মূর্খের দেশ হবে নাইজেরিয়া?
প্রকাশ : ২৫ মে ২০১৪, ২২:০১
অর্থনীতি, জনসংখ্যা ও তেল রিজার্ভ— এই তিন ক্ষেত্রেই নাইজেরিয়া আফ্রিকার সর্ববৃহত্; কিন্তু বহির্বিশ্বে ভাল ইমেজ থাকার জন্য এগুলোই কি যথেষ্ট? দেশটি সম্পর্কে কিছু তথ্য জানার পর ইতিবাচক তো নয়ই, উল্টো নেতিবাচক ধারণা তৈরি হতে বাধ্য। যেমন, শিক্ষা পদ্ধতির বাইরে রয়েছে সেখানকার দেড় কোটি শিশু; নাইজেরিয়ার উত্তরাঞ্চলে মাত্র ৪ শতাংশ মেয়েশিশু সমাপ্ত করতে পারে মাধ্যমিক শিক্ষা। এই যখন অবস্থা, তখন অবনতির আশঙ্কা জন্মেছে আরো। আতঙ্কের অপর নাম সশস্ত্র গ্রুপ বোকো হারামের কারণে ছেলে-মেয়েরা দলে দলে স্কুল ছাড়ছে। উত্তরাঞ্চলে বিশেষ করে মেয়েরা স্কুল-কলেজের পাট চুকিয়ে ফেলতে চাইছে। যারা এখনো টিকে রয়েছে তাদের মনে সব সময়ই ভয় কাজ করে— বোকো হারাম সদস্যরা কখন না আক্রমণ করে বসে, মেরে ফেলে কিংবা উঠিয়ে নিয়ে যায়। চিবোকের একটি স্কুল থেকে তাদের দ্বারা তিনশরও বেশি স্কুল ছাত্রী অপহূত হওয়ার পর পেরিয়ে গেছে এক মাসেরও বেশি সময়; কিন্তু এখন পর্যন্ত উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। বর্নোর বন্ধ হয়ে যাওয়া আসকিরা উবা মাধ্যমিক স্কুলের ছাত্রী ম্যারি (নিরাপত্তার কারণে প্রকৃত নাম প্রকাশ করা হল না) বলছিল, ‘আমার দেখা গণহত্যার কারণে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, পড়াশোনা আর নয়। আমার সহপাঠীদের গুলি করা হয়েছিল। কয়েকজনকে জবাই করার পর আগুনে পুড়ে ফেলা হয়েছিল।’ এ ঘটনা ঘটেছিল গত বছরের ২৪ মে। ১৪ বছরের ম্যারি তারও আগে একদিনেই হারিয়েছিল পরিবারের সবাইকে। কী ঘটেছিল সেদিন তা না হয় তার নিজের মুখেই শুনি, ‘তারা বাবাকে আমার সামনেই গুলি করেছিল। আমি পালাতে সক্ষম হয়েছিলাম; কিন্তু আমার মার ভাগ্য এতোটা ভাল ছিল না।
বোকো হারাম সদস্য কর্তৃক আক্রমণ, হত্যা, অপহরণ, বোমাবাজি ও জ্বালাও-পোড়াও চলছে পাঁচ বছর ধরে; কিন্তু সম্প্রতি এসবের তীব্রতা বেড়ে গেছে। প্রত্যন্ত গ্রাম, বাজার, হাসপাতাল, স্কুল ও শিশুরাই মূলত তাদের টার্গেট। মাইদুগুরি থেকে ৩৫ কিলোমিটার দূরে বোকো হারামের তথাকথিত জন্মস্থান কন্দুগা গ্রামের এক কলেজে পড়তেন ১৮ বছর বয়স্কা জয় (এটিও ছদ্মনাম)। বছরখানেক আগে পড়ালেখা ছেড়ে দিয়ে এখন মাকে কৃষিকাজে সাহায্য করছেন। তিনি জানান, সবচে বেশি অপহরণের শিকার হচ্ছে কন্দুগা গ্রামের মেয়েরা। গত পাঁচ বছরে এ গ্রামের অন্তত চল্লিশ জন ছাত্রী অপহূত হয়েছে। নিহতের সংখ্যা অর্ধ শতাধিক। অনেকে ধর্ষিতও হয়েছে। বোকো হারাম সদস্যরা পশ্চিমা শিক্ষাকে সহ্য করতে পারে না আর মেয়েদের বেলায় তো একবারেই নয়।
গত অক্টোবরে প্রকাশিত এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের একটি রিপোর্ট অনুসারে, নাইজেরিয়ার অসংখ্য শিশু শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে কেবল বোকো হারামের কারণে, বিশেষত মেয়েরা। ২০১২ সালের শুরু থেকে গত বছরের অক্টোবর পর্যন্ত ওই জঙ্গী সংগঠনের সদস্যরা নাইজেরিয়ার উত্তরাঞ্চলের কমপক্ষে ৭০ জন শিক্ষক ও শতাধিক ছাত্রছাত্রীকে হত্যা করেছে। তাদের ভয়ে স্কুল ছেড়েছে হাজার হাজার ছেলেমেয়ে। বোর্নো রাজ্যে পুড়িয়ে ফেলেছে আটশরও বেশি শ্রেণীকক্ষ। ইওবা রাজ্যে ২০৯টি স্কুলকে মিশিয়ে ফেলেছে মাটির সঙ্গে।
১৪ বছর বয়সী ফাতিমা তার বর্ধিত পরিবারের সঙ্গে পালিয়ে আশ্রয় নিয়েছে রাজধানী আবুজার কাছাকাছি কাদুনা নামক স্থানে। বোকো হারাম ফাতিমার স্কুলে আক্রমণ চালানোর পরই পরিবারটি ওই স্থান ছেড়ে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। তার এখন কোনো সমস্যা নেই, ‘নতুন স্কুলে বেশ ভাল আছি আমি। এখানে অনেক শান্তি। গুলি ও বিস্ফোরকের শব্দ শুনতে হয় না আমাকে, যা শুনে আমি অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিলাম। আগের স্কুলের বন্ধু-বান্ধবীদের কথা মনে পড়লে খুব মন খারাপ হয়। আমার ক্লাসের কয়েকজনকে মরতে দেখেছি আমি। বেঁচে থাকা অন্যরা কোথায় এবং কীভাবে আছে সে খবর রাখার সুযোগ নেই আমার।’ ফাতিমা স্বপ্ন দেখে ডাক্তার হওয়ার। আগের স্কুলে বোকো হারামের আক্রমণের পর ডাক্তার ও নার্সদের ছুটোছুটির দৃশ্য এখনো তার চোখে ভাসে। তাদের আন্তরিকতায় মুগ্ধ হয়েই ডাক্তার হওয়াটাকে লক্ষ্য বানিয়েছে সে।
ম্যারি ও ফাতিমা তারপরেও ভাগ্যবতী; কিন্তু নাইজেরিয়ায় জয়ের মতো অসংখ্য মেয়ের লেখাপড়া শিকেয় উঠেছে। বোকো হারামের তাণ্ডবের কারণে সরকারও বাধ্য হচ্ছে অনেক স্কুল ঘোষণা দিয়ে বন্ধ রাখতে। নাইজেরিয়ায় একটি বড় অংশে তারাই যেনো সর্বেসর্বা। বিরুদ্ধে কথা বললেই নেমে আসে বিপদ। জাতিসংঘ কর্তৃক নিষিদ্ধ ঘোষিত ওই সংগঠনের নেতা-কর্মীরা চায় না মানুষ পশ্চিমা ধাঁচের শিক্ষায় শিক্ষিত হোক। গোঁড়ামি, কুসংস্কার ও কূপমণ্ডূকতা থেকে মানুষ বেরিয়ে আসলে তাদের প্রভাব যে কমে যাবে। সেজন্যই এই আগাম ব্যবস্থা— শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আগুন দেয়া, বোমা বিস্ফোরণ, অপহরণ, ধর্ষণ ও হত্যা। এসব অপরাধ করেও তারা আছে বহাল তবিয়তে।