কর্ণফুলীর দূষণরোধে সোচ্চার চট্টগ্রামবাসী

বিভিন্নভাবে দূষণে কর্ণফুলী নদী হুমকির মুখে পড়েছে। শিল্প বর্জ্য, পয়োঃবর্জ্য ও কঠিন বর্জ্য ফেলা বন্ধ না হলে অচিরেই কর্ণফুলী নদীর ভবিষ্যত্ আরো খারাপ হবে। বিশ্ব পরিবেশ দিবসকে সামনে রেখে নদীর দূষণরোধে চট্টগ্রাম পরিবেশ অধিদপ্তর জনগণের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি এবং সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কার্যকর ভূমিকা রাখার জন্য ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। কর্ণফুলী নদীর মোহনা এলাকায় গড়ে উঠেছে দেশের প্রধান সমুদ্র বন্দর। কর্ণফুলী নদীর অব্যাহত দূষণের ফলে এক সময় বন্দরের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়বে বলে বিশেষজ্ঞ মহলের অভিমত। কারণ দূষণের ফলে নদীর নাব্যতাও হ্রাস পাবে। ‘কর্ণফুলীকে বুড়িগঙ্গা হতে দেব না’—এ শ্লোগান নিয়ে পরিবেশ অধিদপ্তর এখনই কর্ণফুলী নদীর দূষণের লাগাম টেনে ধরতে চাচ্ছে বলে জানা গেছে। কর্ণফুলী নদীতে এক সময় মিঠা পানির ৬৬, মিশ্র পানির ৫৯ এবং সামুদ্রিক ১৫ প্রজাতির মাছ পাওয়া যেত। কিন্তু বর্তমানে মিঠা পানির ২০-২৫ ও মিশ্র পানির ১০ প্রজাতির মাছ বিলুপ্ত প্রায়। বাকিগুলোর মধ্যে মাত্র ১০/১২ প্রজাতির মাছ পাওয়া যায়। বিভিন্ন প্রকার বর্জ্যে কর্ণফুলী যেমন হুমকিরমুখে পড়েছে তেমনি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রধান শিকার হয়েছে কর্ণফুলী নদী। এর নাব্যতা হ্রাস পেয়েছে। শাখা নদী, খাল ও কাপ্তাই হ্রদের স্লুইস গেটে পানির প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় নদীর পানির স্বাভাবিক প্রবাহ কমে গেছে। মানব সৃষ্ট দূষণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এর মধ্যে রয়েছে রূপচাঁদা, কাচকি, ফাইস্যা, কালিচাঁদা, পাঙ্গাস, বাচা, ভেটকি, পাবদা, বাঁশপাতা, লইট্টা, রিস্যা, মধুপাবদা, পোয়া, গুলসা, মহাশোল, সাদাগনিয়া। এছাড়াও অন্যান্য প্রজাতির মাছও কমতে শুরু করেছে। কর্ণফুলী নদীর দূষণের ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ভূমিকা রাখছে ওয়াসা, সিটি কর্পোরেশন এবং শিল্প-কারখানাসমূহ। ১৯৬৩ সালে চট্টগ্রাম ওয়াসা (ওয়াটার এন্ড সুয়্যারেজ অথরিটি) গঠন করা হলেও এ পর্যন্ত কোন সুয়্যারেজ ব্যবস্থা গড়ে উঠেনি। নগরীর প্রায় ৫০ লাখ লোক কর্তৃক প্রতিদিন ব্যবহূত পানিসহ পয়োঃবর্জ্য কোন প্রকার পরিশোধন ছাড়া কর্ণফুলী নদীতে পড়ছে। ইতিমধ্যে ওয়াসা কর্তৃক নেয়া আরো একাধিক পানি উত্পাদন প্রকল্প গ্রহণ করায় পানির পরিমাণও বাড়বে। ফলে কর্ণফুলী নদীতে দূষিত পানি পড়ার পরিমাণও বাড়বে। তাই পয়োঃবর্জ্যসহ দূষিত পানির পরিশোধন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে না পারলে নদীর দূষণমাত্রা দিনদিন বাড়বে। কর্ণফুলী নদীর দূষণের অন্যতম একটি কারণ হচ্ছে এর দু’পাশে এবং তত্সংলগ্ন এলাকায় গড়ে ওঠা সাড়ে ৬শ ছোট-বড় কল-কারখানার বর্জ্য। পেপার মিল, রেয়ন মিল, সার কারখানা, অয়েল রিফাইনারী, সিমেন্ট কারখানা, ডাইং, ওয়াশিং, ট্যানারি শিল্পসহ বিভিন্ন প্রকার মিল কল-কারখানার বর্জ্য কর্ণফুলী নদী দূষণের জন্য দায়ী। জানা যায়, চট্টগ্রামের বেশ কিছু কারখানায় বর্জ্য পরিশোধনাগার নির্মাণ করা হচ্ছে বলে জানা যায়। কিন্তু এ সকল বর্জ্য পরিশোধনাগার (ইটিপি) সবসময় চালানোর ক্ষেত্রে কারখানা কর্তৃপক্ষের গাফিলতি রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া প্রতিদিন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন এলাকার ব্যবসায়ী ও শিল্প কল-কারখানার মালিকদের সাথে পৃথক পৃথক মতবিনিময় সভার আয়োজন করছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিচালক মো. জাফর আলম জানান, কর্ণফুলীকে রক্ষায় এখনই সংশ্লিষ্ট সকলকে ভূমিকা রাখতে হবে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির নিকট তাদের করণীয় বিষয়ে মতবিনিময় হবে।