আওয়ামী লীগ নেতা বেলালের বাড়ি ভাংচুর, আগুন
প্রকাশ : ২৬ মে ২০১৪, ২৩:০৭
ফেনীর ফুলগাজী উপজেলার চেয়ারম্যান একরামুল হক একরামকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা এবং তার গাড়িসহ লাশ পুড়িয়ে ঘটনাস্থল থেকে বীরদর্পে যার যার বাসায় চলে যায় খুনিরা। তারা আত্মগোপন না করে প্রকাশ্যে ফেনী শহরে ঘুরে বেড়ায়। পুলিশসহ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী তাদের দেখেছে। একরাম হত্যাকাণ্ডের পর তার পরিবারকে সমবেদনা জানাতে এমপি নিজাম হাজারী ঢাকা থেকে হেলিকপ্টারে করে দুপুরে ফেনী শহরের পাইলট হাইস্কুল মাঠে অবতরণ করেন। সঙ্গে ছিলেন আওয়ামী লীগ নেতা আলাউদ্দিন নাসিম। হত্যার পরিকল্পনাকারী জিহাদ চৌধুরী, কাউন্সিলর শিবলু, এমপির বডিগার্ড মিস্টার এবং হত্যার মিশনে সরাসরি অংশগ্রহণকারীরা এমপিকে স্বাগত জানায়। সেখান থেকে তাকে ফেনী শহরে বাসভবনে নিয়ে যায় খুনিরা। পুলিশ কর্মকর্তারাও এ সময় উপস্থিত ছিলেন। একরামের লাশ চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ মর্গে ডিএনএ পরীক্ষা শেষে ফেনীতে ঐদিন রাত ১১টায় আনা হয়। এমপি নিজাম হাজারী একরামের লাশের ভস্মীভূত অংশ দেখতে বাসায় যান। সঙ্গে ঐসব পরিকল্পনাকারী ও খুনিরাও একরামের ভস্মীভূত লাশ দেখতে যায়। গভীর রাত পর্যন্ত পরিকল্পনাকারী ও খুনিরা এমপি নিজাম হাজারীর সঙ্গে ছিল। পুলিশ কর্মকর্তারা তা দেখেছেন।
একরামকে হত্যা করে পরিকল্পনাকারী ও খুনিরা এমপি ও পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে অবস্থান করতে দেখে ফেনীবাসী হতভম্ব। হত্যাকাণ্ডের পর স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন, গোয়েন্দা সংস্থাসহ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী এবং স্থানীয় দলীয় নেতারা খুনিদের কথা জানতে পেরেছেন। ফেনীবাসীর ও স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের পরিচিত এসব খুনি প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ানোর কথা এখন ফেনীর ঘরে ঘরে উচ্চারিত হচ্ছে।
নারায়ণগঞ্জের সিটি কর্পোরেশনের কাউন্সিলর নজরুল ইসলাম ও আইনজীবী চন্দন সরকারসহ সাতজনকে অপহরণ করে হত্যা করে লাশ গুম করার ঘটনা নিয়ে প্রশাসনে তোলপাড়, দেশব্যাপী ক্ষোভ ও হতাশা। এ সাত হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে দলীয় কোন্দল ও আধিপত্য কারণ। এ ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতে ২৩ দিনের মাথায় ২০ মে ফেনী শহরে ফুলগাজী উপজেলার চেয়ারম্যানকে একই কারণে গুলি করে হত্যার পর লাশ পুড়িয়ে ভস্মীভূত করে। একটি ঘটনার পর কত বড় দুঃসাহস হলে দলীয় ক্যাডার বাহিনী উপজেলা চেয়ারম্যান একরামকে প্রকাশ্যে জনসম্মুখে খুন করে। এরা দলীয় লোক নয়। রাজনৈতিক লেবাসে টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি ও খুন-খারাবি করে কোটি কোটি টাকা কামিয়ে নেয়ার পার্টি। এ সমস্ত চিহ্নিত দলীয় লেবাসধারী ক্যাডারদের বিরুদ্ধে সময় থাকতে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার জন্য ফেনীর সর্বস্তরের মানুষ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে দাবি জানিয়েছেন। গতকাল সোমবার সকালে র্যাব-১ এর একটি বিশেষ দল গাজীপুর চৌরাস্তা থেকে একরাম হত্যাকাণ্ডের অন্যতম পরিকল্পনাকারী ও খুনি স্বপন ও জাহিদুল ইসলাম জাহিদকে গ্রেফতার করে। তারা উপজেলা চেয়ারম্যান হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা এবং সরাসরি হত্যা মিশনে অংশ নেয়ার কথা র্যাবের কাছে স্বীকার করেছে। স্বপন বিএনপি কর্মী এবং জাহিদ আওয়ামী লীগ কর্মী বলে র্যাবকে জানায়। গতকাল অপরাহ্নে র্যাব-১ একরাম হত্যা মামলার ফেনী সদর থানার কর্মকর্তার কাছে গ্রেফতারকৃত স্বপন ও জাহিদকে হস্তান্তর করে। একরাম হত্যাকাণ্ডে ১৩ জন খুনিকে রিমান্ডে নিয়ে পুলিশ ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করছে।
জিহাদ চৌধুরী ৮ দিনের রিমান্ডে
ফেনী প্রতিনিধি জানান, সোমবার বিকাল ৪টায় সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট খায়রুল আমিনের আদালতে একরামকে হত্যার অন্যতম আসামি জাহিদ হোসেন চৌধুরী ওরফে জিহাদ চৌধুরীকে পুলিশ ১০ দিনের রিমান্ডের আবেদন চেয়ে আদালতে উঠালে আদালত তার ৮ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে। অপরদিকে তদন্তকারী কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদ সাংবাদিকদের প্রেস ব্রিফিংয়ে বলেন, রিমান্ডের মাধ্যমে একরাম হত্যার আসল তথ্য উদঘাটিত হবে। প্রাপ্ত তথ্য সাংবাদিকদের জানানো হবে বলে তিনি জানান।
আওয়ামী লীগ নেতা বেলাল ও তার ভাইয়ের বাড়িতে দুর্বৃত্তদের আগুন
ফুলগাজীর আনন্দপুর গ্রামে একরাম হত্যার জের ধরে উক্ত ইউনিয়ন পরিষদ মেম্বার ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বেলাল হোসেনের বাড়িতে ৩০-৪০ জনের দুর্বৃত্ত দল অস্ত্র ও ধামা- কিরিছ নিয়ে বেলা সাড়ে ১১টার সময় হামলা করে এবং প্রকাশ্য দিবালোকে সন্ত্রাসীরা বেলাল হোসেন ও তার ভাইয়ের ৪টি বিল্ডিংয়ের প্রত্যেকটি রুমে গান পাউডার ছিটিয়ে আগুন জ্বালিয়ে দেয় এবং স্টিলের আলমারী ভেঙ্গে নগদ টাকা পয়সা ও স্বর্ণালঙ্কার লুট করে নিয়ে গেছে বলে বেলাল হোসেনের ভাই আব্দুল গোফরান জানান।
বেলাল হোসেনের ভাই আব্দুল গোফরান অভিযোগ করে বলেন, যে সকল সন্ত্রাসী তাদের বাড়িতে আক্রমণ করেছে তারা একরামের সমর্থক বলে তারা চিনতে পেরেছে। তিনি বলেন, একরাম হত্যার আগের দিনও বেলাল একরামের সাথে চলাফেরা করেছিল। এদিকে ফুলগাজী থানার ভারপ্রাপ্ত অফিসার ইনচার্জ মাসুদ উদ্দিন ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন এবং সন্ত্রাসীদের গ্রেফতারে তত্পরতা চালান। ক্ষতিগ্রস্তরা থানায় মামলা করার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানান।
হত্যাকাণ্ডের সাথে ছাত্রদল জড়িত দাবি ছাত্রলীগের
পরশুরাম (ফেনী) সংবাদদাতা জানান, একরাম হত্যার ঘটনায় ফেনী জেলা ছাত্রলীগকে জড়িয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হওয়ার প্রতিবাদে সোমবার দুপুরে শহরের ট্রাংক রোডস্থ দলীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করেছে জেলা ছাত্রলীগ।
জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শাহাদাত হোসেন রিন্টু এক লিখিত বক্তব্যে জানান, একরামুল হক একরামকে যারা নির্মমভাবে খুন করেছে এবং যাদেরকে আটক করা হয়েছে তাদের মধ্যে কেউ ছাত্রলীগের নেতাকর্মী নেই। যারা এই হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত তারা ছাত্রদল, যুবদলসহ বিভিন্ন অংগ সংগঠনের নেতাকর্মী। ছাত্রলীগের ভাবমূর্তি ও সুনাম নষ্ট করার জন্য একটি কুচক্রী মহল ষড়যন্ত্র করছে। আমরা এই হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করছি।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি জহিরুল ইসলাম জুয়েল জানান, সরকার যদি চায় বিচার বিভাগীয় তদন্তের মাধ্যমে খুনিদের চিহ্নিত করে শাস্তি দিলেও আমাদের আপত্তি নেই।