ছোটকাগজ ‘সময়’-এর ডা. লুত্ফর রহমান সংখ্যা

বিস্মৃতির দায়মুক্তি

সময় শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতি বিষয়ক পত্রিকা ডা. লুত্ফর রহমান সংখ্যা বর্ষ ৮ সংখ্যা ৪ আশ্বিন ১৪২০ অক্টোবর ২০১৩ সম্পাদক :সজল আহমেদ প্রচ্ছদ : সব্যসাচী হাজরা মূল্য : ২৫০ টাকা। উনিশ শতকে, বাংলা গদ্যসাহিত্যের উন্মেষপর্বে সামাজিক হিতসাধন ছিল গদ্যচর্চার অন্যতম লক্ষণ। সামাজিক সংস্কার ও ধর্ম-বিষয়ক বিতর্ককে ঘিরে এসময় রচিত হয়েছে বিপুল পরিমাণ গদ্য। এক পক্ষের লেখকরা পাশ্চাত্যের ভাবনাদর্শে সমাজের সংস্কার চাইলেন, অন্যপক্ষ নিজেদের ধর্ম-দর্শন-রুচি-প্রথাকে অক্ষুণ্ন রাখার পক্ষপাতী হলেন। তবে দু-পক্ষেরই উদ্দেশ্য ছিল সমাজের মঙ্গল-ভাবনা। মাঙ্গলিক সেই জীবন-বীক্ষার অন্যতম কাণ্ডারি ডা. মোহাম্মদ লুত্ফর রহমান (১৮৮৯-১৯৩৬)। যশোরের পারনান্দুয়ালী গ্রামে জন্মগ্রহণকারী লুত্ফর রহমান পেশায় ছিলেন একজন হোমিওপ্যাথিক ডাক্তার। বাংলাদেশে দীর্ঘদিন জনপ্রিয় ছিল তাঁর ‘মহত্ জীবন’, ‘উন্নত জীবন’, ‘ধর্ম জীবন’, ‘মহা জীবন’ ইত্যাদি গ্রন্থসমূহ। মানবতাবাদী ও নীতিবাদী তাঁর রচনাসমূহ মুসলমান সমাজে ব্যাপকভাবে পঠিত হয়েছে। তরুণদের নৈতিক, উন্নত ও প্রত্যয়ী জীবনাদর্শ নির্মাণের লক্ষ্য ছিল তাঁর। ধর্মীয় প্রথা পালনের চেয়ে ধর্মের অন্তঃসারকে তিনি পাঠকের সামনে তুলে ধরেছেন, যার মূল প্রতিপাদ্য—মানুষের মুক্তি, সমষ্টির কল্যাণ। পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় নারী-নিঃগ্রহের বেদনাও তাঁকে স্পর্শ করেছে। তাঁর ‘নারীতীর্থ’ সংগঠন ও ‘নারীশক্তি’ নামক পত্রিকা সেই বেদনাতাড়িত উপলব্ধি থেকেই উত্সারিত নারীর ভাগ্যোন্নয়নের সাহসী উদ্যোগ। গদ্য ছাড়াও তিনি লিখেছেন কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটক, শিশুসাহিত্য। এসব রচনার মর্মসারও মানবপ্রীতি, নৈতিক আলোকে উজ্জীবনের দীক্ষা। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক যে, একদার এই কিংবদন্তি সমকালীন যুগরুচির প্রগলভতায় হারিয়ে যেতে বসেছেন। অবশ্য আশার কথা, বর্তমানে বিস্মৃতপ্রায় এই মহাত্মা লেখক ও তাঁর সৃষ্টির সামগ্রিক মূল্যায়নকে নতুন করে পাঠকের সামনে হাজির করলেন কবি ও ধীমান সম্পাদক সজল আহমেদ, তাঁর সম্পাদিত ‘সময়’ পত্রিকাটির মাধ্যমে। সন্দেহ নেই, তাঁর এই স্মরণীয় উদ্যোগ ও পরিশ্রমী প্রচেষ্টা হারিয়ে-যাওয়া সাহিত্যিকের প্রতি অমলিন দায়বোধের এক উজ্জ্বল সংযোজন হয়ে থাকবে। ‘সময়’ পত্রিকার তিন-শ ষাট পৃষ্ঠার বিপুলায়তন এই সংখ্যাটি ‘ডা. লুত্ফর রহমান সংখ্যা’ হিসেবে ঘোষিত হয়েছে। পুনর্মুদ্রিত ও নতুন প্রবন্ধ মিলিয়ে মুদ্রিত লেখার সংখ্যা পঞ্চাশটি। লুত্ফর রহমান সম্পর্কে আগ্রহী পাঠক ও গবেষকের জন্য এতগুলো প্রবন্ধ এক মলাটে পাওয়া নিঃসন্দেহে অমূল্য প্রাপ্তি। পাঠকের সুবিধার্থে সম্পাদক প্রবন্ধগুলোকে শ্রেণিকরণ করেছেন এগারটি উপশিরোনামে। ‘মূল্যায়ন’ পর্বে সংযোজিত হয়েছে ডা. লুত্ফর রহমানের চিন্তা-দর্শন, সাহিত্যকর্ম, নীতিবাদ, নারী-ভাবনা, সামাজিক গুরুত্ব প্রভৃতি বিষয়কে উপজীব্য করে রচিত প্রবন্ধসমূহ। বাংলাদেশের খ্যাতিমান প্রাবন্ধিকদের এসব মূল্যায়ন পত্রিকাটির গুরুত্ব বৃদ্ধি করেছে। লেখক-তালিকায় আছেন মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন, সৈয়দ আলী আহসান, আনিসুজ্জামান, আশরাফ সিদ্দিকী, খোন্দকার সিরাজুল হক, আবুল কাশেম ফজলুল হক, আবুল মোমেন, মফিদুল হক, ইসরাইল খান, আল মাহমুদ, আলম তালুকদার, তিতাস চৌধুরী, হাবিব রহমান প্রমুখ। ‘প্রবন্ধ আলোচনা’ পর্বে লুত্ফর রহমানের ‘মহত্ জীবন’, ‘উচ্চ জীবন’, ‘উন্নত জীবন’, ‘ধর্ম জীবন’, ‘মহা জীবন’ গ্রন্থগুলোর ওপর আলোকপাত করা হয়েছে। এসব গ্রন্থের স্বতন্ত্র মূল্যায়নধর্মী প্রবন্ধের সন্নিবেশ অত্যন্ত তাত্পর্যপূর্ণ। এ পর্বে লিখেছেন, আহমাদ মাযহার, কাবেদুল ইসলাম, বিশ্বজিত্ ঘোষ, মমতাজ আরা খুশী, মাসুদুল হক ও রেজাউদ্দিন স্টালিন। এঁদের প্রবন্ধে গ্রন্থসমূহের আলোকে লুত্ফর রহমানের চিন্তাসূত্র ও হিতবাদী মনোভঙ্গির সারাত্সার উঠে এসেছে। প্রবন্ধের জন্য খ্যাতিমান হলেও ডা. লুত্ফর রহমান কবিতা, উপন্যাস, গল্প, নাটক ও শিশুসাহিত্য রচনা করেছেন। তাঁর সেসব রচনার মূল্যায়ন নিয়ে সাজানো হয়েছে পাঁচটি পর্ব। ‘উপন্যাস আলোচনা’ অংশে লুত্ফর রহমানের ‘রায়হান’, ‘বাসর উপহার’, ‘পথহারা’, ‘সরলা’ ও ‘প্রীতি উপহার’ উপন্যাস নিয়ে স্বতন্ত্র প্রবন্ধে আলোচনা করেছেন যথাক্রমে—অনীক মাহমুদ, তপন বাগচী, শামস্ আলদীন, সাজ্জাদুর রহমান এলিন ও সেলিমা সাঈদ। ‘সাক্ষাত্কার’ পর্বে প্রকাশিত হয়েছে সওগাত পত্রিকার সম্পাদক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন-এর সাক্ষাত্কার। সাক্ষাত্কারটি পত্রিকার একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। এর মাধ্যমে ডা. লুত্ফর রহমানের ব্যক্তিজীবন, চিন্তা ও কর্মের বিভিন্ন অজানা তথ্যের সন্ধান পাবেন পাঠক। ‘স্মৃতিচারণ’ পর্বে প্রকাশিত হয়েছে গোলাম মোস্তফা ও খান মুইনুদ্দীনের লেখা। এছাড়া, লেখকের অপ্রকাশিত পাণ্ডুলিপি (‘স্বামী-স্ত্রী’ ও ‘স্বর্গতোরণ’) নিয়ে ‘অপ্রকাশিত সাহিত্যকর্ম আলোচনা’ পর্বে সন্নিবেশিত হয়েছে দুটি প্রবন্ধ। পরিশিষ্ট অংশে ডা. লুত্ফর রহমান একাডেমি ও ডা. লুত্ফর রহমান স্মৃতি পাঠাগার নিয়ে দুটি প্রবন্ধ, লুত্ফর রহমানের জীবনপঞ্জি ও আলোকচিত্র সংযোজিত হয়েছে। সব মিলিয়ে সজল আহমেদ সম্পাদিত ‘সময়’ পত্রিকার এই বিশেষ সংখ্যাটি স্মারক গ্রন্থেরই মর্যাদাবহ। ঔপনিবেশিক পর্বে বাঙালি মুসলমানের চিন্তাধারা, উন্নত জীবনতৃষ্ণা ও মূল্যবোধ নির্মাণে যাঁরা অগ্রগণ্য, ডা. লুত্ফর রহমান নিঃসন্দেহে তাঁদের গোত্রভুক্ত। তাঁর চিন্তা ও কর্মের মূল্যায়ন এমন বিপুল পরিসরে উপস্থাপন করে ‘সময়’ পত্রিকা তাঁকে যেন পুনর্জন্ম দিল, দায় মেটাল বিস্মৃতিপ্রবণ জাতির। প্রত্যাশা করি, পত্রিকাটি পাঠকের কাছে সমাদৃত হবে।