আজ মানিক মিয়াকে খুবই প্রয়োজন

ইত্তেফাকের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া, সাংবাদিকতা জগতের অন্যতম প্রবাদ পুরুষ লোকান্তরিত হয়েছেন আজ থেকে ৪৫ বছর আগে ১৯৬৯ সালের ১ জুন। তিনি ইত্তেফাকের পাতায় মোসাফির ছদ্মনামে ‘রাজনৈতিক মঞ্চ’ ও ‘রঙ্গ মঞ্চ’ লিখে বিপুল খ্যাতি অর্জন করেন। মানিক মিয়া আক্ষরিক অর্থে একজন রাজনীতিমনস্ক সাংবাদিক ছিলেন। কিন্তু তার কোনো রাজনৈতিক উচ্চভিলাষ ছিল না। জেল-জুলুম, অত্যাচার নিপীড়ন তথা এক ভয়াবহ পরিস্থিতি মোকাবিলা করে তাকে মানুষের অধিকারের কথা বলতে হয়েছে, নীতির প্রশ্নে অবিচল থাকার সাহস দেখাতে হয়েছে। কিন্তু পরিতাপের বিষয় যে, বর্তমানে সাংবাদিক সমাজ দলীয় বিভাজনে নীতিহীন হয়ে পড়েছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ‘আমার মানিক ভাই’ গ্রন্থে লিখেছেন, ‘আমি কাজ করেছি মাঠে ময়দানে আর মানিক ভাই তার ক্ষুরধার লেখনীর সাহায্যে। ১৯৫৮ সালে আইয়ুবের মার্শাল ল’ জারি হওয়ার পর মানিক ভাইকে সামরিক আইন বলে আটক করা হয়। একই জেলে আমিও থাকায় মানিক ভাই জানালেন সরকার পক্ষ তাকে আপস করার অনুরোধ জানিয়েছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম :আপনি কী বলেছেন? মানিক ভাই উত্তর দিলেন :চৌদ্দ বছর জেল খাটতে হয় সেও কবুল। কিন্তু নীতির প্রশ্নে আপস চলে না। এ কথা ওদের জানিয়ে দিয়েছেন।’ আজ দেশে-সমাজে, রাজনীতিতে-অর্থনীতিতে, সাহিত্যে-সাংবাদিকতায়, বিশ্ববিদ্যালয়-মন্ত্রণালয়, পার্লামেন্টে-প্রশাসনে যা-যা ঘটছে, মনে হয় মানিক মিয়া বেঁচে থাকলে এসব ঘটতে পারত না। তিনি অসাধারণ রাজনীতিজ্ঞ ও অপ্রতিদ্বন্দ্বী সাংবাদিক ছিলেন। রাজনীতিতে ছিলেন তিনি শহীদ সোহরাওয়ার্দীর শিষ্য। তাঁরই প্রেরণায় মানিক মিয়া সরকারি চাকরিতে ইস্তফা দিয়া রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। সোহরাওয়ার্দীর দেশপ্রেম, রাজনৈতিক আদর্শবাদ, দুর্জয় সাহস, অমিততেজ, স্বচ্ছ চিন্তা, সবল যুুক্তি, কুশল-প্রকাশ ভঙ্গি এবং গণতান্ত্রিক সহিষ্ণুতা সবই তিনি আয়ত্ত করেছিলেন। শুধু আওয়ামী লীগ নয়, গোটা জাতি, সারা দেশ তার কাছে ঋণী। পূর্ব পাকিস্তানের অটোনমির কথা, লাহোর প্রস্তাবভিত্তিক পাকিস্তানের কথা, রাজনীতি ও অর্থনীতিতে আঞ্চলিক বঞ্চনার কথা মানিক মিয়ার মতো অতি জোরে আর কেউ বলেননি। মানিক মিয়া বিশ্বাস করতেন, গণতন্ত্রই মানবাধিকারের সর্বশ্রেষ্ঠ রক্ষাকবচ, আর স্বাধীন সংবাদপত্রই সে রক্ষাকবচের হেফাজত করবার সবচেয়ে ধারাল হাতিয়ার। সেই গণতন্ত্র মানবাধিকার, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা সবই আজ হিমাগারে। মানিক মিয়ার মতো সাহসী ও নির্ভীক সাংবাদিকের আজ খুবই প্রয়োজন।