ড্যাপ সংশোধনের পরামর্শ ব্যবসায়ী ও বিশিষ্টজনদের

গাজীপুর শহরের পুবাইলের মেঘডুবি এলাকার ব্যবসায়ী জাফর ইকবাল ও তার আত্মীয়-স্বজনদের ১০ বিঘা জমি আছে। এসব জমিতে আধাপাকা ও পাকা বাড়ি তৈরি করে ৭টি পরিবার বংশানুক্রমে বসবাস করছে শত বছর ধরে; কিন্তু রাজধানীর ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যানে (ড্যাপ) তাদের বাড়িসহ পুরো জমি দেখানো হয়েছে প্রস্তাবিত হাসপাতাল হিসেবে। ড্যাপ-এর গেজেট প্রকাশের পর তারা বিষয়টি জেনে রাজউকের কাছে প্ল্যান সংশোধনের জন্য আবেদন করেন। ড্যাপ-এর আওতাধীন ১৫৯০ বর্গ কিলোমিটার এলাকার এমন হাজার হাজার মানুষ আছে যাদের বাড়িঘর, কবরস্থান, ভবিষ্যতে বাড়ি করার মতো জমি, কলকারখানা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে কিছু ক্ষেত্রে জলাভূমি, কিছু ক্ষেত্রে রাস্তা, কিছু ক্ষেত্রে খেলার মাঠ হিসেবে দেখানো হয়েছে। আর এমন পরিকল্পনা রাজউক করেছে জমির মালিকদের সঙ্গে কোনো ধরনের আলোচনা ছাড়াই। ড্যাপ-এর গেজেট প্রকাশের পর মানুষ জানতে পেরেছে, যে জমির সঙ্গে তার নাড়ীর টান, যে জমির সঙ্গে তাদের পূর্বপুরুষদের যোগসূত্র, ড্যাপ-এর কারণে তা আর তাদের থাকছে না। এমন আশঙ্কা থেকে ২০১০ সালের জুনে ফুঁসে উঠেছিল গাজীপুরের মানুষ। গাজীপুরে একটি উপ-শহর করার পরিকল্পনার প্রতিবাদে ২০১০ সালের ৩ জুলাই জনসভার আয়োজন করা হয়। সমাবেশ থেকে মানুষ শত শত গাড়ি ভাঙচুর করে, গার্মেন্টে আগুন দেয় ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। মানুষকে না জানিয়ে তাদের পারিবারিক কবরস্থানকে জলাশয় দেখিয়ে, বসতবাড়িকে রাস্তা দেখিয়ে ‘ভুল’ ড্যাপ প্রণয়ন ও তা বাস্তবায়নের চেষ্টাকে সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, দলমত নির্বিশেষে সকল মানুষকে সরকারের বিরুদ্ধে খেপিয়ে তোলার সহজ উপায় হচ্ছে ভুল ড্যাপ বাস্তবায়নের চেষ্টা করা। তার নজির দেখা গিয়েছিল গাজীপুরে। আওয়ামী লীগের ঘাঁটি বলে পরিচিত হলেও গাজীপুরের স্থানীয়রা যে ক্ষোভ দেখিয়েছে তা ছিল নজিরবিহীন। রাজধানীর একটি কাঠামোগত পরিকল্পনার আওতায় বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা বা ড্যাপ তৈরি করে গেজেট প্রকাশ করা হয় ২০১০ সালের ২২ জুন। ওই পরিকল্পনা তৈরির জন্য জরিপের কাজে নিয়োজিত ছিল চারটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। অভিযোগ রয়েছে, ওই প্রতিষ্ঠানগুলো গণহারে বসতভিটা ও ব্যক্তিমালিকানাধীন জমিকে বন্যাপ্রবাহ এলাকা হিসেবে দেখিয়েছে। পাশাপাশি কেবল স্থপতি, সিভিল ইঞ্জিনিয়ার ও পরিবেশবাদীদের সুপারিশে ড্যাপ তৈরি করা হয়েছে। সেখানে হাইড্রোগ্রাফিক ইঞ্জিনিয়ার, ল্যান্ডস্কেপ ইঞ্জিনিয়ার, ভূ-তত্ত্ববিদ, পানি বিশেষজ্ঞ ও জনপ্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, হাইড্রলজিক্যাল সার্ভে না করায় উপযুক্ত নিঁচু জায়গা সঠিকভাবে সনাক্ত করা যায়নি। ফলে বাস্তবে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা, কবরস্থান, কারখানাকে জলাশয় হিসেবে দেখানো হয়েছে। গাজীপুরে মানুষের সহিংস বিক্ষোভ ও বিভিন্ন মহলের আপত্তির পর ড্যাপ সংশোধনে একটি মন্ত্রীসভা কমিটি গঠন করা হয়েছিল। সেই কমিটি গত সপ্তাহে পুনর্গঠিত হয়েছে। ফলে নতুন করে আলোচনায় এসেছে ড্যাপ। অবশ্য স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, দেশের ল্যান্ড ডেভেলপার ও আবাসন ব্যবসায়ীরা দীর্ঘদিন ধরেই ড্যাপ সংশোধন করে বাস্তবায়নের কথা বলে আসছেন। তারা এক্ষেত্রে সকল সহযোগিতা দেওয়ার কথাও বলছেন। সম্প্রতি ঢাকাকে একটি তিলোত্তমা নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে পরিকল্পিতভাবে ড্যাপ তৈরির পরামর্শ দেওয়া হয়েছে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের ড্যাপ সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভায়। ওই সভায় দেশের ল্যান্ড ডেভেলপারস্ কোম্পানিগুলো সঠিক পরিকল্পনা করতে প্রয়োজনে নিজেদের টাকায় বিদেশ থেকে নগর পরিকল্পনাবিদ এনে সঠিক পরিকল্পনা তৈরিতে সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে। সকলের মত নিয়ে ড্যাপ তৈরির পরামর্শ দিয়ে গাজীপুর-২ (গাজীপুর সদর ও টঙ্গী) আসনের সংসদ সদস্য মো. জাহিদ আহসান রাসেল বলেন, সরকার ভালোর জন্যে করলেও ড্যাপ পরিকল্পিত হয়নি। তিনি বলেন, ড্যাপ অবশ্যই দরকার আছে। তা হতে হবে পরিকল্পিত ও সকলের মতানুসারে। আবাসন ব্যবসায়ীদের সংগঠন রিয়েল এস্টেট এ্যান্ড হাউজিং এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (রিহ্যাব)’র সহ-সভাপতি লিয়াকত আলী মিলন বলেন, ‘আমরা ড্যাপ চাই। তবে তা সবার সঙ্গে আলোচনা করেই করা উচিত। সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, বাস্তবায়নের সুযোগহীন একটি ‘অবাস্তব’ ড্যাপ করে সরকারকে দুইভাবে বিপদে ফেলা হয়েছে। প্রথমত; সরকারের বিরুদ্ধে মানুষকে খেপানো হয়েছে। দ্বিতীয়ত; ড্যাপ বাস্তবায়ন না করতে পেরে সরকারকে সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে। পাশপাশি ঢাকা মহানগরীকে পরিকল্পিত করার চেষ্টা আরও পিছিয়ে গেছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, নতুন একটি নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার ক্ষমতায় এসেছে। এখন সরকারের নতুন মেয়াদে সংশোধন না করে ‘ভুল’ ড্যাপ বাস্তবায়ন করতে গেলে অস্থির হতে পারে ঢাকা। তখন শুধু বিরোধী দল নয়; এতে যোগ দেবে সাধারণ মানুষ, এমনকি সরকারি দলের সমর্থকরাও। আর এর সুযোগ নিতে পারে বিভিন্ন মহল, যারা দেশকে অস্থিতিশীল করতে চায়। ঢাকা-১৯ আসনের সংসদ সদস্য ডা. এনামুর রহমান বলেন, ‘আমরা জনগণের প্রতিনিধি। জনগণকে নিয়ে আমাদের চলতে হয়। তাদের চাওয়া-পাওয়া এবং প্রয়োজনের নিরিখে বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা নেওয়া না হলে তা বিতর্কিত হতে পারে।’ ড্যাপ নিয়ে অস্থিরতার হলে তাতে সরকারকে অস্থিতিশীল করার সুযোগ খোঁজা হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হয়েছে সরকারের একটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৯৯৫ সালের ডিএমডিপি’র তথ্য-উপাত্তকে ভিত্তি ধরে প্রণীত ড্যাপ বাস্তবায়ন করা হলে বিপুল সংখ্যক স্থাপনা উচ্ছেদ করতে হবে। এতে সরকারের ওপর বিপুল জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রচণ্ড ক্ষোভের সৃষ্টি হবে। এ অবস্থায় আগামী ঢাকা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন ও সংসদ নির্বাচনে সরকারের বিরুদ্ধে জনমনের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ছাড়াও বিরোধী দল পরিস্থিতিকে উস্কে দিয়ে সরকারকে অস্থিতিশীল করার সুযোগ খুঁজবে। এখন ভুল স্বীকার করছেন অনেকে শুরু থেকেই জনপ্রতিনিধি ও ব্যবসায়ীরা ড্যাপের ভুল নিয়ে কথা বলছিলেন। কিন্তু তাদেরকে চিহ্নিত করা হয়েছিল ড্যাপ বিরোধী ‘জাতীয় শত্রু’ হিসেবে। কিন্তু ব্যবসায়ীরা সবসময়ই বলে আসছেন, ড্যাপ পরিকল্পিত না হলে তা বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। তারাও ড্যাপ চান, তবে সবার মতামত নিয়ে এটি তৈরি করতে হবে। যদিও পরে প্রমাণিত হয়েছে ড্যাপে ভুল ছিল। এমনকি পরিকল্পনাকারীরাও স্বীকার করেছেন ড্যাপে ভুল ছিল। গত শুক্রবার রিহ্যাব আয়োজিত ‘রিহ্যাব ফেয়ার ২০১৪’ এর সমাপনী অনুষ্ঠানে গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘ড্যাপ বাস্তবায়নের জন্য একটি রিভিউ কমিটি করা হয়েছে। এ কমিটি বাস্তবতার আলোকে আবাসন ব্যবসায়ীদের যৌক্তিক সব বিষয় বিবেচনা করে তা সংশোধন করবে। রাজধানীসহ আশপাশের এলাকায় জলাশয় থাকবে, আবাসনও হবে।’ এর আগে গত ১৮ ফেব্রুয়ারি ড্যাপে কিছু ভুল ছিল বলে স্বীকার করেন ড্যাপ পর্যালোচনা কমিটির আহবায়ক অধ্যাপক ড. জামিলুর রেজা চৌধুরী। তিনি বিজিএমইএ ভবনে এক অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, ড্যাপ প্রণয়নকালে যে চারটি পরামর্শক প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল তারা অনেক জমিকে জলাভূমি হিসেবে দেখিয়েছিল, যা আসলে জলাভূমি নয়। ব্যবসায়ীরা বলছেন, শুরুতে তাদের মতামত নেওয়া হলে জল এত ঘোলা হত না।