চিরঞ্জীব মানিক মিয়া
প্রকাশ : ৩১ মে ২০১৪, ২২:০৪
আজ এ দেশের সাংবাদিকতা জগতের প্রবাদ-প্রতিম পুরুষ তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার ৪৫তম মৃত্যুবার্ষিকী। এখন হইতে ৪৫ বত্সর পূর্বে তিনি এই পৃথিবীর মায়া কাটাইয়া চলিয়া গেলেও আজও তাঁহার সংগ্রামমুখর জীবনের আলেখ্য এদেশের সাংবাদিকতা জগতের সর্বাপেক্ষা গৌরবময় ও উজ্জ্বলতম অধ্যায়রূপে সকলের নিকট পরম আদরণীয় হইয়া রহিয়াছে। সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে তিনি এক অননুকরণীয় ও অনন্যসাধারণ বৈশিষ্ট্য তুলিয়া ধরিয়া পূর্ববাংলার অধিকার বঞ্চিত মানুষের মনে সাহস, তেজ ও সংগ্রামী চেতনা সঞ্চার করিয়া গিয়াছেন। গণদাবি আদায়ের জন্য নিবেদিত একজন সাংবাদিকের কলম প্রকৃত অর্থেই কিভাবে যে তীক্ষধার তলোয়ারের রূপ পরিগ্রহ করে উহার প্রকৃষ্টতম উদাহরণ তাঁহার লেখনী। সেদিনের অধিকারহারা মূক, বধির ও হতদরিদ্র মানুষকে অধিকার সচেতন করিয়া তুলিতে তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার ‘রাজনৈতিক মঞ্চ’ আর তাঁহার প্রাণপ্রিয় ইত্তেফাক অকুতোভয়ে যে সংগ্রামী ভূমিকা পালন করিয়াছিল তাহার কোন জুড়ি নাই। সাংবাদিকতা যে দেশ ও জনসেবার শ্রেষ্ঠ মাধ্যম এই কথা তিনি শুধু মনেপ্রাণে বিশ্বাসই করিতেন না, বরং তাঁহার সমগ্র জীবনের কর্ম-সাধনার মধ্য দিয়া ইহাকেই তিনি মূর্ত করিয়া গিয়াছেন। পেশার মর্যাদা রক্ষার্থে তিনি লড়াই-সংগ্রামের অগ্রভাগে থাকিয়া সকলকে উদ্বুদ্ধ করিয়াছেন, সাহস জোগাইয়াছেন। যখন কুচক্রী শাসকেরা রবীন্দ্রনাথকে নির্বাসনে পাঠাইবার ফন্দি আঁটিয়াছে তখন বাঙালির সংস্কৃতি, ঐতিহ্য আর চেতনার আধাররূপী রবীন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে সূচিত ঐ চক্রান্তের বিরোধিতায় তাঁহার কলম ঝলসাইয়া উঠিয়াছে। আইউবী চক্রান্তে সংঘটিত চৌষট্টির সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় লাঞ্ছিত মানবতার পাশে তিনি নির্ভীক চিত্তে দাঁড়াইয়াছেন আর তাঁহার ইত্তেফাক রণাঙ্গনের সেনাধ্যক্ষের মতো এতদঞ্চলের বাঙালিদের প্রতি এই বজ্র নির্ঘোষ নির্দেশ জারি করিয়াছে, ‘পূর্ব বাংলা রুখিয়া দাঁড়াও।’ সেদিন দাঙ্গা প্রতিরোধ কমিটির আহ্বায়করূপে এবং স্বীয় আগুনঝরা লেখনীর মধ্য দিয়া তিনি কুচক্রী মহলের ষড়যন্ত্র লণ্ডভণ্ড করিয়া দিয়াছেন।
এই উপমহাদেশের তথা বাঙলার রাজনৈতিক অঙ্গনের অন্যতম দিকপাল হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে মানিক মিয়ার চিন্তা-চেতনায় মানবতাবাদী, অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ দৃঢ়মূল হইয়াছিল এবং আজীবন তিনি এইসব মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার জন্য তাঁহার ক্ষুরধার লেখনীকে নিয়োজিত রাখিয়াছিলেন। রাজনীতিই ছিল তাঁহার লেখনীর উপজীব্য বিষয়। তিনি সাংবাদিকতা করিতেন রাজনীতির জন্য। কেননা, রাজনীতিকে তিনি গণমানুষের সেবার প্রধানতম হাতিয়ার মনে করিতেন। আর ইহাকে তিনি ক্ষমতায় যাইবার উদ্দেশ্য নহে, উপায় হিসাবে দেখিতেন। তদানীন্তন পাকিস্তানের এই অংশের রাজনীতিকদের অধিকাংশের নিকট এবং গোটা জনগোষ্ঠীর নিকট তিনি পরম শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্বে পরিণত হইয়াছিলেন স্বচ্ছ চিন্তা, দুর্জয় মনোবল, দুরন্ত সাহস এবং ‘শির দেগা, নেহি দেগা আমামা’ এই দৃপ্ত শপথের বলে বলীয়ান থাকিবার কারণে।
অনারারি ফিল্ড মার্শাল আইউব যখন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৬ দফার বিরুদ্ধে অস্ত্রের ভাষা প্রয়োগ করিয়াছিল, সেদিন মানিক মিয়া আইউবকে স্পষ্ট ভাষায় জানাইয়া দিয়াছিলেন যে, ‘মনু মিয়ার রক্ত বৃথা যাইতে পারে না।’ তাঁহার কথাই পরবর্তীতে সত্যে পরিণত হইয়াছে, আইউবের ডিকেডী আমলের ঢক্কা নিনাদ আর তাহার সাধের তখেত তাউস উনসত্তরের গণজাগরণের মধ্য দিয়া তাসের ঘরের মতো উড়িয়া গিয়াছে, জনতার জয় হইয়াছে লৌহমানব আইউবও তাহার স্তাবকদের এবং রাজনীতিতে নামিয়া যাহারা হঠকারিতা, শঠতা ও অসাধুতার আশ্রয় লন তাহাদের প্রতি তিনি সর্বদাই ছিলেন খড়গহস্ত। এইসব শঠ, অসাধু রাজনীতিক ও তাহাদের মোসাহেব-ফড়িয়া তোষামোদকারী এবং প্রাসাদ চক্রান্তের মাধ্যমে জনগণের অধিকার হরণকারীদের বিরুদ্ধে জনমত গঠনে তিনি যে অনবদ্য ভূমিকা পালন করিয়াছেন তাহা আজ ইতিহাসের অন্তর্গত বিষয়। এই জাতি মানিক মিয়ার সেই ভূমিকার বিষয় আপাতদৃষ্টিতে বিস্মৃত হইয়াছে বলিয়া মনে হইতে পারে, কিন্তু একদিন এই বিস্মৃতিপ্রবণ জাতির মধ্য হইতে ভবিষ্যতের কোন এক অনুসন্ধিত্সু তরুণ গবেষক সিন্ধু সেচিয়া মুক্তা আনিবার মতো বিস্মৃতির অতলান্ত হইতে মানিক মিয়াকে নতুন আঙ্গিকে যে দেশবাসীর সামনে উপস্থিত করিবেন, ইহাতে কোনই ভুল নাই।
শহীদ সোহরাওয়ার্দী মৃত্যুকালে শেখ মুজিবুর রহমান নামক ‘রাজনৈতিক ময়দান’ আর তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া নামক যে ‘কলম’ রাখিয়া গিয়াছিলেন সেই ব্যক্তিদ্বয়ের যুগল সম্মিলনে এই দেশের গণমানুষের আকাঙ্ক্ষা স্বাধিকার হইতে স্বায়ত্তশাসন এবং স্বায়ত্তশাসন হইতে স্বাধীনতায় পর্যবসিত হইতে পারিয়াছিলো। আর মানিক মিয়া প্রকৃত অর্থেই এই দেশের মুক্তিকামী মানুষের নিকট ‘গাইড এ্যান্ড ফিলোসফার’ হইয়া উঠিয়াছিলেন। তাই তিনি প্রাতঃস্মরণীয়। তাঁহার নশ্বর দেহ বহুকাল আগে বিলীন হইয়া গেলেও আজও আছে তাহার অমলিন আদর্শের সুরভি। তিনি মানুষের মনের মণিকোঠায় দেদীপ্যমান—তিনি তাই চিরঞ্জীব!