নমো ম্যাজিক!

তালেব রানা

 

ভারতের লোকসভা নির্বাচনে দোর্দণ্ড দাপট দেখিয়েছে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দল বিজেপি ও তাদের জোট ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক অ্যালায়েন্স (এনডিএ)। আর এই দাপুটে জয়ে দ্বিতীয়বারের মতো ভারতের প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন মোদি। সবার ধারণাকে ভুল প্রমাণ করে এবার ৩০৩ আসনে এককভাবে জয় পেয়েছে বিজেপি। আর এনডিএ জোট পেয়েছে ৩৫৩টি আসন। অন্যদিকে প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস পেয়েছে মাত্র ৫২টি আসন। ইউপিএ জোট পেয়েছে ৯০টি। অন্যান্য দল পেয়েছে ৯৯ আসন। ভারতের ১৭টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে একটি আসনও পায়নি কংগ্রেস। এমনকি রাজ্য সরকারে থাকা সত্ত্বেও ওই রাজ্যে আসন পায়নি তারা। বলা হচ্ছে, প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী হিসেবে নরেন্দ্র মোদির ওপরই আস্থা রেখেছে ভারতের জনগণ। এ কারণেই বিপুল ব্যবধানে জয়ী হয়েছে তার দল। বিরোধী দলগুলো সম্মিলিতভাবে বাক্যবাণে মোদিকে আক্রমণ করলেও সেগুলো হালে পানি পায়নি। ভারতের অনেক মিডিয়া বিজেপির এই অভাবনীয় সফলতাকে ‘নমো ম্যাজিক’ বা নরেন্দ্র মোদির যাদু বলে উল্লেখ করেছে।

নির্বাচনের আগে করা বিভিন্ন জরিপের ফলে বলা হচ্ছিলো, প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী হিসেবে যে কোনো বিরোধী দলীয় নেতার চেয়ে অনেক বেশি ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছেন মোদি। বিরোধীরা এবারের নির্বাচনে কোনো প্রধানমন্ত্রী প্রার্থীর নামই ঘোষণা করেনি। এই বিষয়টিকে কাজে লাগিয়েছে বিজেপি। নির্বাচনী প্রচারণায় নিজের ইমেজকে খুব ভালোভাবে কাজে লাগিয়েছেন নরেন্দ্র মোদি। একটি বিষয় ভারতীয়দের তিনি বোঝাতে পেরেছেন যে, একটি নিরাপদ, শক্তিশালী ও দারিদ্র্যমুক্ত ভারত গড়তে তার বিকল্প কেউ নেই। যে কারণে হিন্দুত্ববাদীর গন্ধ থাকা সত্ত্বেও অনেক মুসলিম অধ্যুষিত আসনে জয় পেয়েছে বিজেপি। এমনকি ২৩ মে ভোটের ফল ঘোষণার দিন মুসলিম পরিবারে জন্ম নেওয়া এক ছেলে সন্তানের নাম রাখা হয়েছে নরেন্দ্র মোদি।

অন্যদিকে ২০১৪ সালের মতো এবারো ভরাডুবি হয়েছে ভারতের সবচেয়ে পুরনো রাজনৈতিক দল কংগ্রেসের। খারাপ ফলের কারণে কংগ্রেসের সঙ্গে সঙ্গে বড় ধাক্কা খেয়েছেন দলটির সভাপতি রাহুল গান্ধীও। একইসঙ্গে চুরমার হয়ে গেছে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর জোট সরকার গঠনের স্বপ্ন। নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর মমতা ব্যানার্জি, মায়াবতী, চন্দ্রবাবু নাইডুর মতো নেতারা মুখ থুবড়ে পড়েছেন। আগামী ৩০ মে দ্বিতীয় মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিতে পারেন নরেন্দ্র মোদি।

এবারের নির্বাচনে উত্তরপ্রদেশের বেনারস আসনে চার লাখ ৮০ হাজার ভোটের ব্যবধানে জয়লাভ করেন মোদি। বিজেপি জোটের নিরঙ্কুশ জয় নিশ্চিত হওয়ার পর এক টুইট বার্তায় মোদি বলেন, এ জয় ভারতের। একসঙ্গেই এগিয়ে যাব। একসঙ্গেই উন্নতি করবো। একসঙ্গেই শক্তিশালী ভারত গড়বো। এরপর বিজয় ভাষণে তিনি বলেন, এই ভিখারির ঝুলি ভর্তি করে দিয়েছেন দেশবাসী, আপনাদের আশা-আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে আমি সব সময় থাকবো। গণতন্ত্র, সংবিধানের মর্যাদা রক্ষা করবো। সবার সঙ্গে কাঁধ মিলিয়ে আমরা কাজ করবো। নরেন্দ্র মোদির সরকারের এই বিপুল বিজয়ের কারণ কি? বলা হচ্ছে, গরিববান্ধব কর্মসূচির মাধ্যমে জনগণের সঙ্গে ভালোভাবে সম্পৃক্ত হতে পেরেছেন নরেন্দ্র মোদি। ভোটের প্রচারণায় মোদির ব্যক্তিত্ব মানুষের কাছে তাকে অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য করে তুলেছিল। মোদির হিন্দুত্ব জাতীয়তাবাদও তার জয়ের অন্যতম একটি কারণ। গত ফেব্রুয়ারিতে পাকিস্তানের বালাকোটে ভারতীয় বিমান বাহিনীর হামলা মোদির শক্তিশালী ভাবমূর্তি তৈরি করেছে। এছাড়া বিরোধী দলগুলো নরেন্দ্র মোদির বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তুললেও জনগণ তা আমলে নেয়নি। সবচেয়ে বড় কথা হলো, প্রধানমন্ত্রী পদে তার বিকল্প কোনো প্রার্থীকে সামনে আনতে পারেনি বিরোধীরা। যার ফলে সহজ জয়ে আবারো দিল্লির মসনদে বসছেন মোদি। 

তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, বড় জয়ে ক্ষমতায় আসার পর মোদি সরকারের জন্য দায়িত্ব এবং চাপ দুটোই বেড়ে গেছে। নতুন সরকারের কাছে অন্যতম চ্যালেঞ্জ হবে কোটি কোটি ভারতীয় বেকারের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা। এছাড়া কৃষকদের আয় বৃদ্ধি ও ব্যাংকিং খাতকে পুনরুজ্জীবিত করা তাদের জন্য অন্যতম চ্যালেঞ্জ। আর প্রধানমন্ত্রী মোদি দেশকে ঐক্যবদ্ধ করার প্রতিশ্রুতি দিলেও এটা সহজ হবে না। কারণ বিজেপির প্রচারণা সব সময় বিভক্তিমূলক। যে কারণে ভারতের মুসলিমরা আশঙ্কা প্রকাশ করছে যে, তাদেরকে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হিসেবে বিবেচনা করা হতে পারে। তবে জয়ের পর মোদির বক্তব্যে একটু হলেও আশার আলো দেখছেন সংখ্যালঘুরা।