বিএনপি নেতাসহ দু’জন গ্রেফতার
প্রকাশ : ২৭ মে ২০১৪, ২৩:১৭
ফেনীর ফুলগাজী উপজেলা চেয়ারম্যান একরামুল হক একরাম হত্যা মামলার প্রধান আসামি বিএনপি নেতা মাহতাব উদ্দিন মিনারকে গতকাল সকালে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) একটি বিশেষ দল কাফরুল থেকে গ্রেফতার করে। দুপুরে ফেনী মডেল থানার একরাম হত্যা মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তার কাছে মিনারকে ডিবি কর্মকর্তারা হস্তান্তর করেছেন। এছাড়া র্যাব-১ এর হাতে গ্রেফতারকৃত জাহিদুল ইসলাম জাহিদের দেয়া তথ্যানুযায়ী গত সোমবার রাত ১২টায় র্যাব-৭ এর একটি বিশেষ দল ফেনীর বিরিঞ্চি এলাকায় অভিযান চালিয়ে সজিব নামে এক যুবককে গ্রেফতার করে। তার কাছ থেকে একটি বিদেশি পিস্তল, ৫ রাউন্ড গুলি ও ২টি ম্যাগাজিন উদ্ধার করা হয়। এ অস্ত্র উপজেলা চেয়ারম্যান একরাম হত্যাকাণ্ডে ব্যবহূত হয়েছিল। গত সোমবার সকালে গাজীপুর চৌরাস্তা থেকে একরাম হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত কিলার মীর হোসেন স্বপন ও জাহিদুল ইসলাম জাহিদকে গ্রেফতার করা হয়। তাদেরকে ঐদিন ফেনী মডেল থানার একরাম হত্যা মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তার কাছে হস্তান্তর করে র্যাব-১। এনিয়ে গতকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত একরাম হত্যাকাণ্ডে গ্রেফতারের সংখ্যা ২০ জন বলে ফেনীর পুলিশ সুপার পরিতোষ ঘোষ জানান।
এদিকে একরাম হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী জাহিদ চৌধুরী ওরফে জিহাদ চৌধুরী রিমাণ্ডে জিজ্ঞাসাবাদে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন। তার স্বীকারোক্তি অনুযায়ী গতকাল সকালে ফেনী শহরের সালাম কমিউনিটি সেন্টারে অভিযান চালিয়ে পুলিশ টিভির বাক্স থেকে একটি বিদেশি পিস্তল ও ৪ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করে। এ গুলি ও অস্ত্র একরাম হত্যাকাণ্ডে ব্যবহার করা হয়েছিল বলেও জিহাদ চৌধুরী পুলিশকে জানান। গতকাল পর্যন্ত র্যাব-পুলিশ একরাম হত্যাকাণ্ডে ব্যবহূত ২টি অস্ত্র ও ৯ রাউন্ড গুলি এবং ২টি ম্যাগাজিন উদ্ধার করেছে। একরাম হত্যাকাণ্ডের অন্যতম কিলার ও প্রথম গুলিবর্ষণকারী আবিদুল ইসলাম আবিদ গতকাল ফেনীর আদালতে নিজেকে জড়িয়ে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। এরপর আবিদকে জেল-হাজতে পাঠিয়ে দেয়া হয়। জবানবন্দিতে একরাম হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনাকারী ও কিলারদের সম্পর্কে তথ্য দেয়া হয়। এছাড়া কিভাবে একরাম হত্যার মিশন সফল করা হয়, কে অস্ত্র, গুলি ও টাকা দিয়েছে তার পূর্ণাঙ্গ তথ্য জবানবন্দিতে উল্লেখ করেছেন কিলার আবিদ।
ফেনীর ব্যবসায়ী ও আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দসহ বিভিন্ন পেশার লোকের অভিযোগ, প্রকাশ্যে একরামকে হত্যা করা হলেও কাছে টহল পুলিশ ছিল নিরব দর্শক। ঘটনার কয়েকদিন আগে ফেনী পুলিশ প্রেস ব্রিফিং-এ ফেনীতে হত্যাসহ অনেক ঘটনার আভাস দিয়েছিল। খুনিরা স্থানীয় এমপি, দুই গডফাদারের ছত্রচ্ছায়ায় ঘুরছে। একরাম হত্যাকাণ্ডের তদন্ত নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। পুলিশ প্রশাসন নিশ্চিত কারা একরামকে কি কারণে হত্যা করেছে এবং এতে কাদের পরিকল্পনা ছিল । তাই হত্যাকাণ্ডের সঠিক তদন্ত চায় ফেনীবাসী। অন্যথায় একরাম হত্যাকাণ্ড নিয়ে কঠোর আন্দোলনে যাওয়া ছাড়া তাদের কোনো বিকল্প থাকবে না ।
ফেনীতে র্যাবের প্রেস ব্রিফিং
ফেনী প্রতিনিধি জানান, গতকাল মঙ্গলবার বেলা সাড়ে ১২টার সময় ফেনীর র্যাব -৭ এর সহকারী পরিচালক মেজর মহিউদ্দিন সাংবাদিকদের সাথে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে বলেন, এ পর্যন্ত র্যাবের চৌকস দল কিলিং মিশনে অংশ নেয়া আটজনকে গ্রেফতার করেছে। গ্রেফতারকৃতদের তথ্য মতে র্যাব ঢাকার জয়দেবপুর থেকে খুনের সাথে জড়িত মীর হোসেন স্বপন ও জাহিদুল ইসলাম নামে আরো দুইজনকে গ্রেফতার করে গত ২৬ মে রাতে ফেনী থানায় হস্তান্তর করেছে এবং জাহিদুলের দেয়া তথ্য অনুযায়ী হত্যাকাণ্ডের অন্যতম মূল পরিকল্পনাকারী জাহিদ চৌধুরী ওরফে জিহাদ হত্যাকাণ্ডে ব্যবহূত অস্ত্রগুলোর মধ্যে একটি অস্ত্র ঢাকা থেকে গ্রেফতারকৃত জাহিদুল ইসলামের কাছে গোপনে রেখে দিতে নির্দেশ দেয়। জাহিদুল ইসলাম অস্ত্রটি গতকাল রাত সাড়ে ১২টার সময় র্যাবের হাতে গ্রেফতারকৃত তার বাল্যবন্ধু সজিবকে দিলে সে গোপনে নিরাপদ স্থানে রেখে দেয়। গ্রেফতারকৃত জাহিদুল ইসলাম র্যাবের হাতে ঢাকায় গ্রেফতার হওয়ার পর এই তথ্য দিলে র্যাব-৭ ফেনীর একটি দল গভীর রাতে বিরিঞ্চি এলাকায় অভিযান চালিয়ে সজিবকে আটক করে এবং তার থেকে একটি বিদেশি পিস্তল, ৫ রাউন্ড গুলি ও দুটি ম্যাগাজিন উদ্ধার করে। এছাড়াও গতকাল ঢাকার জয়দেবপুরে একরাম হত্যার সাথে জড়িত ফেনীর বিরিঞ্চির বড় বাড়ির মীর হোসেন স্বপন ও জাহিদুল ইসলামকে সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট খায়রুল আমিনের আদালত ৭ দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেছে। মামলার অপর আসামি আবিদুল ইসলাম আবিদকে একই আদালতে হাজির করে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি নেয়া হয়েছে। এছাড়াও আব্দুর রউফ নামে ফেনীর কাজিরবাগ ইউনিয়নের আওয়ামী লীগের ইউপি সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রউফকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে। একরাম হত্যার প্রতিবাদে ও চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের গ্রেফতারের দাবিতে ফুলগাজী বণিক সমিতি এক ঘন্টা দোকান-পাট বন্ধ রেখে মানববন্ধন করে। মানববন্ধনে সকল শ্রেণীর জনগণ উপস্থিত ছিলেন।
ফেনী জেলা পুলিশ সুপারের প্রেস ব্রিফিং
গতকাল মঙ্গলবার বিকাল ৪টায় ফেনীর পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের সেমিনার কক্ষে সাংবাদিকদের এক প্রেস ব্রিফিংয়ে পুলিশ সুপার পরিতোষ ঘোষ বলেন, সমপ্রতি উপজেলা চেয়ারম্যান একরামুল হক একরাম হত্যার সাথে জড়িতদের মধ্যে র্যাবের হাতে ১১ জন এবং পুলিশের হাতে ৯ জনসহ মোট ২০ জন গ্রেফতার হয়েছে। ফুলগাজী উপজেলা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নির্বাচনে একরামুল হক একরামের প্রতিদ্বন্দ্বী মাহতাব উদ্দিন চৌধুরী মিনার পরাজিত হওয়ার কারণে ক্ষুব্দ হয়ে একরাম হত্যার ঘটনাটি ঘটে বলে পুলিশের কাছে প্রাথমিকভাবে প্রতিয়মান হয়েছে বলে তিনি দাবী করেন। এছাড়াও এ ঘটনায় যারা গ্রেফতার হয়েছেন তাদের কাছ থেকে আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যাবে বলে তিনি আশা করছেন।
পরশুরাম সংবাদদাতা জানান, একরাম হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে ফুলগাজী বাজার ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির উদ্যোগে গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ কর্মসূচি পালিত হয়েছে। মানববন্ধন কর্মসূচি ও প্রতিবাদ সভায় ফুলগাজী বাজার ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতি, উপজেলা আওয়ামী লীগসহ সর্বস্তরের জনগণ অংশ নেন। এসময় ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক নের্তৃবৃন্দ একরাম হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে ফেনী পুলিশ সুপার ও ফেনী মডেল থানার ওসির প্রত্যাহারের দাবী জানান। তারা একরাম হত্যা কাণ্ডের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবী করে প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেন।