মানিক মিয়া : নির্ভীক সেই মানুষটির শৈশব-কৈশোর

আমরা তাঁকে নিয়ে গর্ব করতে পারি। কারণ তিনি ছিলেন সত্, সাহসী ও একজন নির্ভীক মানুষ। সারা জীবন তিনি গোঁড়ামী, শোষণ ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছেন। কলাম লিখেছেন সত্য, সুন্দর ও কল্যাণের স্বপক্ষে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর সম্পর্কে লিখেছেন: সারাটা জীবন দু’ভাই এক সাথে জনগণের অধিকার অর্জনের সংগ্রাম করেছি। ... আমি কাজ করেছি মাঠে-ময়দানে, আর মানিকভাই তাঁর ক্ষুরধার লেখনির সাহায্যে। প্রখ্যাত সাহিত্যিক ও সাংবাদিক আবুল মনসুর আহমদ লিখেছেন: ইত্তেফাকের ওপর আইয়ুবশাহী জুলুমের নজির দ্বিতীয়টি নেই। বস্তুত জনগণের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অধিকার আদায়ের সংগ্রামে মানিক মিয়ার ত্যাগ ব্যাপকতায়, সামগ্রিকতায় ও মহিমা-মর্যাদায় আমাদের উপরে। শিক্ষাবিদ ও সাহিত্যিক অধ্যাপক আবুল ফজল লিখেছেন: বিপদের মুখে তাঁর কলম যেন ক্ষুরধার হয়ে উঠতো। বিপদের মোকাবিলা করে তিনি আনন্দ পেতেন। হয়ে উঠতেন অধিকতর দুঃসাহসী। তাঁর সংগ্রামী চেতনা যেন আরো প্রদীপ্ত হয়ে উঠতো। হ্যাঁ, এই সেই মানুষটি হলেন সংবাদপত্র জগতের প্রবাদপুরুষ নির্ভীক সাংবাদিক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া। দেশের কল্যাণে, মানুষের কল্যাণে তাঁর অসাধারণ ভূমিকা ঐতিহাসিক এবং অবিস্মরণীয়। বাংলাদেশের অভ্যুদয়ে তাঁর এবং তার প্রতিষ্ঠিত দৈনিক ইত্তেফাকের ভূমিকার কথা দেশবাসী আজো ভোলে নাই। তিনি ছিলেন একজন খাঁটি বাঙালি ও অসাম্প্রদায়িক ব্যক্তি এবং এদেশের কৃতী সন্তান। তিনি বাঙালির গৌরব, বাংলাদেশের গৌরব। তিনি দেশকে প্রাণ দিয়ে ভালোবাসতেন। বেশি ভালোবাসতেন এদেশের মানুষকে। মানুষের ওপর জুলুম-নির্যাতন নেমে আসলে অস্থির হয়ে পড়তেন। প্রতিবাদ জানাতেন লেখনির মাধ্যমে। শৈশব এবং কৈশোরেও তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া ছিলেন প্রতিবাদী, জেদী ও দৃঢ়চেতা মানুষ। নিজে কখনো মিথ্যে কথা বলতেন না এবং মিথ্যে বলা সহ্য করতেন না। নিজের সিদ্ধান্তে থাকতেন অনড় ও অটল। অসীম সাহস রাখতেন বুকে। নির্ভীক ছিলেন সেই শৈশব এবং কৈশোরেও। তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার শৈশব ও কৈশোর কেটেছে প্রকৃতির শ্যামল ছায়ায় ঘেরা গ্রামে। গ্রামবাংলার অন্যসব গ্রামের মতোই ছিলো তাঁদের গ্রাম। বাড়ি ভর্তি ছিলো তাঁর বয়সী অনেক ছেলে-মেয়ে। তাদের সংগেই খেলাধূলা, বনভোজন এবং পাখি পোষা নিয়ে মেতে থাকতেন। আম-জাম, নারকেল আর পানিফল পেড়ে খাওয়া ছিলো তাঁর শৈশব-কৈশোরের নিত্য-নৈমিত্তিক ঘটনা। ছোটদের মধ্যে তিনিই ছিলেন সরদার। কখনো ঝগড়া-ঝাটি হলে বিজ্ঞের মতো মীমাংসা করে দিতেন। এমনি করে তার জীবনের ভিত সেই শৈশবেই তৈরি হয়েছিলো। বর্ষায় যখন মাঠঘাট ডুবে যেতো। টই-টম্বুর হতো ঝিল-বিল। তখন তিনি অন্যদের নিয়ে নৌকো চালিয়ে ঘুরে বেড়াতেন। কৈশোরে মাছ ধরারও শখ ছিলো খুব। গ্রামের বালকদের নিয়ে একবার তিনি একটি ক্ষুদে বাহিনী গড়ে তোলেন। এই বাহিনীর লড়াই লড়াই খেলা তাঁর ভীষণ ভালো লাগতো। আর একবার তিনি গ্রামের ছেলেদের নিয়ে একটি সমিতি গঠন করে নাম দিলেন ‘নওজোয়ান সমিতি’। এই সমিতির উদ্যোগে গ্রামে নাটক মঞ্চায়ন হতো। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে একবার তিনি নিজের লেখা প্রবন্ধ পাঠ করে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিলেন। তখন তিনি উত্তম স্বাস্থ্যের এক সুশ্রী কিশোর। তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া ১৯১১ খ্রিস্টাব্দে বৃহত্তর বরিশাল বর্তমান পিরোজপুর জেলার ভাণ্ডারিয়া উপজেলাধীন ভাণ্ডারিয়া গ্রামের মিয়া পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম মোসলেম উদ্দীন মিয়া। মায়ের নাম হাজেরা বেগম। এই মিয়া পরিবারে আদি নিবাস ছিলো বৃহত্তর ফরিদপুরে। ভাণ্ডারিয়ার ঐতিহ্যবাহী এই পরিবারটি বংশানুক্রমে গোটা অঞ্চলের সকলের কাছে ছিলো শ্রদ্ধাশীল। খুব অল্প বয়সেই মানিক মিয়া মাকে হারান। দাদা-দাদী এবং চাচা-চাচীর কাছে পরম আদরে বড়ো হতে থাকেন। জন্মগ্রহণের সময় তাঁর দাদী নাতির সুন্দর চেহারা দেখে বলে উঠেছিলেন: মানিক আমার ঘর আলো করতে এসেছে। তখন কে জানতো এই মানিকই সারাবাংলাকে আলোকিত করবে। মানিক মিয়ার পড়াশোনা শুরু হয় গ্রামের স্কুলে। পরে পূর্ব ভাণ্ডারিয়া মডেল স্কুলে। এই স্কুলে পড়ার সময় তিনি ফুটবল দল গঠন করেন। ফুটবল খেলার প্রতি তাঁর দারুণ আকর্ষণ ছিলো। তখন হা-ডু-ডু আর ফুটবল খেলাই ছিলো গ্রামে ছেলেদের একমাত্র প্রিয় খেলা। মডেল স্কুলের পড়শোনা শেষ করে তিনি পিরোজপুর, সরকারি উচ্চ ইংরেজী বিদ্যালয়ে ভর্তি হন এবং এই স্কুল থেকেই এন্ট্রান্স পাস করে ভর্তি হন বিএম কলেজে। এই কলেজে থেকেই তিনি ডিস্ট্রিংশনসহ স্নাতক ডিগ্রী লাভ করেন। পড়াশোনা শেষ করে তিনি প্রথমে পিরোজপুর সিভিল কোর্টে সরকারি চাকরিতে যোগদান করেন। এসময়ই তিনি হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সান্নিধ্যে আসেন। ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দে কলকাতা থেকে সোহরাওয়ার্দীর উদ্যোগে দৈনিক ইত্তেহাদ প্রকাশিত হয়। মানিক মিয়া দৈনিক ইত্তেহাদের পরিচালনা বিভাগে যোগদান করেন। পরবর্তীকালে ঢাকা হতে ১৯৪৯ সালে সাপ্তাহিক ইত্তেফাক প্রকাশিত হয় এবং ১৯৫১ সালের ১৪ আগস্ট হতে মানিক মিয়া ইত্তেফাকের সম্পাদনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। মহান ভাষা আন্দোলন এবং ভাষা আন্দোলন পরবর্তী সময়ে তাঁর কলামের জন্য ইত্তেফাক অস্বাভাবিক জনপ্রিয়তা লাভ করে এবং ইত্তেফাকের প্রচার সংখ্যা দারুণভাবে বৃদ্ধি পায়। অতপর তাঁর প্রত্যক্ষ উদ্যোগ ও সম্পাদনায় ১৯৫৩ সালের ২৪ ডিসেম্বর দৈনিক ইত্তেফাক প্রকাশিত হয়। তিনি আজীবন ছিলেন দৈনিক ইত্তেফাকের নির্ভীক সম্পাদক ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের মশালবাহী অগ্রদূত। ছোটদের তিনি ভীষণ ভালোবাসতেন। ইত্তেফাকের পাতায় কচি-কাঁচার আসরের বরাদ্দ তার প্রমাণ। কচি-কাঁচার মেলারও তিনি ছিলেন পৃষ্ঠপোষক। মানিক মিয়া ১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দের ১ জুন পাকিস্তানের রাওয়ালপিন্ডিতে মৃত্যুবরণ করেন। দেশের সাংবাদিকতা এবং রাজনীতি ও সামাজিক জীবনের পরিবর্তন সাধনে তাঁর সক্রিয় ভূমিকা মানুষ কোনদিন ভুলবে না। আমরা তাঁর স্মৃতির প্রতি অশেষ শ্রদ্ধা জানাই।