দিদিমণির পাঠশালা যেন এক তীর্থক্ষেত্র

লুকিয়ে ছিল যে স্নেহস্মৃতি জাগরুক হলো সেটি হঠাত্; শ্লোক বা ছড়ার যে দিদিমণি কালকে ছাড়িয়ে অনাদিকে আলিঙ্গন করে আছে, অনুরূপ যেন আমার দিদিমণিও সর্বাঙ্গে মিশে আছে। এই দিনিমণির পাঠশালাতেই শুরু হয় আমার প্রথম পাঠ। আমার এখনো মনে হয়, আমার জন্য সেটি একটি তীর্থক্ষেত্রই ছিল। প্রাচীনকালের সেই গুরুগৃহের মতো। সবটাই একের অধীনে একের নিয়ন্ত্রণে। তবুও পরাধীন মনে হয়নি কখনো। আলোতে নিয়ে আসার নিরন্তর চেষ্টা, শ্রমের কমতি ছিল না আমার দিদিমণির। এক শিক্ষক এক পাঠশালা। অপূর্ব সম্মিলন ছিল সকল কর্মে। একটি রুমেই দশটি বেঞ্চ। দুইটি বেঞ্চে একটি শ্রেণি। তা নিয়েই দিদিমণির পাঠশালা। প্রথমেই একটু একটু টাচ দিতেন সবাইকে, তারপর প্রথম শ্রেণিতে চলে আসতেন। তাঁর এই স্পর্শে চঞ্চল প্রাণ স্থির হয়ে যেত। দিদিমণির স্বামী ঘণ্টা বাজাতেন। তার নাম আজ আর মনে করতে পারি না। একটা ঘণ্টা বাজলে বোঝা যেত প্রথম শ্রেণির ছুটি হয়েছে। ঘণ্টা শুনে বুঝতে পারতাম কোন ক্লাশের ছুটি। পাঁচটি হলে পঞ্চম। চারটি হলে চতুর্থ, তিনটি হলে তৃতীয় আর দুটি হলে দ্বিতীয়। প্রথম শ্রেণির ছুটির পর দ্বিতীয় শ্রেণিতে মনোযোগ দিতেন। এভাবেই চলত তাঁর পাঠশালা। দিদিমণির হাতে লাঠি থাকত। দিদিমণিকে ভয় করতাম। তাঁর পাঠ যত্নের সঙ্গে দায়িত্বের সঙ্গে পড়তাম। ধারাপাত, বিদ্যাসাগরের আদর্শলিপি পড়াতেন। এ-কার, আ-কার, ই-কার, ঈ-কার অর্থাত্ স্বরবর্ণের সংকেতগুলো শেখা শেষ হয়ে গেলে নাম শেখাতেন। দিদিমণির পাঠশালা বাংলাবাজারে অবস্থিত ছিল। আমরা তখন দিগবাজারে ভাড়া থাকতাম। পায়ে হেঁটেই স্কুলে যেতাম। আমাদের পাশের বাড়িতে একটি হিন্দু মেয়ে ছিল। নাম তার শিপ্রা। একসঙ্গে স্কুলে যেতাম একসঙ্গে পড়াও শিখতাম। হিন্দু বনিয়াদি পরিবার ছিল তাদের। শিপ্রার মাকে মনে হতো সাক্ষাত্ লক্ষ্মী। শিপ্রার ঠানদি ছিল। তিনি অত্যন্ত রাশভারী ছিলেন। সংস্কার ও আচারে ঢাকা ছিল ঠানদির মন। শিপ্রা আমাদের বাড়িতে সব সময় আসত। আমাকে তার বাড়িতে নিয়ে যেতে পারত না বলে তার মন ভীষণ দুঃখভরা থাকত। একদিন শিপ্রা বলল, আমি তোকে কালই আমাদের বাড়িতে নিয়ে যাব। সেজন্যে একটু কৌশল নিতে হবে। শুধু তোর নামটি বলবি প্রতিভা। তা-ই হলো। আমি প্রতিভা নামেই গেলাম। হাতে নিলাম কিছু বাকরখানি ও বুন্দিয়া। এগুলো ঠানদির পছন্দের। ঠানদি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার নাম কী? বললাম, প্রতিভা। এভাবে বেশ কিছুদিন কেটে গেল। আমিও যাই শিপ্রাও আসে। এভাবে চলল বেশ কিছুদিন। একদিন লক্ষ্মীমাতা আমাকে ডেকে বললেন, তোমাদের ঠানদি আমাকে বলেছেন তোমাকে একদিন নিমন্ত্রণ করে খাওয়াতে। ঠানদি যখন বলেছেন, আর রক্ষে নেই। তোমাকে খাওয়াবেনই তিনি। একদিন গেলাম। পাঁচফোঁড়নের নিরামিষ। ব্রাহ্মণরা যাকে অন্নব্যাঞ্জন বলে। পেট ভরে খেলাম। খাওয়ার পর বসে আছি। এমন সময় ঠানদি ঘটি হাতে স্নানের ঘরের দিকে যাচ্ছেন কোনোকিছু ধোয়া-মোছার জন্যে হয়তো। পলক ফেলতে না ফেলতেই দেখি, তিনি মাটিতে পড়ে গেলেন। আমিও তত্ক্ষণাত্ বলে উঠলাম, হায় আল্লাহ। আমি কাঁদতে শুরু করলাম। শিপ্রা ভয় পেয়ে গেল। আমরা সবাই মিলে ঠানদিকে ঘরে নিয়ে এলাম। আমি ভয়ে কাঠ হয়ে আছি। অনেকক্ষণ পর ঠানদি আস্তে আস্তে উঠলেন। তারপর ইশারায় আমাকে কাছে ডাকলেন এবং বললেন, তুই আমার চোখ খুলে দিয়েছিস, ধর্ম বড় কথা নয়। বড় কথা মানুষ আর মানসিকতা। ঠানদির এই কথাটি আমার বিশ্বাসকে অত্যন্ত বিশ্বস্ত করে তুললো। আমি বুঝলাম, আমার নতুন জন্ম হয়েছে। সাথে সাথে তাঁরও যে নবজন্ম হয়েছিল এটা আমি আঁচ করতে পেরেছিলাম। আজ থেকে তুই আর প্রতিভা নস, তুই হলি কাজী রোজি। মনে হলো, সায়াহ্নের আঁধার পেরিয়ে সূর্যের সকাল ভেসে উঠেছে। শিপ্রা আর আমি বহুদিন এ গল্পের ভেতরে ছিলাম। তারপর আমরা বদলি হয়ে গেলাম। শিপ্রাকে আর পেলাম না। অনেকদিন পর আমি ওখানে গিয়েছি, হেঁটে হেঁটে দেখেছি, ঠানদির বাড়িতে কেউ নেই ঠানদিদের। দিদিমণির পাঠশালাটিরও চিহ্ন নেই কোনোখানে। তবে এটি এখনো অনুধাবন করি, দিদিমণির শিক্ষা তাঁর দ্বিস্তরকে স্পর্শ করেছিল। নমোনমো নম দিদিমণি মম।