সাবধান, দেরি হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে
প্রকাশ : ২৫ মে ২০১৪, ০০:০৩
অবিলম্বে নির্দলীয় সরকারের অধীনে সবার অংশগ্রহণে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবি জানিয়ে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া সরকারকে উদ্দেশ করে বলেছেন, সময় থাকতে সাবধান। বেশি দেরি হলে পরিস্থিতি সবার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। তিনি বলেন, সরকারের পায়ের তলায় মাটি নেই, তারা টিকে আছে বন্দুকের নলের ওপর ভর করে। বন্দুক সবসময় একদিকে স্থির থাকে না। কখন যে কোনদিকে ঘুরে বলা মুশকিল। কাজেই সরকারকে বলবো, এখনও সময় আছে, আলোচনার মাধ্যমে সুষ্ঠু নির্বাচন দিন।
গতকাল জাতীয় প্রেসক্লাবে জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের প্রতিবাদ সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। আইনজীবীদের এই মহাসমাবেশ হওয়ার কথা ছিল সুপ্রিম কোর্ট বার এসোসিয়েশন প্রাঙ্গণে। পুলিশ সেখানে সমাবেশ করতে না দেয়ায় দুপুরে তাত্ক্ষণিকভাবে প্রেসক্লাব মিলনায়তনে সংক্ষিপ্ত প্রতিবাদ সমাবেশ করেন বিএনপিপন্থি আইনজীবীরা।
সমাবেশে বাধা দেয়ার তীব্র নিন্দা জানিয়ে খালেদা জিয়া বলেন, এই সরকার এত ভীত ও দুর্বল যে, তারা আইনজীবীদের সমাবেশ করতে দেয়নি। র্যাবকে দেখলে মানুষ যেমন আঁতকে ওঠে, তেমনি এই সরকারও এখন জনগণকে ভয় পায়, বিএনপির সমাবেশের কথা শুনলেই তারা আতঙ্কিত হয়ে ওঠে। আমাদের কোনো সভা-সমাবেশ-মিছিল, এমনকি ঘরোয়া মিটিংও করতে দেয়া হচ্ছে না। ক্ষমতা ধরে রাখতে এ সরকার পুলিশসহ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে যেভাবে খুশি সেভাবে ব্যবহার করছে। এক মন্ত্রী বলেছেন, ‘আইন-কানুন, বিধি-বিধান মানার দরকার নাই’। সরকার ওই মন্ত্রীকে এখনও ধরেনি। দুর্বল সরকার কাউকেই কিছু বলারও সাহস রাখে না।
তিনি বলেন, সুপ্রিম কোর্ট বার এসোসিয়েশনের লোকজন নির্বাচিত। নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসাবে সরকার তাদের সমাবেশ আটকাতে পারে না। কয়েকদিন আগে গুম-খুন-অপহরণের শিকার পরিবার-পরিজনদের নিয়েও আমাদের সমাবেশ করতে দেয়া হয়নি। দেশ চলছে না। এভাবে বেশিদিন চলবে না, চলতে পারে না। সভা, সমাবেশ করার জন্য সবার সমান অধিকার থাকতে হবে। আমরা আইনের শাসন, গণতন্ত্র ও সুশাসন চাই।
সরকারকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, অতি বাড়াবাড়ি ভালো নয়। বেশি বাড়তে নেই, তাহলে ঝড়ে পড়ে যায়। বাঘ-ভালুক লাগবে না, ছাগলই আপনাদের খেয়ে ফেলবে। মন্ত্রীরা যা খুশি বলছেন। এই দেশ জনগণের। তাই যা ইচ্ছা তা করা যাবে না। জাতি আজ ঐক্যবদ্ধ। মানুষ অস্থির হয়ে গেছে। তারা সরকারকে বিদায় করে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন দেখতে চায়। যার মাধ্যমে গণতন্ত্র ফিরে আসবে, তারা ভোটাধিকার ফিরে পাবে। আসুন সবাই ঐক্যবদ্ধ হই। আমাদের বিজয় সুনিশ্চিত।
বিএনপি চেয়ারপারসন বলেন, অনেকে বলছেন, আমরা কেন আন্দোলনের কর্মসূচি দিচ্ছি না। দেবো, সময়মতো কর্মসূচি দেবো। জনগণের কাছে এ সরকারের দাম নেই। তাই এদেরকে একটু সুযোগ দিচ্ছি। এরা পচে গেছে, আরেকটু পচুক। তাই একটু সময় নিচ্ছি। তবে এদের সময় ফুরিয়ে এসেছে। মা-বোন, যুবক-তরুণসহ দেশের সাধারণ জনগণ এই অবৈধ সরকারের বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমে আসবে। তখন এই সরকার জনগণের কাছে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হবে।
খালেদা জিয়া বলেন, আমি বলেছি-আমি জনগণের সঙ্গে আছি। এজন্য এ সরকার এখন আমার পিছে লেগেছে। আমি এসব পরোয়া করি না। আওয়ামী লীগ নানা ষড়যন্ত্র করছে, যাতে কোনোভাবে আমাকে আটকানো যায়। আমি ৯ বছর স্বৈরাচার এরশাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছি। ফখরুদ্দীন-মইনুদ্দীনকেও দেখেছি। তারাও কিছু করতে পারেনি।
র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) বিলুপ্তির দাবি পুনর্ব্যক্ত করে বিএনপি চেয়ারপারসন বলেন, আওয়ামী লীগের জন্যই আমরা এই র্যাব গঠন করেছিলাম। কারণ, ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকার দুর্নীতি, লুটপাট করেছে, জঙ্গিবাদের উত্থান ঘটেছে, তারা বোমা মেরেছে। এসব জঙ্গি ও শীর্ষ সন্ত্রাসীদের ধরার জন্যই র্যাব গঠন করি। আমাদের সময়ে র্যাব সকল শীর্ষ সন্ত্রাসী ও জঙ্গিদের ধরেছিল। র্যাবকে তখন রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করা হয়নি। আওয়ামী লীগ সেই র্যাবকে বিরোধী নেতা-কর্মীদের পেছনে লেলিয়ে দিয়েছে। প্রতিদিন তারা বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের খুন, গুম ও অপহরণ করছে। ডিবি, র্যাব ও বিভিন্ন সংস্থার নামে মাঝরাতে কিংবা শেষরাতে মানুষের বাড়িতে হানা দিয়ে অপহরণ করছে। টাকার বিনিময়ে এই র্যাব এখন মানুষকে অপহরণের পর হয় ছাড়ছে, না হয় খুন করছে। খুনিদের সঙ্গে এখন এদের কোনো পার্থক্য নেই। এরা নরপিশাচ রক্তচোষা খুনি। আমরা দাবি করছি-ওয়ারেন্ট, সাক্ষী ও ম্যাজিস্ট্রেট ছাড়া কাউকে গ্রেপ্তার করা যাবে না। কে নিচ্ছে, কোথায় নিচ্ছে তা পরিবারকে নিশ্চিত থাকতে হবে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর কতিপয় সদস্যের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘অতি উত্সাহী হয়ে অবৈধ সরকারের কথায় যারা এসব করছে, একদিন তাদেরও এর দায় নিতে হবে।’
বিরোধী দলীয় নেতাকে (রওশন এরশাদ) উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, সংসদে দয়া-দাক্ষিণ্যের একটি বিরোধী দল আছে। একদিকে সরকারের গুণকীর্তন করে, আবার জনগণকে দেখানোর জন্য মাঝে-মধ্যে দু’একটি কথাও বলে। এর নাম গণতন্ত্র নয়।
নারায়ণগঞ্জ, ফেনী, লক্ষ্মীপুর ও লাকসামসহ বিভিন্ন স্থানে সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ডের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, লুটপাট ও দুর্নীতি করে সরকারের লোকজন এত টাকা কামিয়েছে যে, এখন কে কত টাকা নেবে, এসব ভাগবাটোয়ার নিয়ে নিজেরাই খুনোখুনি করছে। যতদিন এই সরকার থাকবে, ততদিন এভাবে লোক মরবে। মনে রাখবেন, আল্লাহর বিচার বলে একটা কথা আছে। আল্লাহর তরফ থেকেই এমন সময় আসবে যে, আপনারা (আওয়ামী লীগ) দাঁড়ানোর জায়গাও পাবেন না। তিনি বলেন, নারায়ণগঞ্জে সেভেন মার্ডারের প্রকৃত অপরাধীদের এখনও ধরা হয়নি। তাদের অবিলম্বে ধরতে হবে।
এই প্রসঙ্গে খালেদা জিয়া আরও বলেন, খুনিদের বিদেশে পাঠিয়ে দিয়ে লাভ হবে না। যারা সেভেন মার্ডারের সঙ্গে জড়িত তাদের সবাইকে ধরতে হবে। ফেনীর ফুলগাজী উপজেলা চেয়ারম্যান হত্যার ঘটনায় জয়নাল হাজারী ও নিজাম হাজারীকে গ্রেফতার করে রিমান্ডে নেয়ার দাবি জানান তিনি।
এই সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের সভাপতি ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি খন্দকার মাহবুব হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উদ্দিন খোকনসহ আইনজীবী নেতারা।
সমাবেশে বাধা
দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতার দাবিতে এবং নারায়ণগঞ্জে এডভোকেট চন্দন কুমার সরকারসহ সারা দেশে গুম-খুন-অপহরণের প্রতিবাদে সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে এই ‘আইনজীবী মহাসমাবেশ’ ডাকে জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরাম। সমাবেশকে কেন্দ করে শুক্রবার রাত থেকেই উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। রাতেই মঞ্চ থেকে খালেদা জিয়ার চেয়ার সরিয়ে নেয় পুলিশ। গতকাল সকাল থেকে সুপ্রিম কোর্টের সব প্রবেশপথে কড়া অবস্থান নেয় পুলিশ। সুপ্রিম কোর্টের ভেতরে ও বাইরে বিপুলসংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হয়। প্রবেশ পথগুলো কাঁটাতারের প্রতিবন্ধক দিয়ে আটকে রাখা হয়। ওই এলাকায় যাওয়ার সব সড়কেও যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করে পুলিশ।
সমাবেশে অংশ নিতে সুপ্রিম কোর্টের ভেতরে প্রবেশ করতে চাইলে সকাল সাড়ে ১০টা পর্যন্ত অন্তত ১৪ জন আইনজীবীকে আটক করে পুলিশ। আইনজীবীদের ভেতরে প্রবেশ করতে বাধা দেয়া হয়। এ পরিস্থিতিতে সুুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি খন্দকার মাহবুব হোসেনের নেতৃত্বে জাতীয়তাবাদী আইনজীবীদের একটি দল হাইকোর্ট মাজারের দিকের ফটকের সামনে অবস্থান নেয়।
সকাল ১০টার দিকে ৩০-৪০ জন আইনজীবী সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে সমাবেশ শুরু করেন। সেখানে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উদ্দিন খোকনও ছিলেন। হাত-মাইক ব্যবহার করে আইনজীবী ফোরামের নেতারা বক্তব্য দেন। দুপুর পৌনে ১২টার দিকে ওই সমাবেশ শেষ হয়। এরপর জাতীয় প্রেসক্লাবে প্রতিবাদ সমাবেশে যোগ দেন জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের নেতা ও সদস্যরা। খালেদা জিয়া ও আইনজীবী নেতারা আটককৃত আইনজীবীদের অবিলম্বে মুক্তি দাবি করেন।
পাঁচদিনের কর্মসূচি
সমাবেশে বাধার প্রতিবাদে পাঁচদিনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের সভাপতি রফিকুল ইসলাম মিয়া। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে- আজ রবিবার সকাল সাড়ে ১০টা থেকে বেলা ১টা পর্যন্ত দেশের সব আদালত বর্জন, আগামীকাল সোমবার দেশের সব আদালতে বিক্ষোভ, মঙ্গলবার দেশের সব বারে মানববন্ধন এবং বুধ ও ব
বৃহস্পতিবার দেশের সব বারে কালো পতাকা মিছিল।
অনুমতি না থাকার দাবি
সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার এ কে এম শামসুল ইসলাম গতকাল সাংবাদিকদের বলেন, সমাবেশের জন্য কোনো অনুমতি নেয়া হয়নি। সমাবেশের প্রস্তুতিকালে বাধা প্রসঙ্গে পুলিশের রমনা অঞ্চলের সহকারী কমিশনার শিবলী নোমান সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘সমাবেশের অনুমতি না থাকায় পুলিশ এ ব্যবস্থা নিয়েছে।’