মূল পরিকল্পনাকারী জিহাদ গ্রেফতার

একরামের নির্দেশে একই স্থানে বশ্যাকে হত্যা করেছিল জিহাদ গ্রেফতার ১৩ জন রিমান্ডে ফেনীর ফুলগাজী উপজেলা চেয়ারম্যান একরামুল হক একরাম হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী জাহিদ চৌধুরী ওরফে জিহাদ চৌধুরীকে গতকাল সন্ধ্যায় পুলিশ গ্রেফতার করেছে। এ নিয়ে একরাম হত্যাকাণ্ডে গ্রেফতারের সংখ্যা ১৪। তবে তার এ গ্রেফতার নিয়ে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব শুরু হয়েছে। তার নির্দেশে একরামকে হত্যার মিশন সফলকারীদের মধ্যে অন্যতম কমিশনার ঢাকায় র্যাব-১ এর হাতে গ্রেফতার হন। তারা হত্যাকাণ্ডের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পরিকল্পনাকারী ও হত্যার মোটিভ সম্পর্কে বিস্তারিত র্যাবের কাছে প্রকাশ করে দেন। মূল পরিকল্পনাকারী জিহাদ চৌধুরী ও কাউন্সিলর শিবলুসহ কয়েকজনের নাম প্রকাশ করে দেয় কিলাররা। তাদের গ্রেফতারে র্যাব তত্পর শুরু করে। একরামকে হত্যা করার পর ৫ দিন ধরে মূল পরিকল্পনাকারী জিহাদ চৌধুরী ও শিবলু ফেনী শহরে ঘুরে বেড়ান। শিবলু তার বাড়িতে অবস্থান করেন। পুলিশ তাদের গ্রেফতারে কোন উদ্যোগ নেয়নি-এমন অভিযোগ স্বজনদের। র্যাবের পক্ষ থেকে শিবলুকে গ্রেফতারে অভিযান শুরুর ১৫ মিনিট আগে ফেনী সদর থানায় গিয়ে গত শনিবার বিকাল সোয়া ৩টায় তিনি আত্মসমর্পণ করেন। গতকাল সন্ধ্যা ৭টায় জিহাদ চৌধুরীকে ফেনী শহরের বাড়াইপুর চেকপোস্টে তল্লাশিকালে পুলিশ গ্রেফতার করে বলে পুলিশ সুপার পরিতোষ ঘোষ জানান। এলাকাবাসী ও তাদের ঘনিষ্ঠ দুই ব্যক্তি জানান, পুলিশের সঙ্গে আলাপ আলোচনা করে শিবলু ও জিহাদ চৌধুরী ধরা দেন। পুলিশ বরাবর তাদের সহযোগিতা করে আসছে। একরামকে প্রকাশ্যে হত্যা করার পর দুই মূল পরিকল্পনাকারী কি করে ফেনী শহরে ঘুরে বেড়ায়? এই প্রশ্ন স্বজনহারাদের। জিহাদ চৌধুরী ও শিবলুর চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, বালু মহাল থেকে কোটি কোটি টাকার বালু অবৈধভাবে উত্তোলন করে বিক্রি, মাদকদ্রব্য ও অস্ত্রের ব্যবসার ভাগ ফেনী পুলিশ প্রশাসনের একশ্রেণির কর্মকর্তা নিয়মিত পেয়ে আসছিলেন। তারা এখন তাদের রক্ষার কাণ্ডারি হিসাবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন বলে ফেনীবাসীর অভিযোগ। বর্তমান ফেনী পুলিশ দিয়ে স্মরণকালের বর্বোচিত একরাম হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত ও কিলারদের গ্রেফতার সম্ভব নয় বলে অনেকে দাবি করেছেন। গ্রেফতারকৃত ১৪ জনের ৪ জনকে গতকাল ফেনীর জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট খায়রুল আমিনের আদালতে ৭ দিনের রিমান্ড আবেদন করলে আদালত ৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। এরা হলেন আনোয়ার হোসেন, আলাউদ্দিন, ইকবাল ও শাখায়াত হোসেন। অপর ৯ জনকে একই আদালতে তদন্তকারী কর্মকর্তা ১০ দিনের রিমান্ডের আবেদন করলে ৮ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করা হয়। এই ৯ জনের মধ্যে রয়েছেন ঢাকায় র্যাব-১ এর হাতে গ্রেফতার ৭ কিলারসহ ৮ জন এবং ফেনী পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণকারী কাউন্সিলর শিবলু। ৮ জনের মধ্যে রয়েছেন আবিদুল ইসলাম আবিদ (২৫), কাজী শানান মাহমুদ (২৩), চৌধুরী নাফিজ উদ্দিন (২০), সাজ্জাদুল ইসলাম পাটোয়ারী ওরফে সিফাত (২৩), জাহিদুল ইসলাম ওরফে সৈকত (২২), মো. শাহজালাল ওরফে শিপন (২২), হেলাল উদ্দিন (২৩)। একরাম হত্যাকাণ্ডে জড়িত কিলার গ্রেফতার হলেও হত্যার সময় ব্যবহূত অস্ত্র, গাড়ি, রামদা, চাপাতিসহ কোন আলামত গতকাল রাত ৯টা পর্যন্ত পুলিশ উদ্ধার করতে পারেনি। যে স্থানে একরামকে হত্যা করা হয়, সেখানেই যুবলীগ কর্মী বশ্যাকে খুন করে জিহাদ স্থানীয় পুলিশ কর্মকর্তা ও এলাকাবাসী জানান, ১৯৯৯ সালে ফেনী একাডেমি রোডের বিলাশী সিনেমা হলের সামনে জিহাদ চৌধুরী যুবলীগ কর্মী বশ্যাকে গুলি করে হত্যা করেন। একরামের নির্দেশে জিহাদ চৌধুরী বশ্যাকে হত্যা করেন বলে তারা জানান। সেই একই স্থানে ২০ মে জিহাদ চৌধুরী, শিবলু ও এমপির বডি গার্ড জিয়াউল আলম মিস্টারের পরিকল্পনায় উপজেলা চেয়ারম্যান একরামকে হত্যা করা হয়। কে এই জিহাদ চৌধুরী ফুলগাজী উপজেলার আনন্দপুরের বাসিন্দা মোজাম্মেল হোসেন চৌধুরীর পুত্র জিহাদ চৌধুরী। ৪ পুত্র ও ১ কন্যা মোজাম্মেল চৌধুরীর। পুত্র জিহাদ চৌধুরী এসএসসি পরীক্ষা দেয়নি। মাদ্রাসার পিয়নের চাকরি করতেন মোজাম্মেল হোসেন চৌধুরী। চাকরিচ্যুত হয়ে তিনি এখন চা বিক্রি করেন। একরাম ও জিহাদ চৌধুরী জয়নাল হাজারির দলীয় ক্যাডার ছিল। ফেনীর গডফাদার হিসেবে আলোচিত জয়নাল হাজারিকে ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর দল থেকে আওয়ামী লীগ বহিষ্কার করে। এরপর ফেনীতে জয়নাল হাজারির সাম্রাজ্যের পতন ঘটে। উত্থান ঘটে নিজাম হাজারির। জিহাদ চৌধুরীসহ ক্যাডাররা নিজাম হাজারির ছত্রছায়ায় চলে যায়। ক্যাডার হিসাবে জিহাদ চৌধুরীর সফলতা বেশি। এ কারণে তার এক ভাইকে ঢাকা ব্যাংকে চাকরি দেয়া হয় উপহার হিসেবে। ক্যাডার হিসেবে সন্ত্রাসীসহ টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি ও হত্যাকাণ্ডে একের পর এক সফল হওয়ায় জয়নাল হাজারির সময় জাহিদ চৌধুরী নামের পরে জিহাদ চৌধুরী উপাধি দেয়া হয়। ফুলগাজী আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক পদ জিহাদ চৌধুরী গডফাদারের আশীর্বাদে দখল করে নেন। একই উপজেলার সভাপতি একরাম। গত ইউপি নির্বাচনে ফুলগাজী উপজেলার আনন্দপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান প্রার্থী হতে চেয়েছিলেন জিহাদ চৌধুরী। তাকে একরাম মনোনয়ন না দিয়ে ব্যবসায়িক পার্টনার হারুন অর রশীদকে মনোনয়ন দেন। এ নিয়ে দ্বন্দ্ব একরামের সঙ্গে জিহাদ চৌধুরীর। যেভাবেই হউক জিহাদ চৌধুরী একরামকে উপযুক্ত জবাব দেবেন এ কথা কয়েকজন দলীয় কর্মীর কাছে জিহাদ চৌধুরী ঐ সময় বলেছিলেন। দ্বন্দ্বের কারণে জিহাদ চৌধুরীকে একরাম দল থেকে বহিষ্কার করেন। নিজাম হাজারি জিহাদ চৌধুরীর সেই বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করেন। ২০ মে পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী ৪০ জনের অধিক সশস্ত্র ক্যাডার বাহিনী দিয়ে গুলি করে একরামকে হত্যা করা হয়। এরপর গাড়িসহ তার লাশ ভস্মীভূত করে দেয়া হয়। এটাও পরিকল্পনার অংশ ছিল। জিহাদ চৌধুরী দ্বন্দ্ব ও আধিপত্য নিয়ে ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটান লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে। জাহিদ চৌধুরী গ্রেফতার হওয়ায় হরতাল স্থগিত ফেনী প্রতিনিধি জানান, গতকাল সন্ধ্যা ৭টার দিকে ফেনী থানা পুলিশ উপজেলা চেয়ারম্যান একরাম হত্যার প্রধান পরিকল্পনাকারী জাহিদ হোসেন চৌধুরী ওরপে জিহাদকে বারাহীপুর এলাকা থেকে গ্রেফতার করে ফেনী থানায় নেয়। রাত পৌনে ৯টায় ফেনীর পুলিশ সুপার পরিতোষ ঘোষ সাংবাদিকদের এক প্রেস ব্রিফিংয়ে বলেন, গ্রেফতারকৃত জাহিদ চৌধুরীর কাছ থেকে আমরা আরো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাবো বলে আশা করছি। এদিকে একরাম হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে আজ সোমবার ফুলগাজী উপজেলায় সকাল-সন্ধ্যা হরতাল পালনের দলীয় কর্মসূচি ছিল। মূল পরিকল্পনাকারী জিহাদ চৌধুরী গ্রেফতার হওয়ায় ঐ কর্মসূচি স্থগিত ঘোষণা করা হয়। ছাগলনাইয়ায় একরাম হত্যাকারীদের বিচারের দাবিতে সংবাদ সম্মেলন ছাগলনাইয়া (ফেনী) সংবাদদাতা জানান, একরাম হত্যার সঙ্গে জড়িতদের গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে গতকাল রবিবার সকালে ছাগলনাইয়া উপজেলা আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের উদ্যোগে স্থানীয় ডাক বাংলোয় এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে ছাগলনাইয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও উপজেলা চেয়ারম্যান মেজবাউল হায়দার চৌধুরী সোহেল বলেন, একরাম হত্যাকাণ্ড হচ্ছে ইতিহাসের একটি জগন্যতম ঘটনা। আমরা এই হত্যার সঙ্গে জড়িতদের গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাচ্ছি।