তাঁর জীবন দর্শন
প্রকাশ : ৩১ মে ২০১৪, ১৯:৩৫
মানিক মিয়া জন্মেছিলেন ১৯১১ সালে পিরোজপুর জেলার ভান্ডারিয়া গ্রামে। তিনি হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর ভাব শিষ্য ছিলেন। তিনি সোহরাওয়ার্দী কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত ‘দৈনিক ইত্তেহাদ’ (১৯৪৬) পত্রিকার পরিচালনা বোর্ডের সেক্রেটারি হিসেবে যোগদান করেন। পরবর্তীতে তিনি দৈনিক ইত্তেফাকের সম্পাদক হিসেবে যোগদান করেন। পাকিস্তানি শাসকশ্রেণীর হয়রানি ও প্রলোভন তাকে তার আদর্শ থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি। তার ‘পাকিস্তানী রাজনীতির বিশ বছর’ (১৯৮১) গ্রন্থে রাজনৈতিক ও আত্মজৈবনিক দর্শনের সূত্র খুঁজে পাওয়া যায়। তিনি বলেন, ‘আমি একজন বিপ্লবী তো নাই-ই সক্রিয় রাজনীতি হইতে আমি বহুদিন যাবত বিশেষত দৈনিক ইত্তেফাকের আত্মপ্রকাশের পর দূরে সরিয়া ছিলাম। আমি আমার চিন্তাশক্তি ও কর্মক্ষমতা সর্বোতভাবে ইত্তেফাকের পিছনেই নিয়োজিত করিয়াছিলাম। গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে সংযমশীলতা ও আপসমূলক মনোভাবের প্রয়োজন সে সম্পর্কে আমি সদা সচেতন।’ ইত্তেফাক শুধু পত্রিকা নয়, বরং ছিল মেধা, শ্রম ও ঘামে প্রতিষ্ঠিত অধিকার বঞ্চিত, নৈতিকতা ও সমাজ বিনির্মাণের হাতিয়ার স্বরূপ। মানিক মিয়া বলেন, ‘সংবাদপত্রের মারফতে দেশবাসীকে ততটুকু খেদমত করা যায় তাহাই ছিল আমার একমাত্র লক্ষ্য।’
মানিক মিয়া হিংসা ও রঞ্জারঞ্জিতে বিশ্বাসী ছিলেন না। তিনি ছিলেন না বিপ্লবী। তিনি ছিলেন গণতান্ত্রিক মানসিকতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তিনি বলেন, ‘যাহারা স্বাধীনতা আন্দোলনের জনগণের ভূমিকাকে তুচ্ছ স্থান দিয়া ব্যক্তি বিশেষের নেতৃত্বকে ফুলাইয়া ফাঁপাইয়া তুলিতে প্রয়াসী হয় তাহারা হয় রাজনৈতিক এতিম নয় গণবিরোধী।’
বিশ্বব্যাপী নৈতিকতার চরম সংকটকালে মোসাফির নামক কলামে তিনি শক্তভাবে কলম ধরেন এবং বিশ্বব্যাপী মানুষের মুক্তির জন্য চিন্তা করেন। তিনি মতাদর্শকে গুরুত্ব না দিয়ে সমাজ বাস্তবতার উপর সেটার মূল্যায়ন করেন। তাই তো তিনি বলেন, ‘আধুনিক দুনিয়ায় নীতির কোনো স্থান নাই বলিলেই চলে। বিশেষত বৃহত্তর শক্তি বর্গের কাছে নীতির মূল্য নিতান্তই অকিঞ্চিত্কর। স্বীয় দল ভারী করাই এদের লক্ষ্য। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তথা পশ্চিমের শক্তিবর্গ এবং কম্যুনিস্ট দুনিয়া সকলেরই বেলায়ই এই নীতিহীনতা লক্ষ্যণীয়।’
তিনি দেশপ্রেম সৃষ্টি এবং নিরপেক্ষ ও স্বাবলম্বী জাতি গঠনের স্বপ্ন দেখেছিলেন। কারণ পরনির্ভরশীল অর্থনীতিতে কোনো জাতির মর্যাদা বাড়ে না। বরং মর্যাদাহানী হয়। বাংলাদেশের মানুষ, পাখি, জল প্রভৃতি ছিল তার দৃষ্টিতে সরস। কিন্তু যোগ্য নেতৃত্ব ও নির্দেশনা না থাকার কারণে জাতি সামনের দিকে যাওয়ার স্বপ্ন থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। যা কোনো জাতির জন্য আত্মহত্যার সামিল। তাই তো তিনি বলেন, ‘বর্তমান বিশ্বে ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলোর পক্ষে নিরপেক্ষ নীতি অনুসরণ করা প্রয়োজন। অবশ্য নিরপেক্ষতার অর্থ নিষ্ক্রিয়তা বুঝাইতেছি না। নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করতে হইলে সংশ্লিষ্ট দেশকে অন্তত ন্যূনতম অর্থনৈতিক আত্মনির্ভরশীলতা অর্জন করিতে হইবে।’
বাঙালির শিল্প সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রতি ছিল তার গভীর অনুরাগ। ১৯৬১ সালে এদেশের প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী পালনের বিরোধিতা করলে তাদের সে পদক্ষেপের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জ্ঞাপন এবং রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী উদ্যাপন কমিটির অন্যতম সদস্য হিসেবে বিপুল উত্সাহ-উদ্দীপনার মধ্যে দিয়ে রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী পালন করেন। তিনি অসাম্প্রদায়িক এবং শোষণমুক্ত সমাজ গড়ার পক্ষপাতি ছিলেন। ১৯৬৪ সালে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাঁধলে তিনি তার বিরুদ্ধে সাহস ভূমিকা পালন করেন। তিনি ছিলেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর রাজনৈতিক দর্শনের অনুসারী এবং বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক সহকর্মী এবং বন্ধু।
জীবনযুদ্ধে জয়ী হয়ে যারা স্বার্থক হয়েছেন, সেই দিক দিয়ে বিচার করলে তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া সার্থক হয়েছিলেন।
Arthur Schopenhauer বলেন, ‘Life is short but truth works for and lives long, let us speak the truth.’ আমরা যদি সত্য সুন্দর এবং ন্যায় প্রতিষ্ঠার শপথ গ্রহণ করে জীবনকে ধন্য করতে চাই তাহলে মানিক মিয়ার মতো ব্যক্তিদের সামনে রাখলে অনেক ক্ষেত্রে সফল হবো বলে বিশ্বাস করি। তার মৃত্যুবার্ষিকীতে তার প্রতি থাকল গভীর ভালোবাসা এবং শ্রদ্ধাঞ্জলি।
লেখক : প্রাবন্ধিক, প্রভাষক, ইস্পাহানী বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ, কেরানীগঞ্জ, ঢাকা