ব্রেক্সিটে আগমন ব্রেক্সিটেই গমন

এম এ আলআমিন

 

পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টেরেসা মে। ব্রেক্সিট বা ইইউ থেকে ব্রিটেনের বেরিয়ে যাওয়ার গণভোট তাকে প্রধানমন্ত্রীর পদে এনেছিল। সেই ব্রেক্সিটই শেষ পর্যন্ত ক্ষমতা থেকে তার গমনের কারণ হয়ে দাঁড়াল। প্রায় তিন বছর প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে পুরো সময়টুকু তাকে ব্রেক্সিট ইস্যু ছাড়াও দলীয় বিশৃঙ্খলা কাটাতে ব্যয় করতে হয়েছে। এজন্য জ্বালানি, কর্মসংস্থান, অভিবাসন ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ইস্যুর দিকে তিনি নজর দিতে পারেননি।

তার প্রধানমন্ত্রী পদে থাকার সময়টুকু ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখা হবে না, এটাই স্বাভাবিক। এমনকি তার ঘনিষ্ঠজনরাও একে সুখকর স্মৃতি হিসেবে মনে রাখবেন না। ২৪ মে সকালে মে ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটের বাইরে ৭ জুন পদত্যাগ করবেন জানিয়ে ভাষণটি দেন। এটি ছিল এক আবেগঘন বক্তৃতা। মে বলেন, তিনি এমন পরিস্থিতির শিকার হয়েছেন যার ওপর তার কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না। তিনি দেশের জন্য তার সাধ্যমতো সেরাটা করেছেন দাবি করে বলেন, ‘আমি ব্যর্থ হয়েছি’। ব্রেক্সিট চুক্তি প্রথমে ব্রাসেলসের নেতৃবৃন্দ অনুমোদন করেন, এরপর সেটি পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ হাউস অব লর্ডসেও  পাস হয়। কিন্তু নিম্নকক্ষ হাউস অব কমন্সে পাস করাতে গিয়েই ঘটে যত বিপত্তি। চলতি বছর জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত কয়েকবার চেষ্টা করেও তিনি সফল হতে পারেননি। এক্ষেত্রে নিজ দলের এমপিদের কাছ থেকেই তিনি সবচেয়ে অসহযোগিতার মুখে পড়েন। তারা তার সঙ্গে কিছুতেই সমঝোতা করতে রাজি হয়নি। কারণ সমঝোতা মনে দৃষ্টিতে পরাজয় মেনে নেয়। পদত্যাগের ভাষণের পর মে সামান্যতম সহানুভূতিও কারও কাছ থেকে পাননি। ব্রেক্সিট প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারেন নাই। কিন্তু এই প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য যা কিছু করেছেন তার জন্য তিনি ধন্যবাদ পেতে পারতেন কিন্তু দলের সহকর্মীরা এ ব্যাপারে চরম নিস্পৃহ মনোভাব দেখিয়েছেন।            তাদের আচরণ দেখে মনে হয়েছে মে’র সমানে একটিই করণীয় ছিল, তিনি সেটি করতে ব্যর্থ হয়েছেন।

মে পদত্যাগের দিনক্ষণ ঘোষণা করায় অনেকেই এখন তার স্থলাভিষিক্ত হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। শনিবার এ বিষয়ে জোর তত্পরতা শুরু হয়। ২০ জুলাইয়ের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত করবেন কনজারভেটিভ পার্টির নেতারা। ইউরোপীয়           ইউনিয়ন থেকে ব্রিটেনের বেরিয়ে যাওয়ার নির্ধারিত তারিখ ৩১ অক্টোবর। বাজিকরদের কাছে প্রধানমন্ত্রীর দৌড়ে সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী বরিস জনসন সাবেক ব্রেক্সিটমন্ত্রী ডোমিনিক রাবের চেয়ে অনেকটাই এগিয়ে রয়েছেন। দুজনই নো-ডিল ব্রেক্সিট সমর্থক। ১০ জুন পর্যন্ত টোরি এমপিরা তাদের প্রার্থিতা ঘোষণা করতে পারবেন। ৬ কোটি ৬০ লাখ জন অধ্যুষিত যুক্তরাজ্যের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হবেন কনজারভেটিভ পার্টির সদস্যদের ভোটে। গত বছরের মার্চের হিসাব অনুযায়ী দলটির এক লাখ ২৪ হাজার নিবন্ধিত সদস্য রয়েছেন যারা পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী বাছাই করবেন।

২০১৬ সালের ২৩ জুন যে গণভোট হয় তাতে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পক্ষে ৫২ শতাংশ ভোট পড়ে। ওই গণভোটের পর প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দেন ডেভিড ক্যামরেন। দায়িত্ব গ্রহণ করেন তার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী টেরেসা মে। তিনি এই প্রক্রিয়াকে অনেকদূর এগিয়ে আনেন। সব ঠিকঠাক থাকলে ২৯ মার্চ প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হয়ে যেত। কিন্তু পরিস্থিতি এখন অনিশ্চিয়তার দিকে মোড় নিচ্ছে। ২০ মার্চ জনগণের উদ্দেশে মে বলেন, ‘আমি বুঝতে পারি ব্রেক্সিট নিয়ে পার্লামেন্টে যা হচ্ছে তাতে আপনারা চরমভাবে বিরক্ত’। এমপিদের ওপর বিচ্ছেদের সময় পেছানোর দায় চাপিয়ে মে বলেন, তাদের অনিচ্ছার কারণে এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তবে তিনি জনগণেরে পক্ষে আছেন বলে ঘোষণা দেন। মে তার উইথড্রল চুক্তিতে সমর্থন দেওয়ার জন্য এমপিদের প্রতি পুনরায় আহ্বান জানান। এখানে উল্লেখ্য মে নিজেও রিমেইন বা ইইউর সঙ্গে থাকার পক্ষে ভোট দিয়েছিলেন। কারণ রিমেইনের পক্ষে ছিল ক্যামেরনের সরকার। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর মে এমনভাবে দৌড়ঝাঁপ শুরু করেন মনে হচ্ছিল জনরায় বাস্তবায়নের দায়িত্ব তার একারই। দলের সঙ্গে তার কাজের একটা সমন্বয়হীনতা সব সময়ই ছিল।