[ প্র শা স ন ]

গণতন্ত্রে কোনিট বেশি প্রয়োজনীয়

জনপ্রশাসনের সাফল্যের জন্য আমলাদের একই সাথে নিরপেক্ষতা ও দক্ষতা জরুরি বিষয় হিসেবে গণ্য করা হয়। একাডেমিক লোকেরা এটির নাম দিয়েছেন Neutral Competence তথা নিরপেক্ষতামূলক দক্ষতা। ম্যাক্স ওয়েবার তাঁর আদর্শ আমলাতন্ত্রের জন্য যে সব নীতির কথা বলেছেন তার সারাংশ বলা যায় এই নিরপেক্ষতামূলক দক্ষতাকে। লোকপ্রশাসন বিজ্ঞানের অন্যতম পুরোধা উড্রো উইলসন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পূর্বেই প্রস্তাব করেছিলেন, ‘প্রশাসন রাজনৈতিক ক্ষেত্রের বাইরে অবস্থান করবে’ এবং ‘প্রশাসনিক প্রশ্ন আর রাজনৈতিক প্রশ্ন এক নয়’। বস্তুত, সে সময় থেকেই সরকারি প্রশাসনের নিরপেক্ষতামূলক দক্ষতা ধারণার বহিঃপ্রকাশ ঘটে। অন্যভাবে বলা যায়: ব্যক্তিগত বা দলীয় অথবা অন্য কারও প্রতি দায়বদ্ধতা বা আনুগত্য প্রকাশ না করে আমলারা নৈপুণ্যতার সাথে এবং বিষয়মান বজায় রেখে সরকারি কাজসম্পন্ন করবেন, এটিই নিরপেক্ষতামূলক দক্ষতা। কিন্তু মোয়ে, উয়েকো প্রমুখ লোক প্রশাসন বিশেষজ্ঞ তাদের পর্যবেক্ষণে দেখেছেন, পেশাদার ও দক্ষ অথচ রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে নির্লিপ্ত কর্মকর্তাদের কারণে অনেক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের প্রধানগণ নীতি-লক্ষ্য (Policy-goal) বাস্তবায়নে ব্যর্থতার সম্মুখীন হয়েছেন (Gary E. Hollibaugh, Jr. February 16, 2014)। এজন্য তারা ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের আদর্শ বা কর্মসূচির প্রতি সাড়াদানকারী (Responsive) কিংবা অনুগত আমলাদের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ বা পদায়ন করে থাকেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিগ্যানের উপদেষ্টা Lyn Nofziger একবার বলেছিলেন,‘প্রশাসনিক লোক নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রধান বিবেচনা হলো আনুগত্য, আর দক্ষতা হলো বোনাস’। ঠিক এ কারণেই সে দেশে ১৮২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পর নিউইয়র্কের ডেমোক্রেট সিনেটর তাদের বিজয়কে দলীয় লোকদের সরকারি গুরুত্বপূর্ণ পদ ও সুযোগ-সুবিধা লাভের ব্যবস্থা বা Spoil System বলে আখ্যায়িত করেছেন। আমরা লক্ষ্য করি, বিভিন্ন দেশে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারগুলো গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদগুলোর জন্য কমবেশি এই পদ্ধতিই অনুসরণ করে চলেছে। বাংলাদেশও এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম নয়। বর্তমান নিবন্ধে আমরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভিজ্ঞতার আলোকে বাংলাদেশের বিগত কয়েকটি গণতান্ত্রিক সরকারের আমলে আমলাদের নিয়োগ বা পদায়নে নিরপেক্ষতামূলক দক্ষতার সাথে রাজনৈতিকভাবে সাড়াদান তথা রাজনৈতিক আনুগত্যের প্রাসঙ্গিকতা আলোচনা করবো। ১৮২৯ সালের আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাচনের পর নতুন প্রেসিডেন্ট ক্ষমতা গ্রহণ করে ফেডারেল সরকারের কর্মকর্তাদের সাধারণত চাকরিচ্যুত বা বদলি করতেন না। কিন্তু সে বছর ৮ই মার্চ এন্ড্রু জ্যাকসনের রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ গ্রহণের সময় একদল অফিসপ্রার্থীর উচ্ছৃঙ্খল আচরণ অভিষেক অনুষ্ঠানের মর্যাদা ভীষণভাবে ক্ষুণ্ন করে। যদিও তারা এটিকে বিজয়ীদের গণতান্ত্রিক উল্লাস বলে বোঝাতে চেয়েছেন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এটি ছিল নির্বাচনের আগে প্রতিশ্রুত সমর্থকগোষ্ঠীর সরকারি গুরুত্বপূর্ণ পদ লাভের লক্ষ্যে বিজয়োচ্ছ্বাস। প্রেসিডেন্টের দায়িত্বভার লাভ করেই জ্যাকসন ৯১৯ জন কর্মকর্তাকে বিভিন্ন সরকারি পদ থেকে সরিয়ে দেন যা কেন্দ্রীয় আমলতন্ত্রের প্রায় ১০%। সবচেয়ে বেশি পরিবর্তন করা হয় ফেডারেল পোস্টাল সার্ভিসে। সেখানে ৪২৩ জন পোস্ট মাস্টার চাকরিচ্যুত হন। এদের অধিকাংশেরই ছিল ভাল সার্ভিস রেকর্ড। সেসব পদে দলীয় আনুগত্যশীলদের নিয়োগ দিয়ে প্রেসিডেন্ট জ্যাকসন বলেছিলেন, ‘এটি হলো জনপ্রশাসনের সংস্কার’। এ ধরনের রাজনৈতিক নিয়োগের ফলে পরবর্তী এক দশকে মার্কিন প্রশাসনে দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বেড়ে যায়। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ, মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের কেরানী (১৮৪৩-১৮৪৫) Caleb J. McNulty’s এর অর্থ আত্মসাতের ঘটনা। তত্কালীন প্রেসিডেন্ট জন কুইন্সী এ্যাডামস এটিকে একটি ‘স্মরণীয় গণতান্ত্রিক দুর্নীতি’ বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। যাহোক, এই অবস্থার অবসানকল্পে ১৮৬০ সাল থেকে জনপ্রশাসন সংস্কারের জন্য ব্যাপক দাবি উঠতে থাকে। ১৮৮১ সালে গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ লাভে ব্যর্থ এক ব্যক্তি কর্তৃক প্রেসিডেন্ট জেমস এ. গারফিল্ড নিহত হলে প্রশাসনিক সংস্কারের দাবি চূড়ান্ত রূপ লাভ করে। ফেডারেল পর্যায়ে Spoil System কে পরিবর্তন করার জন্য ১৮৮৩ সালে Pendleton Act পাস হয়। সেখানে বলা হয়, একটি দ্বি-দলীয় জনপ্রশাসন কমিশন মেধার ভিত্তিতে নির্দলীয় প্রার্থীদের বাছাই করবে। তবে কিছু পদের জন্য প্রেসিডেন্টের নিজের পছন্দমত কর্মরতদের বদলি ও চাকরি স্থায়ী করার অধিকার বহাল থাকবে। এই আইন অনুসরণ করার ফলে ১৯০০ সালের মধ্যে ফেডারেল সরকারের অধিকাংশ চাকরি মেধার ভিত্তিতে পূরণ হতে শুরু করে, আর Spoil System শুধুমাত্র ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে সীমিত হয়ে পড়ে। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও জনসেবা আলাদা হয়ে যাওয়ার পর ১৯৩৯ সালে প্রণীত Hatch Act এর মাধ্যমে ফেডারেল সরকারের কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক তত্পরতা বহু ক্ষেত্রে নিষিদ্ধ করা হয়। আর রাজ্য পর্যায়ে প্রশাসনিক সংস্কারের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টায় Spoil System কে অনেকটা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়। তবে Spoil System মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আমলাতন্ত্রের সাথে Political Machine এর অংশ হিসেবে এখনো টিকে আছে। রাজনৈতিক দলের কর্তাব্যক্তিগণ এই মেশিনের নিয়ন্ত্রক। তারাই ঠিক করেন দল ক্ষমতায় গেলে বদলি বা নিয়োগের মাধ্যমে কারা ফেডারেল ও রাজ্য সরকারের গুরুত্বপূর্ণ আমলাতান্ত্রিক পদগুলো লাভ করবেন। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে ১৯৭২-৭৫ সময়কালে আওয়ামী লীগ সরকার পাকিস্তানি কাঠামোয় গড়ে ওঠা এলিট আমলাতন্ত্রের ক্ষমতা কমিয়ে সেটিকে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণে আনার উদ্যোগ গ্রহণ করে। এজন্য একাডেমিক ব্যক্তিদের বেশকিছু সরকারি উচ্চপদে নিয়োগ দেয়া হয়। মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য ইন্ডাস্ট্রিয়াল সার্ভিস ক্যাডার চালু করা হয়। মুজিবনগর সরকারের অধীনস্থ কর্মকর্তাদের দুই বছর সিনিয়র করা হয়। প্রেসিডেন্টের আদেশ নং ০৯ প্রয়োগ করে কোন কোন সরকারি কর্মকর্তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়। প্রশাসন ও পুলিশ সার্ভিসে নিয়োগের ক্ষেত্রে দলীয় আনুগত্যকে প্রাধান্য দেয়া হয়। অন্যদিকে, ১৯৭৫ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার পর থেকে ১৯৯০ সালে জেনারেল হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ ক্ষমতাচ্যুত হওয়া পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সরকারি পদগুলো পাকিস্তান আমলে নিয়োগপ্রাপ্ত এলিট আমলাতন্ত্রের মাধ্যমে পূরণ করা হয়। এই সময়কালে সেনা শাসন দীর্ঘায়িত হওয়ায় পররাষ্ট্র ও পুলিশের মাঠ প্রশাসন এবং বহু অধিদপ্তর ও পরিদপ্তরের প্রধান পদগুলোতে পছন্দের সামরিক আমলাদের পদায়ন করা হয়। পরবর্তীকালে এসব উচ্চাভিলাষী আমলাদের একটি অংশ চাকরি জীবন শেষ করে বিএনপি ও জাতীয় পার্টিতে যোগদান করে নেতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। তাই বোঝা যায়, নিরপেক্ষতামূলক দক্ষতার কথা বলে এরাও কার্যত রাজনৈতিক আনুগত্যই প্রকাশ করেছেন। ১৯৯১ সালে পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর থেকে বাংলাদেশে গণতন্ত্রের নতুন অভিযাত্রা সূচিত হয়। কিন্তু তখন থেকে অদ্যাবধি নির্বাচিত সরকার হিসেবে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের শাসনামলে আমলাতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো রাজনৈতিক আনুগত্য বিবেচনা করেই পূরণ করা হয়েছে বলে লক্ষ্য করা যায়। ১৯৯২ সালে বিএনপি সরকার আমলে ৬৫৪ জন কর্মকর্তার পদোন্নতি অনেক বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল। সে সময় এক আদেশে কমপক্ষে ৫১ জন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসর প্রদান কর হয়, তাদের অধিকাংশকেই কোন কারণ দর্শানো হয়নি। ১৯৯৬ সালে গঠিত আওয়ামী লীগ সরকার আমলে এ ধরনের রাজনৈতিক বিবেচনা অব্যাহত থাকে। এ সময় জ্যেষ্ঠতা ক্ষুণ্ন করে প্রশাসন ক্যাডারের ৩৫১ জন কর্মকর্তাকে পদোন্নতি প্রদান করা হয় বলে পত্রিকায় শিরোনাম হয়েছে। এই সরকারের আমলে সর্বোচ্চ আমলাতান্ত্রিক পদগুলোতে ১৭৪ জনকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়া হয়েছে যা পূর্বের সকল রেকর্ড অতিক্রম করেছিল। আবার ২০০১ সালে জাতীয় সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ আসনে বিজয়ী বিএনপি’র নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট ক্ষমতাপ্রাপ্ত হয়ে পূর্বের ধারাবাহিকতা বজায় রাখে। এই আমলে জনপ্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ের ৯৭৮ জন কর্মকর্তাকে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) করে নতুন রেকর্ড সৃষ্টি করা হয়। আবার, ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোট ভূমিধস বিজয়ের পর আমলাতন্ত্রে শৃংখলা ফিরিয়ে আনার কথা বলে আগের সরকারগুলোর নীতিই অনুসরণ করেছে বলে প্রতীয়মান হয়। তবে ২০১৩ সাল পর্যন্ত এ সরকারের আমলে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের হার পূর্বের তুলনায় কম ছিল। কিন্তু ১৯৯০ পরবর্তী গণতান্ত্রিক সরকারগুলোর বিরুদ্ধে প্রধান অভিযোগ হলো সরকারি কর্মকমিশনের মাধ্যমে চাকরি-শুরুতে নিয়োগের ক্ষেত্রে দলীয় বিবেচনাকে প্রাধান্য দেয়ার প্রবণতা। দক্ষ ও নিরপেক্ষ আমলাতন্ত্র তথা জনপ্রশাসনের নিরপেক্ষতামূলক দক্ষতা একটি আদর্শ মানদণ্ড হলেও ১৮২৯ সাল থেকে ১৯৩৯ পর্যন্ত সময়কালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এবং গণতান্ত্রিক বিশেষত ১৯৯০ পরবর্তী সরকারগুলোর আমলে বাংলাদেশে আমরা সেটির প্রয়োগ খুব একটা লক্ষ্য করি না। তবে Hatch Act এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক নিয়োগ বা পদায়ন তথা Spoil System কে যথেষ্ট নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হলেও বাংলাদেশে রাজনৈতিক দলগুলোর উপলব্ধি ও ঐকমত্যের অভাবে সে রকমটি এখনো দৃশ্যমান নয়। অন্যদিকে, রাজনৈতিক আনুগত্য অনুসরণ করে সরকারি প্রশাসনের উচ্চতর পদগুলো পূরণ করার ক্ষেত্রে আমেরিকায় যে Political Machine প্রথা এখনো টিকে আছে তা দেশটির স্থায়ী রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানসমূহকে কখনো চ্যালেঞ্জ করেনি। সেখানে দ্বিদলীয় ব্যবস্থার আদলে রাজনৈতিক প্রক্রিয়া পরিচালিত হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সাংবিধানিক মানদণ্ড বজায় রাখার রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। দুঃখজনক হলেও সত্য, বাংলাদেশে প্রধান রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দের আচরণে এখনো তেমনটি পরিলক্ষিত হয় না। তাই বলা যায়, এ দেশে জনপ্রশাসনের নিরপেক্ষতামূলক দক্ষতা ও রাজনৈতিক আনুগত্যের মধ্যে ভারসাম্য আনতে হলে আমাদেরকে আরো দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে। লেখকদ্বয়: অধ্যাপক, লোক প্রশাসন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও চেয়ারম্যান, জানিপপ; এবং ন্যাশনাল ভলান্টিয়ার, জানিপপ। ই-মেইল - janipop1995@gmail.com