মোদী সরকারও সুসম্পর্ক রাখবে

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ভারতের সঙ্গে সু-সম্পর্ক বজায় রাখতে পারবো। নরেন্দ্র মোদীর নিজস্ব ধ্যান-ধারণা আছে। এখন তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। আমি আশা করি, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনিও প্রতিবেশীদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার বিষয়ে নিজস্ব ভূমিকা পালন করবেন। বুধবার সকালে জাপানের রাজধানী টোকিওতে জাতীয় প্রেসক্লাবে স্থানীয় মিডিয়ার প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলাপকালে একথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার ব্যাপারে দৃঢ় আশা ব্যক্ত করে বলেন, ভারতসহ প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে যে কোনো সমস্যা দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব। নীতিগত ভিন্নতা থাকা খুবই স্বাভাবিক বিষয়। কিন্তু কোনো সমস্যা তৈরি হলে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা যেতে পারে। নরেন্দ্র মোদী ভারতের নতুন প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ায় বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে কোনো বাধা তৈরি হবে কিনা—জাপানের এক সাংবাদিকের এমন প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা উপরোক্ত মন্তব্য করেন। এ প্রসঙ্গে তিনি ১৯৯৭ সালে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার প্রথম মেয়াদকালে ভারতের সঙ্গে গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির কথা উল্লে¬খ করেন। গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির কারণে এ নিয়ে দু’দেশের দীর্ঘদিনের বিরোধের অবসান হয়। তিনি পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তির কথাও উল্লেখ করেন। পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ায় দু’দশকের জঙ্গিবাদের অবসান ঘটে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের পররাষ্ট্রনীতি খুবই স্পষ্ট—সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারো সঙ্গেই বৈরিতা নয়। আমরা যখন থেকে সরকার গঠন করেছি, প্রতিবেশির সঙ্গে ভাল সম্পর্ক বজায় রাখতে পেরেছি’। ভারতেরও একটি পররাষ্ট্রনীতি আছে উল্লে¬খ করে তিনি বলেন, আশা করব তারা সে নীতি অনুসরণ করবে। শেখ হাসিনা তার তিন ধাপে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনকালীন ভারতের সঙ্গে যোগাযোগের কথা উল্লেখ করে বলেন, ভারতে ক্ষমতাসীন চারটি পৃথক রাজনৈতিক দলের সরকারের সঙ্গে তিনি কাজ করেছেন এবং সর্বশেষ মোদী সরকার হচ্ছে তার মেয়াদে পঞ্চম। তিনি বলেন, ‘জনগণকে কিভাবে রক্ষা করতে, নিরাপত্তা দিতে ও ভাল রাখতে হয় তা আমি জানি। ভৌগোলিক কারণে বাংলাদেশ ছোট ও ভারত একটি বড় দেশ হতে পারে, কিন্তু জনসংখ্যার বিবেচনায় আমরাও একটি বড় দেশ। বাংলাদেশ একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র এবং আমরা আমাদের জনগণের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পেরেছি’। প্রতিবেশি দেশগুলোর প্রতি সব সময় বন্ধুত্বের কথা উল্লে¬খ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি সব সময় বলে আসছি যে আমাদের অভিন্ন শত্রু দারিদ্র্য এবং এর বিরুদ্ধে আমরা একত্রে লড়াই করছি। তিনি বলেন, ‘আমি সব সময়ই প্রতিবেশি রাষ্ট্রগুলোকে গুরুত্ব দিয়েছি, যেন আমরা একে অপরকে সহযোগিতার মাধ্যমে আমাদের জনগণের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক মুক্তি নিশ্চিত করতে পারি’। জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিলের অস্থায়ী আসনে বাংলাদেশ জাপানকে সমর্থন করবে কি-না, এমন এক প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশ ও জাপান বন্ধুত্বপূর্ণ দুটি রাষ্ট্র এবং ঢাকা টোকিওর এ বন্ধুত্বের গুরুত্ব দেয়। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে জাপানের সর্বাত্মক সহায়তার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘কেবল জাপানের সাধারণ জনগণই নয়, জাপানি স্কুল শিশুরাও তাদের টিফিনের অর্থ বাংলাদেশের শরণার্থী ও তাদের শিশুদের জন্য প্রদান করে অবদান রেখেছে’। প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, শুধু এটাই নয়, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যখন যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনের কাজ শুরু করলেন, তখন যে কয়েকটি দেশ সহযোগিতায় এগিয়ে এসেছিল, জাপান তাদের অন্যতম। তিনি বলেন, ‘আমরা সব সময়ই জাপানের সহযোগিতার কথা কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করি। জাপান আমাদের পরীক্ষিত বন্ধু এবং বাংলাদেশ পরীক্ষিত এ বন্ধুর জন্য যে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণে প্রস্তুত’। শেখ হাসিনা বলেন, তিনি ইতোমধ্যে জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো অ্যাবেকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন এবং আশা প্রকাশ করেন এ বছরের আগস্টের শেষনাগাদ তিনি ঢাকা সফর করবেন। তিনি বলেন, সফরকালে জাপানের জনগণ নিশ্চয় একটি ভাল খবর পাবেন। যদিও এ মুহূর্তে তিনি ওই বিষয়টি নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে চান না। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি ফিরে গিয়ে বিষয়টি নিয়ে আমার মন্ত্রিসভার সদস্যদের সঙ্গে অলোচনা করব। তবে আমরা অবশ্যই জাপানের সঙ্গে বন্ধুত্বকে গুরুত্ব দেব’। এর আগে লিখিত ভাষণে তিনি বলেন, জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো অ্যাবের সঙ্গে তার ফলপ্রসূ আলোচনার পর দু’দেশের মধ্যেকার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আরো উচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে জাপান-বাংলাদেশ ব্যাপকভিত্তিক অংশীদারিত্বের সূচনা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতি অক্ষুণ্ন রাখার লক্ষ্যে একাধিক বৃহত্ অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নে সহযোগিতার জন্যও তিনি অ্যাবেকে অনুরোধ করেন। দ্বিপক্ষীয় ব্যবসা-বাণিজ্য প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তিনি জাপানের প্রধানমন্ত্রীর কাছে দু’দেশের বাণিজ্যে বিদ্যমান ভারসাম্যহীনতা অপসারণে বাংলাদেশের নিটওয়্যারের জন্য ‘রুলস অব অরিজিন’ শিথিল এবং অন্যান্য পণ্যের শুল্ক মুক্ত বাজার সুবিধার অনুরোধ জানিয়েছেন। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী অ্যাবে বিষয়গুলো আন্তরিকভাবে বিবেচনা করার আশ্বাস দিয়েছেন। শেখ হাসিনা জাপানি উদ্যোক্তাদের বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে ৫টি রপ্তানি প্রক্রিয়া জোনে ৪০টি প্ল¬ট এবং ২টি কারখানা ভবন নির্মাণের জন্য জমি বরাদ্দ দেয়ার লক্ষ্যে দু’দেশের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের কথা উল্লে¬খ করেন। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী অ্যাবে তাকে আশ্বস্ত করেছেন যে, এখন থেকে জাপান সরকারের বৃত্তির সংখ্যা বৃদ্ধির মাধ্যমে আরো অধিক সংখ্যক বাংলাদেশি সরকারি কর্মকর্তা এবং ছাত্র জাপানে অধ্যয়নের সুযোগ পাবে। জাপানকে বাংলাদেশের উন্নয়নের একনিষ্ঠ ও বৃহত্তম অংশীদার উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, দু’দেশের এ বন্ধুত্ব পারস্পরিক আস্থা, শ্রদ্ধা ও সহযোগিতার উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, দু’দেশ ও এর জনগণের শান্তি, অগ্রগতি ও সমৃদ্ধির লক্ষ্যে এ অংশীদারিত্বের বন্ধুত্ব অটুট থাকবে। প্রধানমন্ত্রী ঢাকার পথে জাপানে চারদিনের সরকারি সফর শেষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আজ বৃহস্পতিবার দেশে ফিরছেন। প্রধানমন্ত্রীকে বহনকারী বাংলাদেশ বিমানের ভিভিআইপি ফ্লাইট আজ সকাল সাতটায় হজরত শাহজালাল (রঃ) আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে অবতরণ করবে। স্থানীয় সময় বুধবার রাত পৌনে বারটায় প্রধানমন্ত্রী টোকিও’র হানেদা আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর ত্যাগ করেন। হংকং আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে দেড় ঘন্টার যাত্রাবিরতি করেন প্রধানমন্ত্রী। টোকিও’র হানেদা বিমান বন্দরে জাপানে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মাসুদ বিন মোমেন ও জাপানের রাষ্ট্রাচার প্রধানমন্ত্রীকে বিদায় জানান। গত ২৫ মে প্রধানমন্ত্রী জাপান সফরে যান।