ডিজিটাল কন্টেন্ট টুকিটাকি

১৯৯৯ সালের কথা। দিন তারিখ মনে নেই। বি এ এফ শাহীন কলেজ, চট্টগ্রামে দ্বাদশ শ্রেণির নেপচুন শাখায় পেছনের বেঞ্চে বসে শ্রদ্ধেয় ফারুকী স্যারের গণিত ক্লাস করছি আমি,রাসু ও প্রীতি । স্যার যখন বোর্ড ব্যবহার করছিলেন আমরা তখন চিরকুট চালাচালি করছিলাম। সেদিনের সেই অপরাধের জন্য শ্রদ্ধেয় ফারুকী স্যারের কাছে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। স্যারের চোখে হয়তো সেদিন ধরা পড়িনি। তবে আমি স্বীকার করছি যে, আমি দুষ্ট ছিলাম। দুষ্ট ছিলাম বলেই হয়তো বা আজ মাধ্যমিকের শিক্ষক হয়ে দুষ্ট শিক্ষার্থীদের লক্ষণ ভালো বুঝতে পারি। যেখানে আমার অভিজ্ঞ অনেক সহকর্মীর পক্ষেও ক্লাস নিয়ন্ত্রণে রাখা ভীষণ কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে, সেখানে পুরো ক্লাস এমনকি পুরো স্কুল আমার ভালই নিয়ন্ত্রণে থাকে। একটা বিষয় আমার কাছে অনেক বেশী গুরুত্বপূর্ণ। সেটি হলো শিক্ষার্থীকে পাঠের প্রতি আগ্রহী করে তোলা, শিখন যাতে আনন্দদায়ক পরিবেশে হয় সেটি আগে নিশ্চিত করা। আমি হলফ করে বলতে পারি যে, আজকের ভাগ্যবান শিক্ষার্থীদের মত আমিও যদি সেদিন মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুমে বসে পাঠ গ্রহণের সুযোগ পেতাম, তাহলে নিশ্চয়ই চিরকুট চালাচালির চিন্তা আমার মাথায় আসতো না। মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুমের এই হলো সবচেয়ে বড় উপযোগিতা। শিক্ষার্থী ক্লাসে মনোযোগী থাকবেই এবং পাঠ গ্রহণে আগ্রহী হবেই। বাংলাদেশে শিক্ষার গুণগত মান বাড়াতে বর্তমান সরকার ইতোমধ্যেই নানাবিধ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। তন্মধ্যে সারাদেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম স্থাপন, প্রতিষ্ঠানগুলোকে ল্যাপটপ, মডেম, মাল্টিমিডিয়া প্রোজেক্টর ইত্যাদি প্রদান এবং প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকগণকে ক্রমান্বয়ে ডিজিটাল কন্টেন্ট ডেভেলপমেন্ট-বিষয়ক প্রশিক্ষণ প্রদান ইত্যাদি পদক্ষেপগুলো অবশ্যই প্রশংসার দাবীদার। একুশ শতকের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এগুলো অবশ্যই অত্যন্ত যুগোপযোগী পদক্ষেপ। এসকল পদক্ষেপের সঠিক বাস্তবায়নের পূর্বশর্ত হচ্ছে- প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষকগণ কর্তৃক মানসম্মত ডিজিটাল কন্টেন্ট তৈরি এবং শ্রেণিকক্ষে সেটির সঠিক উপস্থাপনা। মানসম্মত ডিজিটাল কন্টেন্ট তৈরি এখন সময়ের দাবী। কন্টেন্ট মানে শুধু এই নয় যে, পাঠ সংশ্লিষ্ট কিছু ছবি, অডিও, ভিডিও ইত্যাদি জুড়ে দিয়ে ইচ্ছেমত এনিমেশন দিয়ে কিছু পাওয়ার পয়েন্টের স্লাইড তৈরি করা। মানসম্মত কন্টেন্টের প্রতিটি ধাপে ধাপে সৃজনশীল পদ্ধতির প্রয়োগ থাকতে হবে। একই সাথে কন্টেন্ট নির্মাতাগণকেও তাদের সৃজনশীলতার পরিচয় দিতে হবে। কন্টেন্টের প্রথম স্লাইডে নিজের পরিচিতি এবং ২য় স্লাইডে বিষয় পরিচিতি দেয়ার পর ৩য় স্লাইড থেকেই শুরু হবে গুরুত্বপূর্ণ পর্ব যেখানে থাকবে শিক্ষার্থীদের মানসিক প্রস্তুতি তৈরির বিষয়। পাঠ গ্রহণের জন্য শিক্ষার্থীদেরকে মানসিকভাবে তৈরি করে নিয়ে ৪র্থ স্লাইডে গিয়ে হবে পাঠ ঘোষণা। পাঠ ঘোষণার পরবর্তী স্লাইডে থাকবে শিখনফল। আমাদের প্রশিক্ষণ চলাকালে প্রশিক্ষকবৃন্দ এই শিখনফলের উপর খুব জোর দিয়েছেন। কেননা-শিখনফলের প্রতিটি পয়েন্টের মধ্যে দিয়ে সৃজনশীল পদ্ধতির এক একটি ধাপ অতিক্রম করতে হবে। অর্থাত্ যে পাঠটি শিক্ষার্থীদের পড়ানো হবে তার উপর যেন তাদের জ্ঞান, অনুধাবন,প্রয়োগ এবং উচ্চতর চিন্তন দক্ষতা অর্জিত হয় সেদিকে লক্ষ্য রেখে শিখনফলগুলো নির্ধারণ করতে হবে। পরবর্তীতে পাঠ উপস্থাপনের ক্ষেত্রে এই শিখনফল গুলো হবে বন্দুকের টার্গেট, যেগুলোকে লক্ষ্য করে উপস্থাপনায় গিয়ে গুলি ছুঁড়তে হবে। উপস্থাপনার প্রতিটি স্লাইড তৈরি করার সময় শিক্ষককে মনে রাখতে হবে পাঠ সংশ্লিষ্ট প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য যেন শিক্ষার্থীদের সামনে কোন না কোন ভাবে উপস্থাপিত হয় এবং নির্ধারিত প্রতিটি শিখনফল প্রত্যেক শিক্ষার্থীর যেন অর্জিত হয়। এক্ষেত্রে শিক্ষককে অবশ্যই তার মেধা, বুদ্ধিমত্ত্বা এবং সৃজনশীলতার সমন্বয় ঘটাতে হবে। উপস্থাপনার জন্য শিক্ষক তার প্রয়োজনমত স্লাইড সংখ্যা নির্ধারণ করতে পারেন। তথ্য উপস্থাপনের পর শিক্ষার্থীদেরকে এমন একটি দলীয় অথবা জোড়ায় কাজ দিতে হবে যার মধ্যে দিয়ে তারা অর্জিত জ্ঞানকে বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করতে শিখবে। একটি মূল্যায়নের স্লাইড থাকবে এর পরে যেখানে শিক্ষক পরীক্ষা করে দেখবেন জ্ঞান এবং অনুধাবন স্তর প্রতিটি শিক্ষার্থী অর্জন করতে পেরেছে কিনা। সবশেষে শিক্ষার্থীদের উচ্চতর চিন্তন দক্ষতা অর্জনের লক্ষ্য মাথায় রেখে এমন একটি বাড়ির কাজ নির্ধারণ করতে হবে যেন শিক্ষার্থী বাস্তব জীবনের সাথে পঠিত বিষয়বস্তুর সংযোগ স্থাপনের সুযোগ পায়। প্রশিক্ষণের অংশ হিসেবে আমাদের প্রত্যেককে তিনটি করে কন্টেন্ট তৈরি করতে হয়েছে। বর্তমানে গণিতের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে বাস্তবতার সাথে গণিত বিষয়ের সমন্বয়সাধন। ১৪ দিন ব্যাপি নেয়া প্রশিক্ষণে আমি ষষ্ঠ শ্রেণির গণিত বিষয়ের উপর তিনটি কন্টেন্ট তৈরি করি এবং চেষ্টা করি বিষয়বস্তুর সাথে বাস্তবতার মিল রাখতে। শিক্ষক বাতায়নে কন্টেন্ট গুলো আপলোড করেছি। এছাড়াও বাতায়নে অনেক অনেক অভিজ্ঞ শিক্ষকগণের চমত্কার সব কন্টেন্ট তৈরি করা আছে। শিক্ষক বাতায়ন এদেশের শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ধীরে ধীরে এদেশে একটি আধুনিক, দক্ষ এবং সৃজনশীল শিক্ষক টিম গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। কন্টেন্ট তৈরি করতে না পারেন অন্তত এখান থেকে কন্টেন্ট ডাউনলোড করে নিয়ে শুরু করে দিননা মাল্টিমিডিয়া ক্লাস নেয়া। সরকার থেকে প্রাপ্ত প্রোজেক্টরটি সাজিয়ে না রেখে এদেশের শিক্ষার্থীদের উপহার দিন চমত্কার মাল্টিমিডিয়া ক্লাস। বাংলাদেশের মানসম্মত শিক্ষার প্রসারে আপনিও হয়ে উঠুন অগ্রগামী পথিক। মতামত জানাতে ০১৭১৪-৭০৫৭২৭, anushilon.ittefaq10 @gmail.com