বাংলাদেশি রক্ষীরা শান্তির জন্য জীবন দিচ্ছেন
প্রকাশ : ২৮ মে ২০১৪, ২৩:১৩
শান্তিরক্ষা মিশনে অনন্য অবদান রেখে চলেছে বাংলাদেশের শান্তিরক্ষা বাহিনী। বিশ্বের বিভিন্ন যুদ্ধ বিধ্বস্ত অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠা ও মানবাধিকার রক্ষায় ইতিমধ্যে জাতিসংঘের পরীক্ষিত বন্ধু হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছে বাংলাদেশ। এ পর্যন্ত মিশনে ১ লাখ ২৬ হাজার ৪৮৯ জন বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী অংশগ্রহণ করেছেন। মোট ৬৮টি মিশনের মধ্যে ৫৪টিতেই যোগ দিয়েছে বাংলাদেশ। এ মুহূর্তে ৮ হাজার ৮৪১ জন শান্তিরক্ষী বিভিন্ন মিশনে রয়েছেন। যা বিশ্বের মধ্যে সর্বোচ্চ। শান্তিরক্ষা করতে গিয়ে ১১৮ জন শান্তিরক্ষী জীবন দিয়েছেন।
আজ বুধবার বিশ্ব শান্তিরক্ষী দিবস। দিবসটি উদযাপন উপলক্ষে রাষ্ট্রীয়ভাবে নানা কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। সকালে ‘পিসকিপার্স রান’-এর মাধ্যমে শান্তিরক্ষী দিবসের কর্মসূচি শুরু হবে। বিকালে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত অনুষ্ঠানে শহীদ শান্তিরক্ষীদের নিকট-আত্মীয় ও আহতদের সংবর্ধনা দেয়া হবে। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা থেকে রাত সাড়ে ৯টা পর্যন্ত উন্মুক্ত থাকবে প্রদর্শনী।
সেনাবাহিনী সূত্রে জানা যায়, ১৯৮৮ সালে ইরাক-ইরান শান্তি মিশনে সেনাবাহিনীর ১৫ জন সদস্যের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে শুরু হয় শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের পথচলা। ১৯৯৩ সালে বাংলাদেশ নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনী শান্তিরক্ষী মিশনে যোগ দেয়। ১৯৮৯ সালে নামিবিয়া মিশনের মাধ্যমে বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনী জাতিসংঘ পরিবারের সদস্য হয়।
‘সবার প্রতি বন্ধুত্ব কারো প্রতি বৈরিতা নয়’ বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির এই মূল মন্ত্রে দীক্ষিত বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী ও পুলিশ বাহিনী দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে যোগ দিচ্ছে। সশস্ত্রবাহিনীর সদস্যরা মিশন এলাকায় সংঘাতে জড়িত দলকে নিরস্ত্রকরণ, সংঘাতপূর্ণ এলাকা থেকে মাইন অপসারণ, সুষ্ঠু নির্বাচনে সহায়তা, অবকাঠামো ও স্থাপনা নির্মাণে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। সেনাবাহিনীর প্রায় ২শ আর্মার্ড পারসোন্যাল ক্যারিয়ার, অস্ত্র, গোলাবারুদ ও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক যানবাহন ব্যবহার হচ্ছে মিশনে। বাংলাদেশ নৌবাহিনীর যুদ্ধ জাহাজ ওসমান ও মধুমতি লেবানন ও ভূমধ্যসাগরীয় এলাকায় নিয়োজিত আছে। বিমান বাহিনীর বিআর-১৩০ এয়ারক্রাফট, এমআই-১৭ ও বেল হেলিকপ্টারের মাধ্যমে কঙ্গো ও আইভরিকোস্টে জরুরি সামরিক সরঞ্জাম পরিবহন, উদ্ধার অভিযান ও ত্রাণ তত্পরতা চালানো হচ্ছে। এসব যানবাহন ও সরঞ্জামাদি ভাড়া বাবদ বাংলাদেশের বছরে রাজস্ব আয় হয় কোটি কোটি টাকা।
পুলিশের শান্তিরক্ষী সদস্যরা সংশ্লিষ্ট দেশের প্রশাসনকে সহায়তা প্রদান, দাঙ্গা দমন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় সহায়তা করে আসছে। পরিবর্তিত বিশ্বের ক্রমবর্ধমান চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বাংলাদেশের শান্তিরক্ষী সদস্যরা বিচক্ষণতা, পেশাদারিত্ব ও বুদ্ধিদীপ্ত কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট দেশের প্রশাসনকে সহায়তা করছে। দুর্গত, নিপীড়িত ও নিরীহ মানুষের সেবায় বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের হাত সর্বদা প্রসারিত। বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের ভালোবাসার প্রতিদানস্বরূপ সিয়েরালিওনের প্রেসিডেন্ট ড. আহমদ তেজান বাংলাকে দ্বিতীয় রাষ্ট্রভাষা ঘোষণা করেছেন।
শান্তি প্রতিষ্ঠায় এ পর্যন্ত ১১৮ জন বাংলাদেশি বীর সন্তান নিজেদের জীবন উত্সর্গ করেছেন। আহত হয়েছেন ১৫৫ জন। এরমধ্যে সেনাবাহিনীর ১৩৯ জন, নৌবাহিনীর ২ জন, বিমানবাহিনীর ৫ জন এবং পুলিশের ৯ জন সদস্য।
বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী বাহিনীর শান্তি, নিরাপত্তা ও মহত্ কাদের জন্য জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন প্রশংসায় পঞ্চমুখ।
বর্তমানে জাতিসংঘ সদরদপ্তরের বাইরে ৯টি দেশে মিশনে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী রয়েছে। দেশগুলো হচ্ছে- লাইবেরিয়া, আইভরিকোস্ট, দক্ষিণ সুদান, কঙ্গো, দারফোর, পশ্চিম সাহারা, লেবানন, হাইতি ও ইতালি। এ সকল মিশনে সেনাবাহিনীর ৬ হাজার ১৬৯ জন, নৌবাহিনীর ৩৯৫ জন, বিমানবাহিনীর ৫০৬ ও পুলিশের ১ হাজার ৮৬৬ জন সদস্য দায়িত্বরত।
পুলিশ সদরদপ্তর সূত্রে জানা যায়, বর্তমান ৬টি দেশের মিশনে পুলিশ সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছে। এর মধ্যে মহিলা পুলিশও রয়েছে। এ পর্যন্ত ১৯টি দেশে মিশন সম্পন্ন করা হয়েছে। জাতিসংঘ মিশনে পুলিশের মধ্যে সর্বোচ্চ অংশগ্রহণকারী দেশ হলো বাংলাদেশ। বর্তমানে প্রতিমাসে শুধু পুলিশের মাধ্যমে প্রায় ৩৩ কোটি টাকা রাজস্ব আয় হচ্ছে। শুরু থেকেই এ পর্যন্ত শুধু পুলিশের মাধ্যমে প্রায় ২ হাজার ২৬৩ কোটি টাকা রাজস্ব আয় হয়েছে। বছরে প্রায় ৪০২ কোটি টাকা রাজস্ব আয় হচ্ছে। পুলিশের মহাপরিদর্শক হাসান মাহমুদ খন্দকার বলেন, বাংলাদেশ পুলিশ পেশাদারিত্ব, সক্ষমতা, মেধা, আনুগত্য ও শৃঙ্খলার কারণে মিশনে অনেক প্রশংসা কুড়িয়েছে। পুলিশ প্রধান হিসেবে এজন্য তিনি গর্বিত।
বিগত ১৩ বছরে সেনাবাহিনী কর্তৃক ১৩ হাজার ৫৫ কোটি ২১ লাখ ১ হাজার ৭৭২ টাকা অর্জিত হয়েছে।