রাজস্বে নেতৃত্ব দেবে প্রত্যক্ষ কর
প্রকাশ : ৩০ মে ২০১৪, ১৯:৪৬
আগামী বৃহস্পতিবার অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ২০১৪-১৫ অর্থবছরের বাজেট সংসদে উপস্থাপন করবেন। প্রাথমিকভাবে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১ লাখ ৪৯ হাজার ৭২০ কোটি টাকার রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা দিতে যাচ্ছেন তিনি। রাজস্ব আদায়ের তিনটি খাতের মধ্যে আয়কর বা প্রত্যক্ষ কর খাত থেকেই সবচেয়ে বেশি আদায়ের লক্ষ্য তার। এই খাত থেকে ৫৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা আদায় করতে চান তিনি। এছাড়া মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট খাত থেকে ৫৬ হাজার ৫শ’ কোটি এবং বাদবাকী ৩৫ হাজার ৭২০ কোটি টাকা আসবে আমদানি শুল্ক খাত থেকে। আসছে বাজেটে অর্থমন্ত্রী এমন ঘোষণা দেবেন বলে জানা গেছে। সেই হিসেবে সবেচেয়ে বেশি আদায় করতে হবে আয়কর খাত থেকে। স্বাধীনতা বিগত ৪৩ বছরে এই প্রথমবারের মত প্রত্যক্ষ করের লক্ষ্যমাত্রা বেশি হতে যাচ্ছে।
আয়করে কেন বাড়তি চাপ?
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আয়কর খাত থেকেই রাজস্বের সিংহভাগ আহরিত হয়। কিন্তু যুগ যুগ ধরে বাংলাদেশে এই উল্টো চিত্র দেখা গেছে। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্যস্ত দেশটিতে প্রথম কয়েক বছরের বাছরের বাজেটের আকার ছিল খুবই ছোট। ওই বাজেট ছিল মূলত বৈদেশিক সহায়তা ও আমদানি শুল্ক নির্ভর। পরবর্তীতে ১৯৯১ সালে চালু করা হয় মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট ব্যবস্থা। বিগত ওই সময়েও রাজস্বের প্রধান খাত ছিল মূলত শুল্ক ও ভ্যাট বা পরোক্ষ কর। কিন্তু যার বেশি আয় তার উপর তুলনামূলক বেশি কর ধার্যের দাবি ক্রমেই জোরালো হতে থাকে। অন্যদিকে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিওটিও) সদস্য দেশ হিসেবে শুল্ক কমিয়ে মুক্ত বাণিজ্য নীতি গ্রহণে ক্রমাগত চাপ তৈরি হতে থাকে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে শুল্ক ব্যবস্থার থেকে বিভিন্ন নিয়ন্ত্রণমূলক ও সম্পূরক শুল্ক কমিয়ে দেয়ার তাগিদ তৈরি হয়। ডব্লিওটিও’র নীতিমালা অনুযায়ী, আগামী বছরের জুলাই থেকে ক্ষতিকর ও বিলাসদ্রব্য ছাড়া অন্যান্য পন্য আমদানিতে কোন ধরণের বাড়তি শুল্ক আরোপ করা যাবে না। সমপ্রতি রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান গোলাম হোসেন বলেছেন, ১৬২টি পন্য ছাড়া বাদবাকী পন্যে কোন ধরণের সম্পূরক শুল্ক রাখা যাবে না। ফলে স্বভাবতই ওই সব পন্যের শুল্ক কমায় মোটাদাগে আমদানি শুল্ক হতে আয় কমে যাবে। এর ফলে সরকারকে ঘুরেফিরে প্রত্যক্ষ করের দিকেই হাত বাড়াতে হচ্ছে। আগামী অর্থ বছরের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৪০ শতাংশই আদায় করতে হবে আয়কর খাত থেকে। ভ্যাট যুক্ত করলে এটি প্রায় ৭৬ শতাংশ হয়। অন্যদিকে এক সময়ের রাজস্বের প্রধান খাত শুল্ক থেকে আসবে মাত্র ২৪ শতাংশের মত রাজস্ব। অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, পরবর্তী অর্থ বছরগুলোতে আয়কর নির্ভর রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রাই দিতে হবে। অর্থাত্ প্রত্যক্ষ করই হবে রাজস্ব আয়ের প্রধান খাত।
অথচ বর্তমান সরকার ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পরও অর্থমন্ত্রীকে আমদানি শুল্ক ও ভ্যাটের উপর নির্ভর করেই বাজেট দিতে হতো। ২০০৯-১০ অর্থ বছরের পরিসংখ্যানের দিকে খেয়াল করলে দেখা যায়, ওই অর্থবছরে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রার প্রধান খাত ছিল আমদানি শুল্ক। ওই অর্থবছরে ৬১ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আমদানি শুল্কের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২৩ হাজার ২৩৬ কোটি টাকা। ভ্যাট ও আয়কর খাতে আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল যথাক্রমে ২০ হাজার ৭৩৫ কোটি ও ১৭ হাজার ২৯ কোটি টাকা।
আয়করের টার্গেট কারা?
আয়কর রাজস্বে নেতৃত্ব দেবে এটি মাথায় রেখেই বিগত কয়েক বছরে হোমওয়ার্ক করে নিয়েছে এনবিআর। এ লক্ষ্যে আয়কর খাতে অটোমেশনসহ ব্যাপক সংস্কার কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
বেশি সম্পদধারীদের উপর বেশি হারে কর আরোপ শুরু করেছে এনবিআর। এ লক্ষ্যে বিগত দুই অর্থবছর থেকে চালু হয়েছে সম্পদের উপর কর বা সারচার্জ (করের উপর কর)। বর্তমানে ২ কোটি টাকা থেকে ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত সম্পদের অধিকারীকে প্রদেয় করের উপর ১০ শতাংশ হারে এবং এর পরবর্তী অংকের জন্য ১৫ শতাংশ হারে সারচার্জ দিতে হয়। আসছে অর্থ বছরে এই সারচার্জের হার আরো বাড়বে বলে মনে করা হচ্ছে। করের আওতা জেলা, উপজেলা এমনকি গ্রাম পর্যন্ত বিস্তৃত করা হচ্ছে। এ লক্ষ্যে কর অঞ্চল বাড়িয়ে প্রায় দ্বিগুন করার পাশাপাশি জনবলও বাড়ানো হয়েছে। কর ফাঁকি রোধে কর সংক্রান্ত সব ধরণের কার্যক্রম অনলাইনে করার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। যে সব খাত এতদিন করের বাইরে ছিল বা খুব কম পরিমান কর আদায় হতো ওই সব খাতের উপর বিশেষ নজর দেয়া হচ্ছে। চূড়ান্ত করদায় হিসেবে যে সব খাত থেকে অগ্রিম আয়কর কর্তন করা হয় ওরকম বেশ কয়েকটি খাতের উপর ভবিষ্যতে করের হার বাড়তে পারে।
১৬ কোটি মানুষের দেশে আয়কর ফাইল রয়েছে মাত্র ১৭ লাখ। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এটি স্বাভাবিকের তুলনায় খুবই কম। অথচ কর সনাক্তকরণ নম্বরধারী (টিআইএন) ৩০ লাখের বেশি। প্রকৃত করদাতাদের টিআইএন নিতে উত্সাহিত করতে এবং ভুয়া টিআইএনধারীদের বাতিলের খাতায় রাখতে কর প্রশাসন টিআইএন ক্লিনজিং নামে একটি প্রকল্প চালু করেছে। এর মাধ্যমে জাতীয় পরিচয় পত্রের সহায়তায় করদাতাদের অনলাইনে টিআইএন প্রদান করা হচ্ছে। এ রকম বেশ কিছু উদ্যোগ বাস্তবায়নের মাধ্যমে আয়কর বাড়ানোর দিকেই মনযোগ দিচ্ছে রাজস্ব প্রশাসন।