এক সাহসী কলমযোদ্ধা

নেপোলিয়ান বোনাপার্টের মতে, ‘এক লাখ সৈনিকের চেয়ে আমি তিনটি সংবাদপত্রকে বেশি ভয় করি।’ আর সংবাদপত্রের সম্পাদক যদি হয় তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার মতো ক্ষুরধার কলম সৈনিক তাহলে শাসকের ভয়ের পরিমাণ সহজেই অনুমেয়। গণতন্ত্রের অন্যতম হাতিয়ার মুক্ত গণমাধ্যম। অধিকারহীনদের অধিকার আদায়ের মসৃণ পথ সংবাদপত্র। প্রয়োগিক ও বাস্তবতার আলোকে জীবন সংগ্রামের ব্রতী হয়েছিলেন বাংলাদেশের সাংবাদিক জগতের অন্যতম অগ্রপথিক তফাজ্জল হোসেন। যাঁকে সবাই তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া নামে চেনেন। সাংবাদিকতা জগতের এই ধ্রুব তারা ক্ষণে ক্ষণে পদে পদে চিরভাস্বর। সংবাদ ও সাংবাদিকতার কণ্টকাকীর্ণ পথে হেঁটে অর্জন করেছেন পুষ্পকমল। সচিত্র প্রতিভাস হয়ে তিনি আছেন সাংবাদিক জগতে। তিনি বিশুদ্ধতার প্রতীক, নাগরিক মুক্তির মিছিলে এবং নবপথিকের কাছে প্রেরণার দাবিদার। আপদমস্তক নিমজ্জিত ছিলেন সাংবাদিকতার জগতে। সাংবাদিকতা পেশাকে মহান পেশায় রূপদান করার জন্য তিনি অগ্রগণ্য। এই মহান সাংবাদিক প্রথম জীবনে ছিলেন সরকারি কর্মকর্তা। সরকারি চাকরি থেকে ইস্তফা দিয়ে সক্রিয়ভাবে রাজনীতিতে ঢুকে পড়েন। রাজনৈতিক জীবনে এই উপমহাদেশের প্রখ্যাত রাজনীতিক হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সান্নিধ্য লাভ করেন। ১৯৪৭ সালে সোহরাওয়ার্দী কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত ‘দৈনিক ইত্তেফাক’ পত্রিকার পরিচালনা বোর্ডের সেক্রেটারি নিযুক্ত হন। সাংবাদিক জীবনে নানা নিপীড়ন ও অত্যাচার সহ্য করেছেন। ইত্তেফাক পত্রিকার প্রকাশনা বন্ধ হলে কলকাতা ছেড়ে ঢাকা চলে আসেন মানিক মিয়া। ঢাকা থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক ইত্তেফাকের সাথে যুক্ত হন ১৯৪৯ সালে। একসময় এই পত্রিকার পূর্ণভারও গ্রহণ করেন। ‘সাপ্তাহিক ইত্তেফাক’কে দৈনিক ইত্তেফাকে রূপান্তরিত করার উদ্যোগ নেন। অবশেষে সোহরাওয়ার্দীর অনুপ্রেরণায় দৈনিক ইত্তেফাক বের করেন। দেশ বরেণ্যে প্রথিতযশা সাংবাদিক মানিক মিয়া হয়ে যান ‘দৈনিক ইত্তেফাকের’ সম্পাদক। তিনি সাংবাদিকতার জগতে আরেক বিখ্যাত রাজনীতিক, সাংবাদিক আবুল মনসুর আহমেদের সাথেও কাজ করেছেন। গণ মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষায় আজীবন নিবেদিত ছিলেন। এই মহান সাংবাদিককে সামরিক জান্তা আইয়ুব খানের রক্ত চক্ষুর রোষানলেও পড়তে হয়েছে। ১৯৫৯ সালে কারারুদ্ধ হয়ে তিনি এক বত্সর কারাভোগ করেন। ১৯৬২ সালের ছাত্র বিক্ষোভের ইন্ধন যোগানোর দায়ে আবারও কারাভোগ করেন। নির্ভীক সাংবাদিক ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশনার জন্য মানিক মিয়া গণমানুষের কাছে স্মরণীয় হয়ে আছেন। বাঙালি জাতিসত্তা বিকাশের পৃষ্ঠপোষকও ছিলেন তিনি। ১৯৬৪ সালে কাশ্মীরে মহানবীর কথিত কেশ নিয়ে সৃষ্ট দাঙ্গার রেশ ঢাকায় ছড়িয়ে পড়লে মানিক মিয়া দাঙ্গা প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি নিযুক্ত হন। সফলভাবে দাঙ্গা প্রতিরোধ করেন। ১৯৬৩ সালে আন্তর্জাতিক প্রেস ইনস্টিটিউটের পাকিস্তান শাখার চেয়ারম্যান হিসেবে নিযুক্ত হন মহান এই সাংবাদিক। বুদ্ধিভিত্তিক সংবাদ আর সৃজনশীলতার কিংবদন্তি তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া। দৈনিক ইত্তেফাকের উপসম্পাদকীয় কলামে মোসাফির ছদ্মনামে নিয়মিত রাজনৈতিক কলাম লিখতেন। সাংবাদিকতার জগতে এক প্লাটফর্ম হয়ে আছেন মানিক মিয়া। সাহসী এই কলম সৈনিকের উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ ‘পাকিস্তানী রাজনীতির বিশ বছর’ এবং ‘নির্বাচিত ভাষণ ও নিবন্ধ’। এই প্রবাদপ্রতিম সাংবাদিক ১৯১১ সালে পিরোজপুর জেলার ভান্ডারিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। সাংবাদিকতার অত্যুজ্জ্বল নক্ষত্র মানিক মিয়া। নিরলস পরিশ্রম, মেধা ও মননের মাধ্যমে উত্কর্ষতায় পৌঁছেছে। সত্ ও দক্ষ সাংবাদিক হিসেবে আজীবন লাখো মানুষের হূদয়ের মণিকোঠায় থাকবেন। ১৯৫৯ সালে ১ জুন এই লাখো জনতার কণ্ঠস্বর পরলোক গমন করেন চিরঞ্জীব, অক্ষত এবং স্বপ্নের প্রতিমা তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া। লেখক : শিক্ষার্থী, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, মাস্টার্স, সরকারি আজিজুল হক কলেজ, বগুড়া তথ্যসূত্র :বাংলাপিডিয়া, বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস ২০১৪, সুশাসনের জন্য চাই মুক্ত গণমাধ্যম, উইকিপিডিয়া।