্ত সময়মতো দৃশ্যমান হবে। তদন্তের প্রয়োজনে এর আকার বড় হতে পারে। গতকাল বিকালে নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাবে সাংবাদিকদের সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে মতবিনিময় করেন খন্দকার মহিদ উদ্দিন। সভায় সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন। একই সঙ্গে তিনি বলেন, তিনি নারায়ণগঞ্জবাসীর পুলিশ সুপার হতে চান, কোনো গোষ্ঠীর পুলিশ সুপার হতে চান না।
সংসদ সদস্য শামীম ওসমানের সঙ্গে সাত হত্যা মামলার প্রধান আসামি নূর হোসেনের কথোপকথনের অডিও বার্তায় তাকে ভারতে পালিয়ে যেতে সহায়তা দেয়ার অভিযোগ প্রসঙ্গে কোনো মন্তব্য না করে পুলিশ সুপার বলেন, খণ্ডিত কোনো ঘটনা সম্পর্কে আলাদা মন্তব্য করা সম্ভব নয়। ছোট ছোট টুকরো কাগজ মিলিয়ে যেমন একটি অবয়ব তৈরি করা হয়, তেমনি তদন্তও একটি পূর্ণাঙ্গ বিষয়। তদন্তের প্রয়োজনে এর ব্যাপ্তি বা আকার বাড়তে পারে। ইন্টারপোলের সহায়তা চেয়ে চিঠি দেয়ার অর্থ কি নূর হোসেন বিদেশে পালিয়ে গেছে- সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে খন্দকার মহিদ উদ্দিন বলেন, বৃহস্পতিবার পর্যন্ত নূর হোসেনের অবস্থান সম্পর্কে পুলিশের কোনো ধারণা ছিল না। কিন্তু সময় অনেক গড়িয়ে যাওয়ায় সতর্কতার অংশ হিসেবেই ইন্টারপোলের রেড ওয়ারেন্ট জারি করতে চিঠি দেয়া হয়েছে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘অনেক ক্ষেত্রেই আমরা দেখি পাশের দেশে অবৈধভাবে গিয়ে আবার অবৈধভাবে ফিরে আসা হয়।’ এ সময় সাংবাদিকেরা জানতে চান, নূর হোসেন কি দেশে না বিদেশে আছেন। এর জবাবে তিনি বলেন, আসলে নূর হোসেনের অবস্থানের সঠিক কোনো তথ্য পুলিশের কাছে নেই।