ঠাকুরগাঁওয়ে নেমে যাচ্ছে ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর

পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর ইউক্যালিপটাস গাছের সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। কৃষকরা অনেকটা না জেনেই এই গাছ, কৃষিজমির পাশে, বাড়ির আঙিনায় ও রাস্তার পাশে ব্যাপকভাবে রোপণ করছেন। ফলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় সেচ ব্যবস্থা নিয়ে বিপাকে পড়েছেন ঠাকুরগাঁওয়ের চাষিরা। কৃষক সামশুল হক জানান, গত বছর জমির আইলে ৫ শতাধিক ইউক্যালিপটাস রোপণ করেছি। তারপর থেকে ক্ষেতে আর পানি থাকে না। গতবার থেকে দিন দিন ফসলের উত্পাদন কমে যাচ্ছে। আর এক কৃষক নিতাই চন্দ্র বলেন, এই গাছ কম সময়ে অনেক বড় হয়। তাই বাড়ির আশে পাশে কয়েক শতাধিক গাছ লাগিয়েছি। কিন্তু পুকুর ও টিউবওয়েলের পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। এ বিষয়ে ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজের উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের প্রধান প্রফেসর আব্দুল গাফফার বলেন, ইউক্যালিপটাস গাছ আশেপাশে প্রায় ১০ ফুট এলাকার পানি শোষণ করে এবং আকাশে উড়িয়ে দেয়। এই গাছ রাত-দিন ২৪ ঘণ্টা পানি শোষণ এবং বাতাসে ছেড়ে দেয়। জমির আইল, কৃষি জমি ও পতিত জমিতে এই গাছ লাগানোর কোন মানে নেই। বরং ক্ষতিকর। এই গাছের আশেপাশে কোন গাছ জন্মাতে পারে না। তিনি আরও বলেন, ইউক্যালিপটাস গাছ ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নামিয়ে দেয়। যা পানির উত্সকে নিঃশেষ করে দিচ্ছে। এই গাছে কোন পাখি বাসা বাঁধে না। পানির স্তর কমানোর সঙ্গে সঙ্গে ইউক্যালিপটাস জমির উর্বরতা শক্তি নষ্ট করছে। এই গাছের রেনু নিঃশ্বাসের সাথে দেহে প্রবেশ করলে এ্যাজমা হয়। এই গাছের পাতা মাটির জন্য ক্ষতিকর। মাটিতে পাতা পড়ার পর পচনেও অপেক্ষাকৃত বেশি সময় লাগে। এটি খুব দ্রুত বাড়ে ও অন্য গাছের চেয়ে বেশি খাবার খায়। তিনি বলেন, ইউক্যালিপটাস গাছ কেটে ফেলে মাটির উর্বরতা ফিরে আসতে দীর্ঘ সময় লাগে। কৃষি জমি ও বাড়ির আঙ্গিনায় ইউক্যালিপটাস গাছ বর্জন করা উচিত। এর পরিবর্তে অধিক পরিমাণে ফলদ ও বনজ বৃক্ষ রোপণ করা উচিত। অভিযোগ রয়েছে, কিছু নার্সারী চাষী ঠাকুরগাঁও জেলার বিভিন্ন উপজেলাসহ গ্রামাঞ্চলে এগুলো বিক্রি করছে। দেখতে খুবই সতেজ এই চারাগুলো। কৃষকরা কেনা বেচা শেষে বাড়ি ফেরার পথে এই গাছের চারা নিয়ে জমির আইল ও ক্ষেতের পাশে এবং পতিত জমিতে রোপণ করছেন। শিক্ষাবিদ প্রফেসর মনতোষ কুমার দে জানান, কৃষি জমি ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার জন্য পানি খেকো গাছের চারা উত্পাদন ও লাগানো বন্ধে সরকারিভাবে উদ্যোগ নিয়ে রোপণ বন্ধে প্রচার-প্রচারণা চালাতে হবে। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার জন্য ফলদ ও ঔষধি গাছ রোপণের পাশাপাশি ইউক্যালিপটাস গাছের ক্ষতির দিকগুলো চাষিসহ আপামর জনগণকে জানাতে হবে। ঠাকুরগাঁও কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপ-পরিচালক কমল কুমার সরকার বলেন, ইউক্যালিপটাসের মতো বিদেশি প্রজাতির গাছ রোপণের ভাবনাটা সম্পূর্ণরূপে অনৈতিক। এটি ম্যানগ্রোভের পরিবেশের সঙ্গে বৈরি স্বভাব প্রদর্শন করে। ইউক্যালিপটাস অন্যান্য গাছে চেয়ে বেশি খাবার খায় ও অক্সিজেন শোষণ করে এবং কার্বন-ডাই অক্সাইড ত্যাগ করে, পরিবেশবান্ধব না হওয়ায় কোনো পাখিও বাসা বাঁধে না।