বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা
প্রকাশ : ৩০ মে ২০১৪, ২০:৪৭
সমাপ্ত হইতে চলিয়াছে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা। এইবার নয় লক্ষাধিক শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিয়াছে। ব্যতিক্রম না ঘটিলে, অনুমান করা যায়, আশি হইতে নব্বইভাগ শিক্ষার্থী পাসও করিবে এবং তাহাদের সিংহভাগ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হইবার উপযুক্ত জিপিএ গ্রেডও পাইবে। কিন্তু এই বত্সরেও কি শিক্ষার্থীদিগকে পছন্দের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পাইতে দেশের এই মাথা হইতে ওই মাথা পর্যন্ত দৌড়াদৌড়ি করিয়া ভর্তি পরীক্ষা দিয়া বেড়াইতে হইবে? এখনও পর্যন্ত তাহা অবশ্য নিশ্চিত করিয়া বলা যাইতেছে না। শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং ইউজিসি যৌথভাবে দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলির ভর্তি পরীক্ষার প্রচলিত পদ্ধতি পরিবর্তন করিয়া কেন্দ্রীয়ভাবে ‘গুচ্ছ পদ্ধতি’তে ভর্তি পরীক্ষা গ্রহণের পক্ষে চেষ্টা করিলেও তাহা বাস্তবায়িত হইবে কিনা আমাদের জানা নাই। ‘গুচ্ছ পদ্ধতি’তে কেন্দ্রীয়ভাবে ভর্তি পরীক্ষা গ্রহণ করিবার ব্যাপারে তাহাদের সুপারিশের পর ছয় বত্সর অতিক্রান্ত হইয়াছে। কিন্তু দেশের সকল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ঐকমত্যে পৌঁছাইতে পারিতেছেন না বলিয়া এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িতও হইতে পারিতেছে না, এখনও তাহা আলোচনাতেই আটকাইয়া রহিয়াছে।
দেশে উচ্চশিক্ষায় ভর্তির বিদ্যমান ব্যবস্থা নিয়া অনেক বিতর্ক উঠিয়াছে। বলাবাহুল্য, ইহা সময়সাপেক্ষ, ত্রুটিপূর্ণ, ব্যয়বহুল এবং অনেক ক্ষেত্রে কোচিংনির্ভর। ‘উচ্চ শিক্ষা মানোন্নয়ন প্রকল্পে’র আওতায় স্টাডিজ পলিসি ইউনিট কর্তৃক বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলির ভর্তি প্রক্রিয়ার ওপর ২০১২ সালের জুলাই হইতে ডিসেম্বর পর্যন্ত একটি গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করা হইয়াছিল। উক্ত গবেষণাতেও সকল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় একত্রিত করিয়া গুচ্ছ পদ্ধতিতে ভর্তি পরীক্ষা নিবার পক্ষে মতামত উঠিয়া আসে। উক্ত গবেষণায়, বর্তমান পদ্ধতিতে ভর্তির ক্ষেত্রে শিক্ষার্থিগণ নানাভাবে দুর্ভোগ পোহাইতেছেন বলিয়া উল্লেখ করিয়া সমন্বিত বা গুচ্ছ ভিত্তিতে ভর্তির সুপারিশ করা হইয়াছে। এই পদ্ধতিতে বর্তমানে দেশের মেডিক্যাল কলেজগুলিতে ভর্তি পরীক্ষা চলিতেছে। বর্তমান পরীক্ষা পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য একপ্রকার যুদ্ধ করিতে হয়। কেহ কেহ ১০টি বা তাহারও অধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা দিয়াও ভর্তির সুযোগ পান না। কাঙ্ক্ষিত বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য দ্বিতীয়বারও পরীক্ষায় বসিতে হয় অনেককে। সীমিত আসনের কারণে শিক্ষার্থীদের দেশের এক মাথা হইতে আর এক মাথায় অবস্থিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে ছুটিতে হয়। কখনোবা একই সময়ে ভর্তি পরীক্ষা পড়িলে কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষাই দিতে পারেন না ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থিগণ। অন্যদিকে ভর্তির প্রস্তুতি নিতে দীর্ঘ সময় শিক্ষার্থীরা কোচিং সেন্টারের শরণাপন্ন হন। সার্বিকভাবে, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছোটাছুটি, পরীক্ষার জন্য অবস্থান, ফরম ক্রয় এবং কোচিংয়ের ব্যয় মিলাইয়া আর্থিকভাবে বড় রকমের ক্ষতির মুখোমুখি হন অভিভাবকেরা। তদুপরি, ভর্তি পরীক্ষা সংক্রান্ত বিভিন্ন কাজে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও কর্মকর্তাগণের যে সময় ব্যয় হয় তাহাও উল্লেখযোগ্য। এই সময়টুকু শিক্ষকরা বিভিন্ন শিক্ষা কার্যক্রমের সঙ্গে নিজেদের সম্পৃক্ত করিতে পারেন না কেবলমাত্র ভর্তি সংক্রান্ত কাজের চাপে।
এই দুর্ভোগ কমাইবার জন্য কয়েক বছর ধরিয়া সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে গুচ্ছ ভিত্তিতে পরীক্ষা নিবার কথা বলা হইলেও তাহা কার্যকর হয়নি। ইউজিসির এই সুপারিশ নিয়া আপত্তি তুলিয়াছে শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি আলাদা স্বাতন্ত্র্য আছে, শিক্ষার্থী গ্রহণের ক্ষেত্রে তাহারা সেই স্বাতন্ত্র্য ধরিয়া রাখিতে চাহিতেছেন। উল্লেখ্য, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন অধ্যয়ন এলাকায় ভর্তির যোগ্যতা অর্জনের জন্য কেন্দ্রীয়ভাবে পরিচালিত পরীক্ষা পদ্ধতি চালু আছে। যেমন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের জন্য একটি কেন্দ্রীয়ভাবে পরিচালিত পরীক্ষায় ভালো গ্রেড পাইয়া পাস করিতে হয়, কিংবা সামাজিক বিজ্ঞানের বিষয়গুলি পড়িতেও একই রকম কোনো একটি কেন্দ্রীয় পরীক্ষায় বসিতে হয়। তাহার পরে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলির বিভিন্ন বিভাগ তাহাদের স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখিয়াও, নূতন করিয়া ভর্তি পরীক্ষার হাঙ্গামা না করিয়া, মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক এবং বিষয়ভিত্তিক কেন্দ্রীয় পরীক্ষার গ্রেড যোগ করিয়া ছাত্র ভর্তি নিয়া নেয়। বলিবার অপেক্ষা রাখে না যে, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বতন্ত্র ভর্তি পরীক্ষা অপচয়মূলক। সেই ক্ষেত্রে, কয়েকটি গুচ্ছ করিয়া কেন্দ্রীয়ভাবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলি ভর্তি পরীক্ষা লইতে পারে। কিংবা, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অধ্যয়ন এলাকায় ভর্তির যোগ্যতা নির্ধারণের জন্য শিক্ষামন্ত্রণালয় ও ইউজিসি কয়েকটি কেন্দ্রীয় পরীক্ষার আয়োজন করিতে পারে। তাহা হইলেও, স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয়গুলিকে আর আলাদাভাবে পরীক্ষা লইতে হইবে না, কিন্তু নিজেদের পছন্দমতোই শিক্ষার্থী তাহারা বাছিয়া লইতে পারিবেন। কিন্তু যাহাই করা হউক না কেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির হয়রানি ও অপচয় কমাইতে দ্রুতই পদক্ষেপ লইতে হইবে।