গল্প-কথায় পদার্থবিজ্ঞান

শক্তির বিভিন্ন রূপ পর্ব— ৮ মর্নিংওয়াক থেকে ফিরছেন তারা। বিন্দু বললো— বাবা, ঘোড়া, ঐ দেখো ঘোড়া। সবাই তাকালো পিছনদিকে, এক ভদ্রলোক ঘোড়া নিয়ে আসছেন হেঁটে হেঁটে। একটু থামলো তারা, কী সুন্দর ঘোড়া ! নীলকান্তবাবু বললেন— তোদের বলা হয়নি, ক্ষমতার আরেকটি এককের নাম অশ্বক্ষমতা। হর্সপাওয়ার। সেটি কীভাবে— বললো আকাশ। সাতশ ছেচল্লিশ ওয়াট ক্ষমতাকে এক অশ্বক্ষমতা বলা হয়। কেন বাবা ? ক্ষমতার সাথে অশ্বের কী সম্পর্ক ? বললো অণু। নীলকান্তবাবু বললেন— সে সম্পর্কে একটা গল্প প্রচলিত আছে। আগে খনি থেকে কয়লা তোলা হতো মাথায় করে। মাটির অনেক গভীরে গর্ত করে সিঁড়ি দিয়ে বা রশির তৈরি মই বেয়ে কয়লা উঠানো হতো। এতে খুব কষ্ট হতো এবং দিন শেষে কে কতটুকু কয়লা তুলতে পেরেছে, তা নিয়ে একটা ঝামেলা সৃষ্টি হতো। শ্রমিকদের মজুরি দিতে অনেক হিসাব নিকাশ রাখতে হতো। এটা একটা বিরাট ঝামেলা ছিলো। কিন্তু ঘোড়া এলো কীভাবে ? বললো অণু। এরপর একটা ঘোড়ার সাথে কপিকলযুক্ত রশি খনির গভীরে নামিয়ে দিয়ে রশির শেষ প্রান্তে বড় ঝুড়ি বেঁধে দেয়া হলো। শ্রমিকরা খনির গভীরে নেমে কয়লা কেটে কেটে ঝুড়িতে তুলে দিয়ে ভর্তি করলেই ঘোড়া টেনে তুলতো সেই কয়লাভর্তি ঝুড়ি। ঘোড়ার কাজ এবং সময় হিসাব করে ক্ষমতা বের করা হলো। একটা ঘোড়ার ক্ষমতা মোটামুটি পয়েন্ট সেভেন ফাইভ থেকে পয়েন্ট এইট ফাইভ হর্সপাওয়ার। মানুষের কষ্ট লাঘব হলো, আর বিজ্ঞানের সাথে একটা প্রাণীর নামও যুক্ত হলো। ভারি মজার তো— বললো বিন্দু। তার টায়ার্ডনেস অনেকটা কমে এসেছে। ঘোড়ার গল্পে মজাও পেয়েছে সে। আমাদের বাসায় যে পানি উঠাবার মোটর রয়েছে— বললেন নীলকান্তবাবু, এর ক্ষমতা এক হর্সপাওয়ার। পানির কথা বলতেই, বিন্দু বললো— বাবা পানি খাবো, তাড়াতাড়ি চলো। ইতোমধ্যে সকালের সূর্য আকাশে উঠতে শুরু করেছে। পূবের আকাশ রাঙা হয়ে গেছে আগেই। নীলকান্তবাবু বললেন— দেখ কী চমত্কার সূর্য ! সবাই তাকালো সূর্যের দিকে। সত্যিই চমত্কার সূর্য। নীলকান্তবাবু বললেন— তোরা কী জানিস, শক্তির মূল উত্সই সূর্য ? কীভাবে —বললো চন্দ্রা। লক্ষ লক্ষ বছর আগে এই পৃথিবীতে বিশাল বনভূমি ছিলো। এইসব গাছগাছালি সূর্য থেকে সালোকসংশ্লেষণ প্রকৃয়ায় খাবার গ্রহণ করে বৃদ্ধি পেতো। ভূত্বকের পরিবর্তনে এই বিরাট সংখ্যক বন-বনানি মাটি চাপা পড়ে প্রচণ্ড চাপে কয়লায় পরিণত হয়। সেই কয়লা দিয়ে আমরা তাপ পাচ্ছি, বিদ্যুত্ পাচ্ছি। আবার সৌরবিদ্যুত্ও পাচ্ছি সূর্য থেকে। কাজেই সূর্যই আমাদের শক্তির মূল আধার। আচ্ছা বাবা, সীমা বললো, শক্তি কি একই রকম ? নীলকান্তবাবু বললেন— শক্তির বিভিন্ন রূপ বিদ্যমান এবং এক রূপ থেকে অন্যরূপে পরিবর্তন করা যায়। শক্তির আরো কী ধরনের রূপ রয়েছে বাবা ? বিন্দু বললো। অনেক ধরনের। যেমন তাপ, বিদ্যুত্, চুম্বক, শব্দ, আলোক, রাসায়নিক শক্তি, পরমাণবিক শক্তি, যান্ত্রিক শক্তি। এই সব শক্তিকে একরূপ থেকে অন্যরূপে রূপান্তরিত করা যায়। যেমন ধর, বিদ্যুত্শক্তি থেকে তাপশক্তি ও আলোকশক্তি। হ্যাঁ হ্যাঁ —বললো বিন্দু। আমরা কারেন্ট দিয়ে লাইট জ্বালাই, আবার কাপর চোপর ইস্ত্রিও করি। ঠিক তাই। বললেন নীলকান্তবাবু। আবার তাপশক্তি থেকে যান্ত্রিকশক্তি। এটি কী রকম ? তাপের সাহায্যে পানিকে বাষ্পে পরিণত করে সেই বাষ্প দিয়ে গাড়ি চালানো যায়। পারমাণবিক শক্তি থেকেও যান্ত্রিকশক্তি পাওয়া যায়। পারমাণবিক শক্তি কাজে লাগিয়ে ডুবোজাহাজ চালানো হয়। এরপর বিদ্যুত্শক্তির সাহায্যে চুম্বকশক্তি উত্পন্ন করা যায়। কীভাবে মামা ? বললো আকাশ। কলিংবেল দেখিসনি ? ওখানে সুইচ টিপলে বিদ্যুত্ প্রবাহিত হয় এবং সেই বিদ্যুত্ একটা লোহার বাটিকে চুম্বক বানিয়ে ফেলে। ঐ চুম্বক একটা লোহার হাতুড়িকে টেনে এনে আঘাত করায়। ফলে শব্দ হয়। মজার তো, বললো সবাই। সৌর শক্তি থেকেও বিদ্যুত্ শক্তি উত্পন্ন হয়। হ্যাঁ, মামা। আমাদের এদিকে অনেক গ্রামে ইলেকট্রিসিটি নেই। তারা সৌরবিদ্যুত্ ব্যবহার করে টিভি, লাইট, ফ্যান চালায়। বললো আকাশ। নীলকান্তবাবু বললেন, যান্ত্রিকশক্তি থেকেও তাপশক্তি পাওয়া যায়। তুই যদি হাতে হাত ঘষতে থাকিস, তাহলে দেখবি হাত গরম হয়ে গেছে। মানে হলো যান্ত্রিকশক্তি থেকে তাপশক্তি উত্পন্ন হয়েছে। আমরা শীতের সময় জমাট বাধা নারকেল তেলের বোতলে হাত ঘষে তেল গলিয়ে ফেলি। বললো রেখা। তাহলে তাপ পেলি কীভাবে ? যান্ত্রিকশক্তি তাপশক্তিতে পরিণত হয়ে জমাট বাধা নারকেল তেল গলিয়ে ফেলেছে। তবে যত শক্তিই অদল বদল করো না কেন, বললেন নীলকান্তবাবু, মোট শক্তির পরিমাণ কিন্তু ঠিক থাকে। এই শক্তির পরিমাণ বাড়েও না, কমেও না। আমরা শক্তি সৃষ্টিও করতে পারি না, আবার ধ্বংসও করতে পারি না। শুধু একরূপ থেকে অন্যরূপে নিয়ে যেতে পারি। কেন মামা ? আমরা শক্তি সৃষ্টি করতে পারি না কেন ? সৃষ্টি করতে পারি না কারণ সৃষ্টি করলে মোট শক্তি বেড়ে যাবে। কিন্তু তা তো হতে পারে না। কারণ মোট শক্তি পৃথিবীতে যা ছিলো, তা-ই থাকবে। বাড়বেও না, কমবেও না। শক্তিকে শুধু আমরা একরূপ থেকে অন্যরূপে নিতে পারি। একে বলা হয় শক্তির নিত্যতাসূত্র বা সংরক্ষণসূত্র। বলতে বলতে বাসায় ফিরে এলো সবাই। কমলা বললেন— হাতমুখ ধুয়ে এসো, নাস্তা খাবে।