ট্যু রি জ ম ব্যাং কিং উ ই ন্ডো
বদলে দিতে পারে পর্যটন শিল্পের চেহারা
প্রকাশ : ৩০ মে ২০১৪, ১৯:৪৪
২০১৪-১৫ অর্থবছরের বাজেটে পর্যটন খাতে নিয়োজিত মানবসম্পদ উন্নয়নে বিশেষ বরাদ্দের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশের ট্যুর অপারেটর এসোসিয়েশন। দক্ষ ট্যুরিস্ট গাইড গড়ে তুলতে আধুনিক প্রশিক্ষণের ব্যাপারে তারা জোর দিয়েছে। পর্যটন শিল্পের উন্নয়নের পথে সুদক্ষ, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত অভিজ্ঞ ট্যুরিস্ট গাইডের অভাব বিরাট বাধা সৃষ্টি করছে। বিদেশে সর্বত্র প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ট্যুরিস্ট গাইডের তালিকা থাকে। বাংলাদেশ পর্যটনের ক্ষেত্রে দারুণ সম্ভাবনাময় একটি দেশ হলেও এখানে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত অভিজ্ঞ ট্যুরিস্ট গাইডের কোনো তালিকা নেই।
বর্তমানে বাংলাদেশের পর্যটন খাত জিডিপিতে যেমন গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে, তেমনিভাবে পর্যটন শিল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত রয়েছে এদেশের প্রায় ২৮ লাখ মানুষ। এক্ষেত্রে দক্ষ অভিজ্ঞ মানুষের অভাবে পর্যটন খাত যতোটা চাঙ্গা হওয়া প্রয়োজন ঠিক ততোটা হতে পারছে না। মোটকথা, দক্ষ অভিজ্ঞ জনশক্তির অভাবে বাংলাদেশের পর্যটন শিল্প প্রত্যাশা অনুযায়ী সমৃদ্ধি অর্জন করতে পারছে না। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে সরকার বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের জন্য ৩০৮ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছিল। এর মধ্য থেকে পর্যটন খাত মাত্র ৪৩ কোটি টাকা পেয়েছে।
গত ২০১৩ সালের শেষদিকে বাংলাদেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সহিংসতায় পর্যটন খাতে যে বিরাট ক্ষতি হয়েছে সেটা সহজে পূরণ হওয়ার মতো নয়। যেসব বিদেশি পর্যটক ছুটি কিংবা পারিবারিক ভ্রমণে বাংলাদেশে আসার জন্য হোটেল বুকিং দিয়ে রেখেছিলেন তা প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে বাতিল করে দিতে বাধ্য হয়েছিলেন। এভাবেই পর্যটকশূন্য হয়ে পড়েছিল বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন স্পটগুলো। পরিস্থিতি উন্নত হওয়ার পর বাংলাদেশের পর্যটন খাত আবার অনেকটাই প্রাণ ফিরে পেয়েছে। পর্যটন ব্যবসায় নিয়োজিত উদ্যোক্তা, বিনিয়োগকারী, ট্যুর অপারেটরদের দাবি— এখাতে সরকারের পক্ষ থেকে আরো সুযোগ-সুবিধা দিতে নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। পর্যটন খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধিসহ উদ্যোক্তাদের জন্য আর্থিক সহযোগিতা ঋণ প্রদানের নানা স্কিম গ্রহণের মাধ্যমে এ খাতকে আরো এগিয়ে নিতে বিশেষ ব্যাংকিং সেবা প্রদানের ব্যাপারে উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।
একথা মানতেই হবে, বাংলাদেশের পর্যটন খাত অত্যন্ত সম্ভাবনাময় একটি খাত। অনেক সীমাবদ্ধতা, ত্রুটি-বিচ্যুতির পরেও পর্যটন খাত থেকে ভালো একটি পরিমাণ অর্থ উপার্জন করছে বাংলাদেশ। ওয়ার্ল্ড ট্রাভেল এন্ড ট্যুরিজম কাউন্সিলের সাম্প্রতিক তথ্যানুযায়ী বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পের সঙ্গে সরাসরি বিভিন্ন কাজে নিয়োজিত ছিলেন ১৭,৮৫,০০০ মানুষ ২০১২ সালে। এটা দেশের মোট কর্মসংস্থানের ১ দশমিক ৮ শতাংশ ছিল। বিশ্বে ১৭৮টি দেশের মধ্যে পর্যটনের কাজে নিয়োজিত লোকসংখ্যার বিচারে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৫৭তম। সরাসরি এবং পরোক্ষভাবে পর্যটন খাতে বিভিন্ন কাজে নিয়োজিতের সংখ্যা ২৭,১৪,৫০০ জন মানুষ, অর্থাত্ দেশের মোট কর্মসংস্থানের ৩ দশমিক ৭ শতাংশ। ওয়ার্ল্ড ট্রাভেল এন্ড ট্যুরিজম কাউন্সিল আগাম ভবিষ্যদ্বাণী করে জানিয়েছে, আগামী ২০২৩ সাল নাগাদ বাংলাদেশে ১৭,৮৫,০০০ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে পর্যটন শিল্পে। সবমিলিয়ে তখন এ খাতে মোট ৩৮,৯১,০০০ মানুষ বিভিন্নভাবে নিয়োজিত হবেন। যা দেশের মোট জনসংখ্যার কর্মসংস্থানের ৪ দশমিক ২ শতাংশে উন্নীত হবে। পর্যটন শিল্পকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের কক্সবাজার, রাঙামাটি, বান্দরবান, বগুড়া, কুয়াকাটা, সেন্টমার্টিন, সিলেট, চট্টগ্রামসহ নানা জায়গায় বিরাট কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। পর্যটন খাতকে আরো সমৃদ্ধ করতে এখানে বিনিয়োগের পরিমাণ বাড়ানো জরুরি হয়ে পড়েছে। এক্ষেত্রে আমাদের ব্যাংকগুলো পৃথক উইন্ডোর মাধ্যমে পর্যটন খাতকে আরো চাঙ্গা ও সমৃদ্ধ করতে নতুন নতুন ব্যাংকিং সেবা চালু করতে পারে।
গতানুগতিক সাধারণ ব্যাংকিং ব্যবস্থায় এমনিতেই পর্যটন খাতকে ঝুঁকিপূর্ণ মনে করে এ খাতে আর্থিক বিনিয়োগ সবসময়ে সংকুচিত করে রাখা হয়। ফলে পর্যটন খাতে ব্যাংক কর্তৃক বিনিয়োগের মাত্রা সীমাবদ্ধ রয়ে যায়। কিন্তু ব্যাংকগুলো যদি পর্যটন খাতের জন্য বিশেষ সঞ্চয় স্কিম, আলাদা ঋণদানের মাধ্যমে হোটেল ব্যবসায় বিনিয়োগের বিশেষ প্যাকেজ চালুর উদ্যোগ নেয় এ খাতের সমৃদ্ধি ঘটতে পারে খুব দ্রুত। নেপাল পর্যটন খাতে আকাশছোঁয়া সাফল্য অর্জন করেছে। তাদের পর্যটন খাতের বিশাল সাফল্যের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে নেপাল ট্যুরিজম ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক লিমিটেড। নেপালের পর্যটন শিল্পে রক্ত সঞ্চার করে চলেছে নেপাল ট্যুরিজম ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক লিমিটেড। ওখানকার সাধারণ বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো যখন পর্যটন খাতে আর্থিক বিনিয়োগকে ঝুঁকিপূর্ণ ভেবে সংকুচিত অবস্থায় ছিল তখন প্রতিষ্ঠিত হয় নতুন এই বিশেষায়িত ব্যাংক। নেপালের পর্যটন খাতের উন্নয়নে বিরাট অবদান রাখছে ব্যাংকটি। বিশেষ সঞ্চয়ী প্রকল্প চালুর মাধ্যমে পর্যটন খাতকে সহায়তা করা হোটেল, রেস্টুরেন্ট প্রতিষ্ঠা, ক্রয়, সংস্কার, পুনঃসজ্জিতকরণ আধুনিকায়নে ঋণ এবং পর্যটন সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ব্যবসায় গ্যারান্টি প্রদানে নেপাল ট্যুরিজম ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক লিমিটেড কাজ করে যাচ্ছে। যার অনুকূল প্রভাব ওখানকার পর্যটন খাতে সহজেই দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। ২০১৩ সালে নেপালের জিডিপিতে পর্যটন খাতের অবদান ছিল ৮ দশমিক ২ শতাংশ। ২০১৪ সালে এসে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৯ শতাংশে।
নেপালের মতো বাংলাদেশে পৃথক কোনো পর্যটন ব্যাংক চালু না করেও প্রচলিত ব্যাংক ব্যবস্থায় পর্যটন শিল্পের বিকাশে আমাদের ব্যাংকগুলো নতুন বিনিয়োগ করতে পারে। পর্যটন ব্যবসায় নিয়োজিতদের জন্য বিশেষ সঞ্চয় স্কিম প্রচলন থেকে শুরু করে এ খাতে উদ্যোক্তাদের জন্য এসএমই ঋণের মতো আলাদা ঋণদান কর্মসূচি প্রচলন করা যায়। পর্যটন খাতকে ঝুঁকিবহুল খাত না মনে করে এটাকে সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে বিবেচনায় এনে আমাদের ব্যাংকগুলো বিনিয়োগে উদ্যোগী হয় তাহলে পর্যটন ব্যবসায় নিয়োজিতরা বিশেষ প্রণোদনা লাভ করবেন নিঃসন্দেহে বলা যায়। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো পর্যটন খাতের সম্ভাবনাময়, লাভজনক প্রকল্প খুঁজে বের করে আগ্রহী উদ্যোক্তাদের প্রয়োজনীয় ঋণদানসহ অন্যান্য বিনিয়োগ প্যাকেজের সুযোগ সৃষ্টি করে তাহলে আগামী কয়েক বছরে বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পে চেহারাই বদলে যেতে পারে। যথেষ্ট পরিমাণ পুঁজির অভাবে দেশের বিভিন্ন আকর্ষণীয় পর্যটন স্পটে গড়ে উঠতে পারছে না আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন আন্তর্জাতিকমানের হোটেল-মোটেল, রেস্টুরেন্ট ও বিনোদন কেন্দ্র। অনেক উদ্যোক্তা এ ধরনের প্রকল্পে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ প্রত্যাশা করলেও নানা ধরনের আইনগত জটিলতা, ঋণ নীতিমালার দোহাই দিয়ে তাদেরকে ফিরিয়ে দিচ্ছেন ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। অথচ সম্ভাব্যতা যাচাই করে পর্যটন শিল্পের নানামুখী উদ্যোগে প্রয়োজনীয় ঋণ প্রদান করা হলে বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় গড়ে উঠতে পারে আকর্ষণীয় এবং আন্তর্জাতিকমানের পর্যটন কেন্দ্র। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের রাজস্ব আয়ের ক্ষেত্রে ভিন্ন মাত্রা সংযোজনের পাশাপাশি পর্যটন শিল্পে বিপুল সংখ্যায় কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। এ ব্যবসায় সম্পৃক্ত মানুষের সংখ্যা বাড়লে তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নত হতে বেশি সময় লাগবে না।
এসএমই খাতের মতো ব্যাংকগুলো পর্যটন খাতে বিশেষ ব্যাংকিং সেবা পণ্য চালুর মাধ্যমে আগ্রহী উদ্যোক্তা গ্রাহকদের সহযোগিতা করতে পারে নতুন নতুন হোটেল, মোটেল, কটেজ প্রতিষ্ঠা, বিনোদন কেন্দ্র স্থাপন, বিভিন্ন প্রাকৃতিক শোভামণ্ডিত স্থানে মনোরম রিসোর্ট গড়ে তোলা, উন্নতমানের রেস্টুরেন্ট চালুর লক্ষ্যে ব্যাংকগুলো যদি আলাদা ঋণদান কার্যক্রম শুরু করে আগ্রহী উদ্যোক্তার অভাব হবে না। বাংলাদেশের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে পর্যটন শিল্পের জন্য বিশেষ ব্যাংকিং সেবা চালুকরণের ব্যাপারে অর্থমন্ত্রণালয় পর্যটন ও বিমান মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে আলাদা নীতিমালা প্রণয়ন করা যেতে পারে।