বস্তিবাসী শিশুদের জন্মনিবন্ধন
প্রকাশ : ৩১ মে ২০১৪, ২২:০৪
একটি আন্তর্জাতিক বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার গবেষণায় প্রতীয়মান হইয়াছে যে, রাজধানীর বস্তিতে বসবাসরত ৬৩ শতাংশ শিশুই জন্মনিবন্ধনের বাহিরে রহিয়া গিয়াছে। এই চিত্রটি রাজধানীর নির্বাচিত পাঁচটি বস্তিতে পরিচালিত জরিপ হইতে প্রাপ্ত। তবে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের অন্যান্য মহানগর ও শহরের শত শত বস্তির চিত্রও যে ভিন্ন নহে—তাহা সহজেই অনুমেয়। ইউনিসেফ-এর সহযোগিতায় স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে ১৯৯৬ সালে সার্বজনীন জন্মনিবন্ধন কার্যক্রমের সূচনা হইবার পর ২০০৬ সালে যেইখানে অর্জন ছিল মাত্র ৯ দশমিক ৮ শতাংশ, মাত্র তিন বত্সরের ব্যবধানে তাহা ৫৩ দশমিক ৬ শতাংশে উন্নীত হইয়াছে। সামগ্রিকভাবে এই চমকপ্রদ সাফল্য সত্ত্বেও জন্মনিবন্ধন কার্যক্রম শুরু হইবার দেড়যুগ পরেও বস্তিবাসী শিশুদের ক্ষেত্রে অবস্থা এতোখানি শোচনীয় কেন—সেই প্রশ্ন উত্থাপিত হওয়া খুবই স্বাভাবিক। গবেষণায় ইহার তিনটি কারণও উঠিয়া আসিয়াছে। প্রথমত, অভিভাবকদের ৪১ শতাংশ জন্মনিবন্ধনের গুরুত্বই বোঝেন না; দ্বিতীয়ত, ৩২ শতাংশ অভিভাবক নিবন্ধন কিভাবে করিতে হয় তাহাই জানেন না; তৃতীয়ত, টাকা খরচের ভয়ে নিবন্ধন করেন না এমন অভিভাবকের সংখ্যা ২৭ শতাংশ। জন্মনিবন্ধন প্রক্রিয়ার সহিত সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলি যে এইসব সমস্যা সম্পর্কে অনবহিত—এমন ভাবিবার কোনো কারণ নাই। থামিয়া নাই সমস্যা সমাধানে তাহাদের বহুমাত্রিক প্রচেষ্টাও। তাহা সত্ত্বেও রাজধানীর বস্তি হইতে প্রাপ্ত চিত্রটি আমাদের পুনরায় স্মরণ করাইয়া দিল যে, বস্তিসহ পশ্চাত্পদ ও দুর্গম এলাকাগুলিতে বর্তমানে যতটুকু মনোযোগ দেওয়া হইতেছে— তাহা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই অপ্রতুল।
শিশু অধিকার বিষয়ক কনভেনশনে জন্মনিবন্ধনকে মৌলিক মানবাধিকার হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়া হইয়াছে। ইহার অর্থ হইল, প্রতিটি শিশুরই নাম, পরিচয় ও জাতীয়তার অধিকার রহিয়াছে। এই অধিকার অর্জনের পথে প্রথম ধাপটি হইল জন্মনিবন্ধন। ইহার মাধ্যমে রাষ্ট্র কেবল শিশুটির অস্তিত্বই স্বীকার করিয়া নেয় না, একই সাথে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসহ তাহার আনুষঙ্গিক অধিকারেরও নিশ্চয়তা প্রদান করে। তবে জন্মনিবন্ধনের গুরুত্ব শুধু এইখানেই সীমিত নহে। জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদে এবং প্রচলিত আইনে নানা ক্ষেত্রে শিশুদের যেইসব অধিকার ও সুরক্ষার নিশ্চয়তা দেওয়া হইয়াছে তাহার যথাযথ বাস্তবায়নের জন্যও জন্মনিবন্ধন সনদের কোনো বিকল্প নাই। বিশেষ করিয়া ঝুঁকিপূর্ণ শ্রম, চাকুরী, বিবাহ ও অপরাধের বিচার প্রভৃতি ক্ষেত্রে এই সনদই হইতে পারে শিশুদের সর্বাপেক্ষা নির্ভরযোগ্য রক্ষাকবচ। সর্বোপরি, জাতীয়ভিত্তিক পরিকল্পনা ও কর্মকৌশল প্রণয়নের জন্য জনসংখ্যাবিষয়ক যেইসব তথ্যউপাত্ত প্রয়োজন কার্যকর জন্মনিবন্ধনই কেবল তাহার জোগান নিশ্চিত করিতে পারে। অতএব, জন্মনিবন্ধনের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তাকে হালকা করিয়া দেখিবার কোনো অবকাশ নাই। উন্নয়নশীল দেশ হিসাবে এই ক্ষেত্রে আমাদের পদক্ষেপ বিলম্বিত এবং অগ্রগতি কিছুটা শ্লথ হইলেও হতাশ হইবার কিছু নাই। অদ্যাবধি জনগণের একটি অংশের অসচেতনতা ও অবকাঠামোগত প্রস্তুতির ক্ষেত্রে নানা দুর্বলতা প্রধান প্রতিবন্ধকতা হিসাবে বিবেচিত হইলেও বাস্তবতার চাপেই দ্রুত পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটিতেছে। ইহাও অনস্বীকার্য যে, সার্বজনীন টিকাদান কর্মসূচি, স্কুলে ভর্তি ও পাসপোর্ট হইতে শুরু করিয়া নানা ক্ষেত্রে জন্মনিবন্ধন সনদের বাধ্যবাধকতা এই ক্ষেত্রে তাত্পর্যপূর্ণ ভূমিকা রাখিতেছে। সন্দেহ নাই যে, যতো দিন যাইবে জাতীয় পরিচয়পত্রের মতোই জন্মনিবন্ধন সনদের প্রয়োজনীয়তার পরিধিও ততো বিস্তৃত হইবে। তবে বস্তিসহ পশ্চাত্পদ এলাকাগুলির বাস্তবতা যে ভিন্ন—তাহাও বিস্মৃত হইলে চলিবে না। সঙ্গত কারণেই এই ক্ষেত্রে অবশ্যই বিশেষ মনোযোগ অব্যাহত রাখিতে হইবে দীর্ঘদিন যাবত্।