ছয় বছরেও চালু হল না ভার্সিটির গুচ্ছ ভর্তি পরীক্ষা

শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সুপারিশের পর ছয় বছর ধরে শুধু আলোচনাতেই আটকে আছে বিশ্ববিদ্যালয়ে গুচ্ছভিত্তিক ভর্তির পরিকল্পনা। দেশের সকল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিদের ঐকমত্যে পৌঁছতে না পারায় এ পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হতে পারছে না বলে জানিয়েছে মন্ত্রণালয় ও ইউজিসির একাধিক সূত্র। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে উচ্চশিক্ষায় প্রতি বছরই বিপুল শিক্ষার্থী যুক্ত হচ্ছেন। আগে শিক্ষার্থী সংখ্যা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা অপেক্ষাকৃত কম ছিল। তাই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পৃথকভাবে ভর্তি পরীক্ষার নিয়ম প্রচলন করা হয়। কিন্তু বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষার্থী সংখ্যা অনেক বেড়েছে। দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হয়েছে ও হচ্ছে। এ সংখ্যা অনেক বেড়ে যাওয়ায় ভর্তি প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণে ভর্তিচ্ছু ছাত্র-ছাত্রীরা সমান সুযোগ পাচ্ছেন না। শিক্ষার্থী ও অভিভাবকের হয়রানি বেড়েছে। অনেকগুলো পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করায় অর্থ এবং সময়েরও অপচয় হচ্ছে। এ সমস্যা নিরসনে গুচ্ছ পদ্ধতিতে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষা প্রবর্তনের বিকল্প নেই। এ প্রসঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান (প্রতিমন্ত্রী) অধ্যাপক এ কে আজাদ চৌধুরী বলেন, বর্তমান পদ্ধতিতে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করা একজন শিক্ষার্থীর জন্য অপেক্ষাকৃত কঠিন। বিদ্যমান প্রক্রিয়ায় সে তার মেধার পূর্ণ প্রতিফলন ঘটিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারে না। গুচ্ছভিত্তিক ভর্তি ব্যবস্থা চালু হলে শিক্ষার্থীদের জন্য সুযোগ বাড়বে। কিন্তু কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় গুচ্ছ পদ্ধতি অনুসরণ করতে এখন পর্যন্ত রাজি হচ্ছে না। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর স্বায়ত্তশাসন খর্ব করে আমরা এ পদ্ধতি প্রবর্তন করতে চাই না। তাদের পূর্ণ অধিকার সংরক্ষণ করেই এ পদ্ধতি প্রবর্তন করা হবে। এজন্য তাদের ঐক্যমত প্রয়োজন। মন্ত্রণালয় ও ইউজিসি সূত্র জানায়, ২০০৮ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি প্রক্রিয়ার সংস্কার নিয়ে তখনকার শিক্ষা উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমান সকল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিদের নিয়ে বৈঠক করেন। তাতে গুচ্ছভিত্তিক ভর্তির প্রস্তাব দেয়া হয়। তখন এ পদ্ধতির সুফল শিক্ষার্থীরা পাবে বলে অধিকাংশ ভিসিই একমত পোষণ করেন। তবে বেশ কয়েকজন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন খর্ব হওয়ার আশঙ্কা করেন। ২০০৯ সালে মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর এ বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ ভিসিদের নিয়ে বৈঠক করেন। ঐ বৈঠকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়সহ (বুয়েট) কয়েকটি বড় বিশ্ববিদ্যালয় অসম্মতি জানায়। ২০১০, ২০১১ এবং ২০১২ সালেও এ বিষয়ে মন্ত্রণালয় ভিসিদের সাথে বৈঠক করে। প্রতিবারই বিষয়টি যাচাই-বাছাই করতে সময় নেয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। গত বছরের জুলাই মাসেও এ পদ্ধতি প্রণয়নের বিষয়ে ভিসিদের নিয়ে বৈঠক করেন শিক্ষামন্ত্রী। তখনও অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয় পদ্ধতির পক্ষে সম্মতি দিলেও বড় কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় এ পদ্ধতির প্রস্তাবের বিপক্ষে মত প্রকাশ করে। তখন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (শাবিপ্রবি) এবং যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় অভিন্ন পরীক্ষা নেয়ার ঘোষণাও দেয়। তবে পরে শাবিপ্রবিতে আন্দোলনের কারণে এ উদ্যোগও ভন্ডুল হয়ে যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের গুচ্ছভিত্তিক ভর্তি পরীক্ষা বাস্তবায়নের জন্য দীর্ঘদিন ধরে প্রচেষ্টা চালিয়ে আসছিলেন শিক্ষাবিদ এবং শাবিপ্রবি’র অধ্যাপক মুহম্মদ জাফর ইকবাল। গত বছর শাবিপ্রবি এবং যবিপ্রবি’র কর্তৃপক্ষ গুচ্ছপদ্ধতিতে ভর্তি পরীক্ষা থেকে পিছয়ে আসলে তিনি অধ্যাপকের পদ থেকে পদত্যাগের আবেদন করেন। পরে সকলের অনুরোধে তা প্রত্যাহারও করেন। গত বৃহস্পতিবার তিনি ইত্তেফাককে বলেন, আমাদের বিপুলসংখ্যক উচ্চশিক্ষা প্রত্যাশী ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য গুচ্ছভিত্তিক ভর্তি পরীক্ষা প্রবর্তন খুবই প্রয়োজন। এটি বাস্তবায়নে আমি অনেক চেষ্টা চালিয়েছি। কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষগুলো এ পদ্ধতি বাস্তবায়নে আন্তরিক নয়। তারা আন্তরিক হলেই গুচ্ছভিত্তিক ভর্তি পরীক্ষা বাস্তবায়তি হতে পারে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, এ বছর এইচএসসি পরীক্ষায় প্রায় সোয়া ৯ লাখ শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করছে। আগের ধারা ঠিক থাকলে পাস ও জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যা আরো বাড়বে। বিপুল পরিমাণ শিক্ষার্থীর উচ্চশিক্ষায় প্রবেশ নিশ্চিত করা কঠিন। তাই গুচ্ছভিত্তিক ভর্তি পরীক্ষা প্রবর্তনের লক্ষ্য নিয়ে এইচএসসি পরীক্ষা শেষ হওয়ার পরই ভিসিদের নিয়ে শিক্ষা মন্ত্রী বৈঠকে বসতে পারেন।