উত্তরাঞ্চলে পানির সঙ্কট
প্রকাশ : ২৯ মে ২০১৪, ২২:২৭
উত্তরাঞ্চলে পানি লইয়া যেই সঙ্কট উত্তরোত্তর বাড়িতেছে, তাহা বৃহত্ বিপদের ক্ষুদ্র আলামত মাত্র। বিগত কয়েক বত্সর ধরিয়া এই সংবাদ যেন খুব সাধারণ হইয়া উঠিয়াছে যে, ক্রমশ নিম্নমুখী হইতেছে এতদাঞ্চলের জেলাসমূহে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর। এই ঘনায়মান প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের হাত ধরিয়া নূতন সঙ্কট তৈয়ার হইতেছে সেচ ও খাবার পানি লইয়া। এই অঞ্চলে বত্সরের পর বত্সর ধরিয়া বোরো মৌসুমে অপরিকল্পিতভাবে পানি উত্তোলনের ঘটনা ছিল অতি স্বাভাবিক। পানির স্তর দিন দিন নিম্নমুখী হওয়াায় অগভীর নলকূপের স্থলে গভীর নলকূপ বসাইয়া সেই সেচকার্য অব্যাহত রাখা হইয়াছে। ইহাকেই যেন মনে করা হইত চিরস্থায়ী ব্যবস্থা। ইহা নিশ্চয়ই চিরস্থায়ী ব্যবস্থা হইতেই পারিত যদি যেই পরিমাণ পানি ভূগর্ভ হইতে উত্তোলন করা হয়, তাহা যথাযথভাবে পূর্ণ হইয়া যাইত বর্ষা মৌসুমে। প্রকৃতির নিয়ম তেমনটাই। কিন্তু সেই নিয়মের পূর্ব শর্ত হইল, ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন করা যাইবে না যথেচ্ছভাবে। তাহা করিলে যাহা ঘটিবার তাহাই ঘটিতেছে—দ্রুত নামিয়া যাইতেছে পানির স্তর। আর তাহাতে বিপদ আসিতেছে দশ দিক দিয়া।
রাজশাহী মহানগরীতে বিশুদ্ধ পানির সঙ্কটের মাত্রা বিগত কয়েক বত্সরে বাড়িয়া যাইতেছে। কেননা, রাজশাহী ওয়াসার বেশিরভাগ গভীর নলকূপে পানি হ্রাস পাইয়াছে ভূগর্ভস্থ পানিস্তর আরও নিম্নমুখী হইয়া। যান্ত্রিক কারণ হিসাবে ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্টসমূহ মাঝেমধ্যে নষ্ট হইলেও তাহার মীমাংসা মানুষেরই হাতে। চারটি ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট প্রায় এক দশক ধরিয়া বন্ধ থাকিলেও আজ অথবা আগামীতে সেই সমস্যার সমাধান হইবে নিশ্চয়ই। শিগগিরই আরও সাতটি পাম্প চালুর কথা শোনাও গিয়াছে। বসানো হইবে আরও ১০টি পাম্প। তাহাতে ওই নগরীর পানির সঙ্কট ন্যূনতম পর্যায়ে চলিয়া আসিবে। কিন্তু বৃহত্তর যেই সঙ্কট ঘনাইয়া আসিতেছে, তাহার কী হইবে? বর্তমানে সেচের সময় এত বেশি পানি উত্তোলন করা হয় যে, বর্ষা মৌসুমে ভূগর্ভে পানি সঞ্চয় হইয়া আগের অবস্থানে ফিরিয়া আসিতে পারিতেছে না। ফলে ফি বত্সর কয়েক ইঞ্চি করিয়া নামিয়া যাইতেছে পানির স্তর। নদীসমূহের নাব্যতা হ্রাস, নদী দখল, সময়মতো বৃষ্টিপাত না হইবার মতো বিবিধ কারণেও বরেন্দ্র অঞ্চলের ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নামিয়া যাইতেছে। পানি সঙ্কটের প্রধান কারণ এইখানেই। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা প্রায়শই বলিয়া থাকেন, যত বেশি ভূগর্ভস্থ পানি তোলা হইবে, ততই তাড়াতাড়ি নষ্ট হইবে মাটির উপরিস্থ স্তরের স্থিতাবস্থা। তাহাতে খুব অল্প তীব্রতার ভূমিকম্প কিংবা সামান্য বন্যাতেই মাটির ধস নামিতে পারে সহজেই। মাটির তলায় পানি কমিয়া গেলে যেই সকল গাছ অনেক গভীরে শেকড় দিয়া রস টানিতে পারে, তাহারাই শুধু টিকিয়া থাকে। অথচ অসংখ্য ক্ষুদ্র বৃহত্ বৃক্ষ প্রজাতি রহিয়াছে যাহারা মাটির অগভীর স্তরের পানির ওপর নির্ভর করিয়াই বাঁচিয়া থাকে। তাহাছাড়া ভূগর্ভস্থ পানি অধিক হারে উত্তোলনের ফলে ভারসাম্য ভয়াবহভাবে নষ্ট হইয়া যাইবে মাটির নীচেও। ভূ-স্তরে ভূমি ধস ঘটিবে। আর্সেনিক-ফ্লুরাইড-লৌহের মতো মৌল আরও বেশি বেশি করিয়া পানিতে মিশিবে। পানির অগভীর স্তর শেষ হইলে প্রথমে বসতবাড়ির টিউবওয়েলে পানি উঠিবে না। বরেন্দ্র অঞ্চলে অনেক স্থানে এখন বর্ষাকালেও টিউবওয়েলে পানি উঠিতেছে না। বিপরীতে, গভীর নলকূপ হইতে যেই পানি উত্তোলন করা হইতেছে তাহাতে আর্সেনিকের দূষণ ঘটিতেছে। অর্থাত্ বিশুদ্ধ খাবার পানি পাইবার সমস্যা আগামীতে আরও বৃদ্ধি পাইবে বৈ কমিবে না।
এমত সমস্যা সমাধানে অতিসত্বর ভূপৃষ্ঠের পানির ব্যবহার বৃদ্ধি করিতে হইবে। উপরিভাগে নদীর পানি ধরিয়া রাখিবার আধুনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করিতে হইবে যাহাতে বর্ষায় অতিরিক্ত পানি সঞ্চয় করা সম্ভব হয়। বলা হইয়া থাকে, তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ বাধিবার কারণ হইতে পারে মিঠা পানি। সুতরাং স্বল্পকালীন নহে, পরিকল্পনা করিতে হইবে দীর্ঘকালীন ভবিষ্যতের কথা মাথায় রাখিয়া।