কস-ট্যান-কসেক

একটা লম্বা হাত রূপার চোখের ওপর দৃষ্টি আড়াল করে দিলো। এক পা পিছু হটে গেলো সে। আজাদ ভাই হোঃ হোঃ করে হাসতে লাগলেন। ‘কীরে ভয় পেলি?’ রূপা আমতা আমতা করে, ‘না, মানে-তুমি? কোথায় যাচ্ছিলে?’ ‘কোথাও না। তোকে দেখে দাঁড়ালাম। তো তুই স্কুল টাইমের আগেই যে যাচ্ছিস?’ রূপা জানালো, ‘আরামবাগে কোচিং পড়ব, তারপর স্কুলে আসব।’ ‘বলিস কি? খানাপিনা!’ ‘একটা বনরুটি আর কলা কিনে খেয়ে নেবো।’ আজাদ ভাই শুধু বললেন, ‘ও’। রূপা বললো, ‘আজাদ ভাই, দেরি হয়ে যাবে, আমি যাই।’ উনি বিচলিত ভঙ্গিতে বললেন, ‘যাই কি রে! চল, আমিও তোর সঙ্গে যাবো।’ ‘তুমি যাবে? ‘তুমি কোথায় যাবে?’ বিস্মিত রূপা বিব্রত বোধ করে। উনি নির্বিকার ভাবে বললেন, ‘তোর সঙ্গে, তুই যেখানে কোচিং-এ পড়বি, ওখানে!’ ‘কী যে বলো আজাদ ভাই, তার ঠিক নাই। শোন, ওখানে এক থেকে দেড়ঘণ্টা আমি পড়বো। ওখানে গিয়ে তোমার তো কোনো লাভ নেই।’ ‘সবকিছুতে লাভ খোঁজা তোদের অভ্যেস। আমার লাভে কাজ নেই। তুই পড়বি, আমি পেছনের সিটে চুপচাপ বসে থাকবো। চল, হাঁটতে হাঁটতে কথা বলি’। আজাদ রূপার হাত ধরে সামনের দিকে চলতে শুরু করলেন। রূপা অস্বস্তির সাথে বলতে লাগল, ‘আজাদ ভাই, শোন আমার কথা। আমার খুব খারাপ লাগছে। আমি যখন পড়বো, তখন তোমাকে ওরা ক্লাসের ভেতর বসতে দেবে না। কারণ, আমি ওদের ভর্তি হওয়া ছাত্র, আর তুমি তো তা নও, আমার ম্যাডাম এটা পছন্দ না-ও করতে পারেন।’ আজাদ ভাই খুব রেগে বললেন, ‘ঠিক আছে রূপা, আমি বাইরে বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকবো। তুই ভেতরে ক্লাস করিস। হলো তো! যত্ত সব! শোন, আমি একেবারে খারাপ ছাত্র নই। ওই একটাই দোষ আমার, গুছিয়ে লিখতে পারি না। তাই, ফেল করেছি। দেখিস, আগামীবার পাস করবো। এখন থেকে আমি আব্বার কাছে নিয়মিত পড়ছি। প্রতি সপ্তাহে পরীক্ষা দিচ্ছি। জীবনে ওই একবারই ফেল করলাম। সে-ও শুধু নিজের একটা ভুলের জন্য।’ তা না হলে ওই বদনামটা হতো না। শোন, আমি যদি এখন বাসায় যাই, আমার পড়া হবে না। আমার শেফালী বাবু এসেছে। ওর শ্বশুরবাড়ির লোকজনে বাড়ি ভর্তি। ওরা দু’দিন থাকবে। তারপর বিদেশে যাবে। বাড়িটা খালি হবে। এ সময়ে কোন বন্ধুর বাড়িতে যাওয়াটাও বিশ্রী লাগে। ছিলাম ফুটওভার ব্রিজে দাঁড়িয়ে, তোকে দেখে তোর সাথে যাবো— এই ভেবে মন ঠিক করেছি। রাস্তায় এভাবে দাঁড়িয়ে থাকলে ‘বখাটে’ ভেবে আমাকে পুলিশেও ধরতে পারে।’ রূপা বলতে বাধ্য হলো, ঠিক আছে আজাদ ভাই, চলো।’ যেতে যেতে গল্প করতে লাগল ওরা। রূপাদের কী কী পড়ানো হয়েছে। কেমন পড়ছে রূপা। আজাদ ভাইকে কিছু নোট, সাজেশন দিয়ে হেল্প করতে চাইলো রূপা। উনি মোটামুটি ভালো ছাত্র। তার এই হঠাত্ ফেলটা দুর্ঘটনার মতোই। চুপচাপ পথ চলছে ওরা দু’জন। আজাদ ভাই হঠাত্ প্রশ্ন করে, ‘কীরে চুপচাপ যে।’ রূপা জানতে চায়, ‘কি বলবো?’ ‘আরে কথা নেই! শোন, একটা মজার কথা বলি। সেদিন কলোনীর ভেতর দিয়ে হাঁটছিলাম। দেখি এক বেঁটে মতো পেয়ারাঅলা পাকা পেয়ারা টুকরি বোঝাই করে নিয়ে যাচ্ছে। ভারি লোভ হলো। তখন খুব সকালবেলা। পথে লোকজন তেমন ছিলো না। হাত বাড়িয়ে তুলে নিলাম একটা পেয়ারা। বেশ ডাঁশা। প্রায় পাকি পাকি করছে। আর যা ঘ্রাণ।’ আজাদ ভাইয়ের বর্ণনা শুনে রূপার জিভেও যেন পানি এসে গেলো। কৌতূহল চাপতে না পেরে রূপা জানতে চাইলো, ‘তারপর?’ উনি বলতে লাগলেন, ‘তারপর খেতে থাকলাম। লোকটা টেরই পেলো না।’ ‘তার মানে, তুমি চুরি করলে?’ থেমে থেমে বলল রূপা। আজাদ ভাই অবলীলায় বললেন, ‘হ্যাঁ, করলাম! না বলে পরের জিনিস নেয়া, আত্মসাত্ করাই তো চুরি, নয়কি?’ রূপার মন কেমন করতে লাগলো। আজাদ ভাই এতো তুচ্ছ একটা পেয়ারার জন্য দরিদ্র পেয়ারাঅলাকে ঠকিয়ে খেয়েছেন, ভাবতেই খুব একটা বিশ্রী লাগলো। তক্ষুণি রূপার মনে ঝিলিক দিয়ে উঠলো, ‘ছিঃ! একটা ছিঁচকে চোরের সঙ্গে পথ চলছি!’ তাকে শুধু বন্ধু নয়, আরও বেশি কিছু মনে করত রূপা। তিনি ছাত্র হিসেবেও খারাপ নন। কখনও তার কোনো মন্দ আচরণের কথা শোনা যায়নি। এমনকি মানুষের উপকারের জন্য সময় নষ্ট করে বাড়ি ফেরার পর তিনি বাবা, বড় বোনের বকুনি খেয়েছেন, এমন অনেক গল্প ওদের জানা ছিলো। তিনি সুযোগ পেয়ে দাম না চুকিয়ে পেয়ারা তুলে খেয়েছেন এমন কথাটা রূপাকে না বললেই বরং ভালো করতেন। রূপা বলে চললো, ‘আজাদ ভাই, আমি ভাবতে পারছি না, তুমি ওরকম একটা অন্যায় করেছ। কথাটা আমাকে না বললেই পারতে! তোমার এই মন্দ কাজটার কথা শুনে আমার মনের প্রতিক্রিয়াটা আমি তোমাকে বোঝাতে পারলাম না।’ ঠিক তক্ষুণি ওদের পাশ দিয়ে দ্রুত চলতে লাগলো মাথায় ঝাঁকা ভরা পেয়ারা নিয়ে এক পেয়ারাঅলা। ভারি মিষ্টি একটা খুশবু ছড়িয়ে পড়লো বাতাসে। ওর দিকে চোখ পড়তেই রূপা ভাবল, এই বুঝি আজাদভাই তুলে নেবে একটা। আজাদ ভাই বললেন, ‘খাবি একটা!’ রূপা জবাব দিলো, ‘ছিঃ!’ আজাদ ভাই হাসতে হাসতে রূপার কাঁধে হাত রাখলেন, ‘খুব ভালো ছেলে তুই রূপা! আমার কথাটা বিশ্বাস করে ফেললি!’ তার কথায় রূপার চোখে সংশয় ঝিলিক দিলো। বললো, ‘মানে?’ ‘মানে, আমি তোর মনের মধ্যে আমার প্রতি তোর বিশ্বাসটাকে যাচাই করে দেখলাম! এত হাল্কা তোদের বিশ্বাস! এক ফুঁয়েই নিভে যায়!’ রূপা ব্যথিত হলো, বললো, ‘তুমি যেভাবে বলছিলে! সত্যি বলছি, ভেতর থেকে আমি একটুও বিশ্বাস করিনি।’ একটা ছোট গলির মধ্যে ছোট পাঁচতলা বাড়ি। তার চারতলায় উঠে রূপা বড় করে শ্বাস নিলো। আজাদ অবাক হয়ে বললো, ‘এইটুকুতেই হাঁপিয়ে যাস? তোর আরও বেশি বেশি খেতে হবে রূপা।’ ওরা ভেতরে ঢুকলো। দরজার কাছে অনেক জোড়া স্যান্ডেল। আজাদ এক পলকে গুণে দেখলো ওদেরটাসহ সতের জোড়া। ছোট্ট একটা ঘরে সবাই গাদাগাদি করে বসেছে। আসলে ঘর নয়, ডাইনিং স্পেসে অনেকগুলো লম্বা বেঞ্চ পাতা আছে। ঠিক প্রাইমারি স্কুলের মতো। রূপা একটু মন মরা হয়ে আছে। কি জানি আজাদ ভাইয়ের জন্য আজ ম্যাডামের কাছে বিব্রত হতে হয় নাকি। বিভিন্ন স্কুলের ছেলেরা এসেছে। আজাদ দেখলো সবাইকে। আর কেউ তার পরিচিত নয়। সে পেছনের সীটে চুপচাপ বসে রইলো। ক্লাস শুরু হয়ে গেলো। নতুন চ্যাপটার ধরা হলো আজ। ত্রিকোণমিতির কিছু সূত্র দিয়ে শুরু কররেন ম্যাডাম। কস-ট্যান-কসেক-সাইন-স্যাক। কি অদ্ভুত! আজাদ মুগ্ধ! বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলো। ওর মনে হলো, ও সব পারে। সবকিছু সহজ। লম্ব বাই ভূমি আর ভূমি বাই লম্ব। অতিভুজ বাই লম্ব আর লম্ব বাই অতিভুজ। ম্যাডাম কি স্বর্গের কোন প্রাণী! এত সহজ আর সরল ভাষায় তিনি বলছেন। ক্লাস প্রায় শেষ। হঠাত্ ম্যাডাম দেখতে পেলেন আজাদকে। তিনি ওকে উদ্দেশ করে বললেন, ‘তুমি খাতায় লিখছো না যে!’ সবাই মাথা ঘুরিয়ে আজাদের দিকে তাকালো। রূপা মাথা নিচু করে চুপচাপ বসে আছে। আজাদ দাঁড়াল, ‘ম্যাডাম আমি আজ নতুন এসেছি, আজ হঠাত্ এসে পড়েছি। কাল ভর্তি হয়ে বইখাতা নিয়ে আসবে।’ ম্যাডাম বললেন, ‘বস।’ ক্লাস শেষে সবার আগেই আজাদ নিচে নেমে এসে দাঁড়িয়ে রইলো। নামতে নামতে শুনতে পেলো কে যেন বলছে, ‘যাচাই ক্লাস করতে এসেছে নাকি ছেলেটা!’ শুনে সবাই হোঃ হোঃ উঠলো। একটু দূরে দাঁড়িয়ে থাকলো আজাদ। সবাই আড়চোখে ওর দিকে তাকিয়ে দেখে যে যার মতো চলে গেলো। সবার শেষে নামল রূপা। আজাদ মিষ্টি করে হেসে জানতে চাইলো, ‘তোর কোনো অসুবিধা হয়নি তো?’ ‘নাহ, তুমি তো ভালো ভাবেই ক্লাস করলে।’ ‘শোন রূপা, আমার এইমাত্র মনে হচ্ছে, এ রকম কোচিং না করে পরীক্ষা দেয়াতেই আমার অমন ফল বিপর্যয় হয়েছিল। কী সুন্দর করে পড়ায় তোর ম্যাডাম। আমি মুগ্ধ’! তুমি সত্যি সত্যি ভর্তি হবে?’ ‘রূপা, আমি ভর্তি হতে চাই, আজ বাসায় গিয়ে মাকে বলবো।’ রূপা স্কুলে ঢুকে গেলো। তখন প্রায় বারোটা বাজে। আজাদ বাড়ি ফিরে গেলো। ওর কেবলই মনে হতে লাগলো, এই ম্যাডামের কাছে ওকে পড়তেই হবে। ওরে বাপরে! বাসায় ঢুকেই আজাদের মাথায় গন্ডগোল হওয়ার জোগাড়। এতক্ষণে কোথায় ছিলি? আব্বা বাজারে যাওয়ার সময় তোকে ডেকে পেলো না? বুবুর প্রশ্নবাণ। ‘শোন, লতাকে একটু বাইরে থেকে ঘুরিয়ে নিয়ে আয় তো! খুব বিরক্ত করছে’, বলেই দুই বছরের ভাগ্নিকে ওর কোলে তুলে দিলো। মা বললেন ‘ও বাইরে থেকে এলো, এইমাত্র, আবার বাইরে যাবে!’ ‘মা, ছেলেকে অতো লাই দিও নাতো! ওদের পরিশ্রমী হতে হবে। তোমার আস্কারা পেয়েই তো সেবার ফেল করেছে।’ আজাদ চটজলদি বাড়ির বাইরে পা বাড়ালো। সারাদিন আজাদ মার আশেপাশেই ঘেঁষতে পারে না। কিন্তু কথাটা মাকে বলতেই হবে। রাতের খাবার শেষে মা পানের বাটা নিয়ে শোবার ঘরে পা ছড়িয়ে বসেছেন। আজাদ কাছে গিয়ে মার গা ঘেঁষে বসল, ‘মা।’ ‘কী বাবা, কিছু বলবি?’ মার কণ্ঠস্বরে মধু ঝরে পড়ে। আজাদের সঙ্গে বসে তার দু’দণ্ড কথা বলার সময় হয় না। আজ আজাদ নিজে এসে মার পাশে বসেছে। নিশ্চয়ই জরুরী কিছু। মা পান বানানো রেখে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। ‘কী- বলো!’ আজাদ অস্বস্তি বোধ করে, তবু বলে, ‘মা, আমি অঙ্ক কোচিং করব।’ ‘কোথায়?’ ‘এক ম্যাডামের কাছে, আজ গিয়েছিলাম, এত সুন্দর করে বোঝায়’ সে মনে হয় সব মুখস্থ হয়ে যাচ্ছে। মা, কোচিং না করে পরীক্ষা দিলে আবার ফেল করবো। আমার খুব ভয় করছে—বলেই ও মাথাটা নিচে করে ফেলে। মা ওর মাথাটা বুকের কাছে টেনে নিয়ে বলেন, ‘পড়তে চাইলে অবশ্যই পড়বি। কালই ভর্তি হয়ে যাস। আজ অনেক রাত হয়েছে বাবা, ঘুমুতে যাও।’ দু’দিন পর। সমস্ত মেহমান বিদায় হলে বাবার খেয়াল হয়, এ ক’দিন আজাদ কোথায় কী করে বেড়াচ্ছে খোঁজই তো নেয়া হয়নি। হঠাত্ বাবা আজাদকে ডেকে পাঠান। আজাদ আজকাল বাইরে খুবই কম যায়। আর পরোপকারের মাত্রাটাও কমিয়েছে। ওর কেবলই মনে হচ্ছে, পড়ালেখার জন্য যে সময়টা সে সময় পড়লেখাতেই ব্যয় করতে হবে। নিজে বড় না হয়ে বড় বড় কাজ শোভা পায় না। বরং কেমন যেন একটা সন্দেহের তীর ওর দিকে তাক করাই থাকে। কেউ জানতে চায় না, আজাদের বাড়িতে পরিবেশ কেমন, পরীক্ষার সময়ও বিরতিহীন মেহমানদারী সামলাতে হয় ওদের। আজ কারো চাকরির ইন্টারভিউ, কাল কারো চিকিত্সার্থ আগমন, পরশু পাত্র-পাত্রী দেখার কার্যকারণ, বিদেশে গমন-আগমনের ট্রানজিট-এর জন্য আজাদের বাড়িটা যেন এক জংশন। এখানে আজাদ নামের একজন ফেল করলে ‘সব দোষ নন্দঘোষ’ আজাদেরই। ওর পরিবেশের খবর রাখার মনমানসিকতা কারো নেই। তাই, আজাদ প্রতিজ্ঞা করেছে, বাড়ির পরিবেশকে উপেক্ষা করবে। মাকে বুঝিয়ে বলেছে, ও যখন অনেকক্ষণ বাসায় থাকবে না, মা যেন বুঝে নেয় ও জলার ধারে ধঞ্চে গাছ লাগানো মাটির টেকের নির্জন সেই ঢিবিটায় বসে ধূম পড়াশোনা করছে। দিন কেটে যায়। এসএসসির ফলাফল বের হয়। আজাদ নামের ছেলেটি এ+ পেয়ে পাস করে। দেখেশুনে সবার মধ্যে আনন্দের বন্যা বয়ে যায়। বাবা অনেক অনেক মিষ্টি কিনে আনেন। পাড়ার সবার বাড়িতে মিষ্টি দিয়ে আসে আজাদ নিজেই। আজ ওর মনে আনন্দ আর ধরে না। ব্যর্থতার পেছনেই থাকে সাফল্য। ‘ফেইলিউর’ ইজ দা পিলার অব সাকসেস’ কথাটা আজাদের বেলায় ঠিক ঠিক প্রমাণিত হয়ে গেছে।