সুন্দরবনে আগুন :প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রভাব?
প্রকাশ : ২৪ মে ২০১৪, ২৩:৩৩
সুন্দরবনে বার বার আগুন লাগার পেছনে এখানকার ভূ-গর্ভে প্রাকৃতিক গ্যাসের অবস্থান রয়েছে কিনা তা খতিয়ে দেখার প্রয়োজন রয়েছে। গত এক দশকে সুন্দরবনের পূর্ব এলাকায় চাঁদপাই ও শরণখোলা রেঞ্জের বিভিন্ন বনভূমিতে গত বুধবারসহ ১৭ বার আগুন লাগার যে ঘটনা ঘটলো তার কারণ নিয়ে নানা মত রয়েছে। যা মানুষের সৃষ্ট বলে বিভিন্ন সূত্রে বলা হলেও এর পিছনে কোন প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রভাব আছে কি-না তা নিয়ে আজ পর্যন্ত কোন অনুসন্ধান করার খবর পাওয়া যায়নি।
খনিজ সম্পদ তেল ও গ্যাসের অবস্থান সুন্দরবনের ভূ-গর্ভে রয়েছে এবং বাংলাদেশে হাইড্রোকার্বন অনুসন্ধানের জন্য পেট্রোবাংলা যে ২৩টি ব্লক বিভাজন করেছে তার মধ্যে সুন্দরবন রয়েছে। ইতিপূর্বে সংরক্ষিত সুন্দরবন ও সন্নিহিত এলাকা পেট্রোবাংলার অনুসন্ধান ব্লকের ৫ ও ৭ নং ক্রমিকে অবস্থিত এবং ডাচ্ কোম্পানির শেল ও মার্কিন কোম্পানি ইউনিকল এই দুই ব্লকে অনুসন্ধানের দায়িত্ব পেয়েছিল। পরবর্তীকালে বিশেষজ্ঞ ও পরিবেশবাদীদের আপত্তির মুখে কয়েক বছর ধরে এই অনুসন্ধান বন্ধ রয়েছে। জানা গেছে, সুন্দরবনে গত ১০ বছরে বার বার যে আগুনের ঘটনা ঘটছে তা নতুন নয়। দীর্ঘ আড়াইশ বছরের ইতিহাসে বহুবার এখানে আগুন লাগার খবর রয়েছে। যার পিছনে মানুষের সৃষ্ট কারণ ছাড়াও প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রভাব ছিল বলে জানা গেছে।
সুন্দরবন বাঁচাও কর্মসূচির আহ্বায়ক বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা মেজর (অব.) জিয়াউদ্দিন আহমেদ ইত্তেফাককে বলেন, উদ্ভিদ ও প্রাণীর দেহাবশেষ রাসায়নিক বিক্রিয়ায় কালের বিবর্তনে চাপ ও তাপের প্রভাবে পেট্রোলিয়াম বা প্রাকৃতিক গ্রাসে পরিবর্তিত হয়। যা সুুন্দরবনের ভূ-গর্ভে রয়েছে। সুন্দরবনের যে এলাকায় বার বার আগুনের ঘটনা ঘটে, সেখানে মাটির উপরের পাতা পচে যে জৈব পদার্থের সৃষ্টি হয় তাতে সিথেন গ্যাস থাকা স্বাভাবিক। উপরন্তু মাটির অতি গভীরে যে প্রাকৃতিক গ্যাস বা পেট্রোলিয়াম থাকে তার চাপে উপরের মাটি অনেক সময় ঠেলে উঠে আসে। সুন্দরবনের যে এলাকায় বার বার আগুন লাগে তা ভোলা নদীর দক্ষিণ পাড়ে। এ এলাকায় লক্ষ্য করা গেছে, মাটি ৭/৮ ফুট উঁচু । ভূ-গর্ভে অবস্থিত গ্যাসের প্রভাবে সুন্দরবন অংশের মাটি এভাবে উঁচু হয়ে যেতে পারে। দুবলার চর এলাকায় বিভিন্ন সময়ে ৪শ জায়গায় নলকূপ বসানোর চেষ্টায় দেখা গেছে গ্যাস উঠে আসছে। এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, সুন্দরবনের মাটির নিচে অবশ্যই গ্যাস ও তেল রয়েছে, যদিও তা আহরণ নিয়ে নানা ভিন্নমত বা বিতর্ক থাকতে পারে। মেজর জিয়া বলেন, লোকালয়ে রিগিং করে সুন্দবনের গ্যাস ও তেল উত্তোলন করার উদ্যোগ নিলে বনের পরিবেশ যে ক্ষতির মুখে পড়বে এমনটা নয়। সুন্দরবনের পরিবেশ ও প্রকৃতিকে রক্ষা করে পেট্রোবাংলা এখানে তেল-গ্যাসের সন্ধান করতে পারে। এদিকে গ্যাসের প্রভাবে সুন্দরবনে বার বার আগুন লাগছে এ কথা স্বীকার করতে রাজি নয় বন বিভাগ। পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের ডিএফও আমীর হোসাইন চৌধুরী ইত্তেফাককে বলেন, মানুষের অসচেতনতা, অসতর্কতা ও অজ্ঞতার কারণে সামপ্রতিক আগুনের ঘটনাসহ বেশিরভাগ অগ্নিকাণ্ড এখানে ঘটেছে। তবে অনুসন্ধান করে দেখা যেতে পারে এলাকায় গ্যাস আছে কি না।
এনামুল হক, খুলনা অফিস থেকে জানান, সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জের গুলিশাখালী ও আমরবুনিয়া ফরেস্ট ক্যাম্পের মাঝামাঝি বাইশ ও তেইশের ছিলা এলাকার গহীন অরণ্যে আগুন লাগে। এতে পাঁচ একরেরও বেশি এলাকা পুড়ে গেছে।
পূর্ব সুন্দরবন বনবিভাগের জিউধরা স্টেশন অফিসার সুলতান মাহমুদ জানান, শুক্রবার সকাল ১০টার দিকে সুন্দরবনের বাইশ ও তেইশের ছিলা এলাকার আগুন সম্পূর্ণ নেভানো সম্ভব হয়েছে। অগ্নিকাণ্ডে কোন গাছ-গাছালির ক্ষতি না হলেও মাটির সঙ্গে মিশে থাকা লতাগুল্ম ও মাটিতে পড়ে থাকা গাছের পাতা পুড়ে গেছে। অগ্নিকাণ্ডে আর্থিক ক্ষতি এই মুহূর্তে জানানো সম্ভব নয়।
২০০৪ সালে সুন্দরবনে প্রথম অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। ওই বছর দু’দফা পূর্ব সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জের নাংলি ও আড়ুয়ার খাল এলাকায় আগুন লাগে। ২০০৫ সালের ৮ এপ্রিল একই রেঞ্জের আমরবুনিয়া এলাকায় অগ্নিকাণ্ডে এক কিলোমিটার এলাকার বনাঞ্চল পুড়ে যায়। ৯ এপ্রিল একই রেঞ্জের কলমতেজি টহল থেকে প্রায় এক কিলোমিটার ভিতরে এবং ধানসাগর স্টেশনের মূর্তির খাল এলাকায় ও ১৩ এপ্রিল তুলাতলা এলাকায় আগুন লাগে। এর আগে ১৯ মার্চ শরণখোলা রেঞ্জের তেরাবেকা এলাকায় সৃষ্ট দাবানলে পুড়ে যায় দেড় একর বনভূমি। এছাড়া ২৫ মার্চ নাংলি এলাকায় এবং ২৭ ডিসেম্বর ধান সাগর স্টেশন সংলগ্ন এলাকায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। ২০০৬ সালের ৩০ এপ্রিল পূর্ব সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জের পচাকুড়ালিয়া এলাকায় আগুনে প্রায় ২শ’ একর বনভূমি পুড়ে যায়। ভয়াবহ এ অগ্নিকাণ্ডের বিস্তার ঘটে বনের প্রায় ৬ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে। এ ঘটনার কয়েক দিনের মাথায় তেরাবেকা, কলমতেজি ও নাংলি এলাকায় আবারো আগুনের সূত্রপাত হয়।
২০০৭ সালে পূর্ব সুন্দরবনের নাংলি এলাকায় পচাকুড়ালিয়া ও ডুমুরিয়া ক্যাম্প এলাকায় আগুন লাগে। এর আগে ২০০১ সালের শুষ্ক মৌসুমে ধান সাগর স্টেশনের পয়ষট্টি ছিলা এলাকায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এছাড়া ২০০২ সালে ওই এলাকার বাইরে শরণখোলা রেঞ্জের কটকা অভয়ারণ্য এলাকায় অগ্নিকাণ্ডে প্রায় ২ একর জায়গার বনজ সম্পদ পুড়ে যায়। ২০১১ সালের মার্চ মাসে তিন দফা অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে পূর্ব সুন্দরবনে।