স্মরণ

মানিক মিয়া:এক উজ্জ্বল নক্ষত্র

বাংলা ভাগ হলো—যোগ হলো। যোগ হলো—ভাগ হলো। ’৪৭-এর আগস্ট। ১৪ তারিখের মধ্যরাত। সাক্ষী কংগ্রেস-মুসলিম লীগ। তরবারি হাতে জল্লাদ র্যাডক্লিফ। ছলছুতোর অভাব কী। আগের বছরে কতো যে পড়ল কল্লা। নোয়াখালী-কলকাতায়। সত্যি একটা টাইড্যাল-বোর—রক্তের। ব্রিটিশের বাতাস। বাতাস পেলে যা হয়। বিষণ্ন গান্ধী—হতাশ মৌলানা। এতদিনে নেহেরু-জিন্নাহ রাজনীতির শিরীষ। নেতা আর কারে কয়। হিন্দুর নেতা—মুসলমানের নেতা। গান্ধী আর মৌলানা হওয়া কি অত সহজ! হয়েই বা করলেন কী। সাক্ষীগোপাল। সোহরাওয়ার্দী, আবুল হাশিম, শরত্ বসু, কিরণ শংকর, মানিক মিয়া কতো যে ছুটলেন। সারা দেহ ঘামে জবজবা। চোখে-মুখে স্বাধীন বাংলার স্বপ্ন। ব্রিটিশ কি আর কম ঘাগু। এক কোপে দুই ভাগ। রাজধানী দিল্লি আর করাচি। শুধুই কি বঙ্গ? আরেক কোপে পাঞ্জাব—দ্বিখণ্ডিত মাথা ও ধড়। এক মন্ত্রের এক ফুঁ— কাশ্মীর হয়ে উঠল চিরকালের জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরি। দূরে বসে হাসলেন বিধাতা। এবার বুঝে খা। আহা মানুষের কী আহাজারি! মানুষ আর রইল কই। হিন্দু যায় পশ্চিমে মুসলমান পূর্বে—এক কাপড়ে। ইত্তেহাদ পূর্ববঙ্গে ঘোষিত হলো হারাম। মানিক মিয়া ’৪৯-এ ফিরে এলেন কলকাতা থেকে ঢাকায়। দেওয়াল ডিঙিয়ে। স্বদেশে ভিনদেশের দেওয়াল। বার্লিন-প্রাচীর— বাংলা-প্রাচীর। মুসলমানের পুণ্যভূমি পাকিস্তান। রবীন্দ্রনাথ কে রে! বাংলা এ-যে হিন্দুর ভাষা। বহুদিন ফার্সি বলেছ। এবার উর্দু। সপ্তদশ শতকের কবি আবদুল হাকিম মুসলমান নাকি? মুসলমান হলে ‘সে সবে কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি’—জন্ম নিয়ে তামাশা? নতুন জাতির নতুন ভাষা। তা তোর বাংলা? এবার বুঝ! ইত্তেহাদের পর তখন ইত্তেফাক—ঢাকায়। ধর্মগন্ধী পাকিস্তানে সূচিত হলো অসামপ্রদায়িক লেখনীধারার এক শিশুর হাঁটা। মানিক মিয়ার হাত ধরে। আছেন মাওলানা ভাসানী, শেরে বাংলা, আবুল মনসুর প্রমুখ। নিজে রাজনীতিক হলেন না। হলেন ঘাম ঝরা নেপথ্যের কারিগর। গ্রেপ্তার-বন্যায় মাঠ নেতাশূন্য। মানিক মিয়া একাই একশ’। ইত্তেফাক তাঁর হূিপণ্ড। মুসাফিরের কলাম হয়ে উঠল বহুকাল নির্যাতিত-নিপীড়িত বাঙালির অনন্য কণ্ঠস্বর। ’৫২’র ফেব্রুয়ারি। ভাষার দাবিতে রক্তাক্ত ঢাকার রাজপথ। সংসদে গর্জে উঠলেন ধীরেন্দ্রনাথ, মাওলানা তর্কবাগীশ। লড়াইটা শুরু হয়ে গেল। কলার কাঁদির ন্যায় উদ্যত বাংলাভাষা নিজেকে খুঁজে পেল আপন মহিমায়। হাজার বছরের পথ পরিক্রমায় বাঙালি ফিরে পেল তার হালখাতার দলিল—শহীদ মিনার। রবীন্দ্রনাথের ফেরার পালা। ফিরলেনও রাজসিক ঐশ্বর্যে। শোষণ-নির্যাতন বৈষম্য অব্যাহত। ইস্কান্দার মীর্জা, আইয়ুব খান, ইয়াহিয়া। ২৪ বছরের বঞ্চনার দৌড়। কিন্তু পূর্বের বাঙালি আর থামল কই! ঐক্যবদ্ধ বাঙালির স্বাধীনতার যুদ্ধ। শিমুল রং স্রোতে গড়িয়ে গেল বাংলার সব নদ-নদী। সিঁদুর আর পানপাতা রঙের উড্ডীন পতাকা। কোথায় না ছিলেন তিনি বা তাঁর চিন্তা। আবেগ তাঁর আকাশছোঁয়া। অভিমানের উচ্চতাও তাই। অখণ্ড স্বদেশের স্বপ্ন। ইত্তেফাক সেই দৈনিক—যা বাঙালির স্বাধিকার আর স্বাধীনতার একমাত্র ধারাবাহিক দলিল। জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক সংকটে ইত্তেফাকই আজো এ জাতির সঠিক দর্পণ। অভিমানী। খণ্ডিত মাতৃভূমি দেখবেন না তিনি। ১লা জুন, ’৬৯। রাওয়ালপিন্ডির হোটেল। জীবনের শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন বিভীষণের বাড়িতে। মহাজীবনের প্রস্থানের আগে লিয়াকত আলী খান, আইয়ুব খান আর ইয়াহিয়াদেরকে হয়তো বলতে যাওয়া। তাকিয়ে থেকো পূর্বদিকে—সূর্য উঠবে। অচিরেই দেখতে পাবে নবীন সূর্য। মানিক মিয়া—এই বাঙালি পুরুষ জন্মেছিলেন ১৯১১-এ। বরিশালের ভান্ডারিয়ার বিখ্যাত মিয়া পরিবারে। তিতুমীর, ক্ষুদিরাম, সূর্যসেন, নেতাজী, সিআর দাস, হক সাহেব, ভাসানী, শেখ মুজিব—বাঙালির ইতিহাসে অকুতোভয় সব শ্রেষ্ঠ সন্তানদের মিছিল। মানিক মিয়া এই মিছিলেরই এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। লেখক : কবি